kalerkantho

শনিবার । ২১ জানুয়ারি ২০১৭ । ৮ মাঘ ১৪২৩। ২২ রবিউস সানি ১৪৩৮।


ক্ষোভে উত্তাল জনতা, তদন্তে অগ্রগতি নেই

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ক্ষোভে উত্তাল জনতা, তদন্তে অগ্রগতি নেই

তনু হত্যার প্রতিবাদ ও খুনির বিচার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গতকাল শাহবাগে মানববন্ধন করে।ছবি : কালের কণ্ঠ

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে ফুঁসে উঠেছে কুমিল্লার শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ। গতকাল রবিবার সকাল থেকে কুমিল্লার পূবালী চত্বরে কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভ করে। স্লোগানের পাশাপাশি চলে মানববন্ধন, গণসংগীত। বিক্ষুব্ধ জনতা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কও অবরোধ করে। বিকেলে গণজাগরণ মঞ্চ ঢাকা থেকে রোডমার্চ করে পূবালী চত্বরে গিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দেয়। এ ছাড়া ঢাকার শাহবাগে সড়ক অবরোধ ও প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনসহ সারা দেশে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তনু হত্যার বিচার দাবি করা হয়।

এদিকে তনু হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ অতিবাহিত হওয়ার পরও হত্যাকারী চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার না হওয়ায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে প্রশাসন। এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য নেই বলে চুপ করে আছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যেই গতকাল স্থানীয় এমপি আ হ ম বাহাউদ্দিন বাহার ও জেলা প্রশাসনের একটি দল কুমিল্লা সেনানিবাসে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং নিহতের পরিবারকে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেনাবাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, সেনাবাহিনী তদন্ত সংস্থা ও বেসামরিক প্রশাসনকে আন্তরিক সহযোগিতা করছে। সেনাবাহিনীও চায় প্রকৃত অপরাধী ধরা পড়ুক। অন্যদিকে তনু হত্যা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আমার আস্থা আছে। সেটির তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে আমরা আপনাদের জানাব। আশা করি শিগগিরই তদন্ত শেষ হবে। এর আগে আমি কিছু বলব না। ’ র‌্যাবের বারোতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল দুপুরে র‌্যাব সদর দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা জানান, গত ২০ মার্চ রবিবার সোহাগী জাহান তনুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। সেদিন রাত ১০টার দিকে কুমিল্লা সেনানিবাসের পাহাড় হাউস এলাকার ঝোপ থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হয়, ধর্ষণের চেষ্টায় তাঁকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ঘটনাটি জানাজানি হলে ২২ মার্চ মঙ্গলবার থেকে গতকাল পর্যন্ত টানা ছয় দিন কুমিল্লার সাধারণ শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ তনু হত্যার বিচার দাবি করে আসছে।

গতকাল সকাল থেকেই প্রতিবাদমুখর ছিল কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের পূবালী চত্বর। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদমুখর স্লোগানসংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন হাতে নিয়ে নগরীর প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড় পূবালী চত্বর এলাকায় জমায়েত হয়। কুমিল্লার সর্বস্তরের মানুষের বিরতিহীন স্লোগান আর গণসংগীতে উত্তাল হয়ে ওঠে কান্দিরপাড় এলাকা।

পরে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী গতকাল সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কুমিল্লা-কোটবাড়ী মহাসড়ক অবরোধ করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ভিক্টোরিয়া কলেজ, সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা মহাসড়কে ব্যারিকেড ও টায়ার জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। ফলে ওই সড়কের উভয় পাশে যানজট সৃষ্টি হয়। তবে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। দুপুর দেড়টায় পুলিশ হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রুতি দিলে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নেয়। দুই ঘণ্টা পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। বিক্ষুব্ধ লোকজনও ফিরে যায় পূবালী চত্বরে। বিকেলে যোগ দেয় গণজাগরণ মঞ্চের রোডমার্চ।

ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে গণজাগরণ মঞ্চ সোনারগাঁর কাঁচপুর, কুমিল্লার দাউদকান্দির গৌরীপুর ও চান্দিনা বাসস্ট্যান্ডে পথসভা করে। পরে বিকেল সাড়ে ৪টায় কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে পৌঁছে। এ সময় স্লোগানে স্লোগানে তাদের স্বাগত জানায় কয়েক হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষ। পরে সেখানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গণজাগরণ মঞ্চের কুমিল্লার সংগঠক খায়রুল আনাম রায়হান। সমাবেশে বক্তব্য দেন মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকি আক্তার, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি ইমরান হাবিব রুমন, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শম্পা বসু, সংগঠক জীবনান্দ জয়ন্ত, ভাস্কর রাসা, গণজাগরণ মঞ্চের কুমিল্লার অন্যতম সংগঠক আবুল কাশেম হৃদয়।

সমাবেশ থেকে আগামী ৩০ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রেখে মানববন্ধন করার কর্মসূচি ঘোষণা করেন ডা. ইমরান এইচ সরকার। তিনি বলেন, ‘একের পর এক ন্যক্কারজনক ঘটনা হচ্ছে; কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো কোনো আন্দোলন করছে না। আজ আমাদের সাধারণ মানুষদের রাস্তায় নামতে হচ্ছে, আন্দোলন করতে হচ্ছে। সেনানিবাসের মতো জায়গায়, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় যেখানে সাধারণ মানুষদের প্রবেশাধিকার নেই বিশেষ করে সন্ধ্যার পর সেখানে তনুকে কারা ধর্ষণ করল?

ইমরান বলেন, ‘আমরা ধর্ষকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি না। যে সেনাবাহিনী গঠিত হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, যারা দেশে-বিদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে, বাংলাদেশের পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরছে; সেই সেনাবাহিনীর হাতে রক্তের দাগ থাকুক, ধর্ষণের দাগ থাকুক এটা আমরা চাই না। আমরা চাই যেহেতু ক্যান্টনমেন্টের ভেতর এই ঘটনা ঘটেছে তাই সেনাবাহিনী দায়িত্ব নিক, ধর্ষক যদি সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকে সেই ধর্ষকের শাস্তি সেনাবাহিনী নিশ্চিত করুক। সেনাবাহিনী জিরো টলারেন্স দেখিয়ে আমাদের প্রশাসনকে সহায়তা করবে এটাই আমরা চাই। ’ তিনি বলেন, ‘অমানুষরাই ধর্ষণ করে। ধর্ষণের শাস্তি কেন মৃত্যুদণ্ড নয়, এটা আমরা সরকারের কাছে জানতে চাই। ফাঁসি ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। ’

গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র বলেন, ‘তনুর হত্যাকারী আর ধর্ষকদের বিচার হলে এই বিচার হবে বাংলাদেশের মানুষের বিজয়। ধর্ষকদের বিচারের মধ্য দিয়ে যে আন্দোলন এই আন্দোলন, তা শুধু একজন তনুর জন্য নয়, সারা দেশে প্রতিদিন যে নারীরা ধর্ষিত হচ্ছে, যারা নিপীড়িত হচ্ছে, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে প্রত্যেকের জন্য এই আন্দোলন। তনু হচ্ছে আমাদের বাতিঘর, আমাদের আলোর মশাল। আমাদের পথ দেখিয়েছে নারীদের সম্মান দিয়ে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। ’

এ ছাড়া তনুর জন্মস্থান মুরাদনগরে তার হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে মুরাদনগর উপজেলার গাজীরহাটে মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ এবং বিক্ষোভ মিছিল করে জাঙ্গাল বাদশাহ মিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্কুল, সংগঠন ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। স্থানীয় সমাজসেবী সংগঠন ‘সমীকরণ’ ও ‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’ এর আয়োজন করে।

সোনারগাঁ ও দাউদকান্দি প্রতিনিধি জানান, যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর এলাকায় গণজাগরণ মঞ্চের নেতাকর্মীরা পথসভা করে। একই দাবিতে সোনারগাঁ উপজেলার মেঘনা শিল্পনগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।

কুমিল্লার দাউদকান্দিতে গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডে পথসভা করে গণজাগরণ মঞ্চ। এ ছাড়া স্থানীয় গৌরীপুর কলেজের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীরা প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন করে।

ঢাকায় সড়ক অবরোধ, মানববন্ধন : ঢাকায় নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, তনুর হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে এই অবরোধ কর্মসূচি থেকে আজ সোমবারের মধ্যে তনুর হত্যাকারীদের চিহ্নিত না করলে শাহবাগে টানা অবরোধেরও ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ছাড়া তনু হত্যার বিচার দ্রুত করার দাবি জানিয়ে ৬৮টি নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি’ গতকাল রবিবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে। এতে বক্তব্য দেন মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম, নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবির, স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের জীবনকৃষ্ণ, নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক প্রমুখ।

বিএনপি নেতাদের ক্ষোভ : তনুর হত্যার বিচারের দাবিতে ‘অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট কাউন্সিল অব বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠনের আয়োজনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ বলেন, সরকারের গুণ্ডারা মা-বোনদের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নীরব থেকে অপরাধীদের উৎসাহিত করছেন। এ সময় মানববন্ধনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাজিমউদ্দিন আলম, সাবেক এমপি নিলোফার চৌধুরী মনি, ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শহিদুল ইসলাম বাবুল প্রমুখ।


মন্তব্য