kalerkantho


বিমানের চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে

আশরাফুল হক রাজীব   

২৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিমানের চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে

অবশেষে বিমানের বিতর্কিত চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন আহম্মেদকে সরিয়ে দিয়ে বিমান পরিচালনা পর্ষদ (বোর্ড) পুনর্গঠন করা হচ্ছে। পর্ষদের নতুন চেয়ারম্যান হচ্ছেন বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল এনামুল বারী।

তাঁর সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদে সদস্য হিসেবে যোগ দিচ্ছেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজিব-উল আলম। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে পর্ষদ গঠন-সংক্রান্ত প্রস্তাব আজ সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো হবে।

এ ছাড়া পদাধিকার বলে বোর্ডের সদস্য হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন সচিব, সহকারী বিমানবাহিনী প্রধান (অপারেশন অ্যান্ড ট্রেনিং), সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার ইন চিফ, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন কালের কণ্ঠকে জানান, ‘আমরা আগামীকাল (আজ সোমবার) বোর্ড পুনর্গঠনের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাব। বোর্ডের প্রধান হিসেবে কয়েকজনের নাম বিবেচনায় রয়েছে। ’

টানা পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনের পর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় নিয়ম করে প্রতিবছর পর্ষদ পুনর্গঠন করে। জামাল উদ্দিন আহম্মেদ ২০০৯ সালে বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। এ অবস্থায় ২০১৪ সালে পরিবর্তনের সুযোগ এলেও প্রধানমন্ত্রী জামাল উদ্দিনের ওপরই আস্থা রাখেন। চরম সমালোচনার মধ্যে ২০১৫ সালেও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান জামাল উদ্দিন।

এবারও চেয়ারম্যান হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন তিনিই। গত ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বিমানের বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যথাসময়ে তা করতে পারেনি বিমান। তখনো পর্যন্ত বিমানের চেয়ারম্যান হওয়ার কথা ছিল জামাল উদ্দিন আহম্মেদেরই। কিন্তু ৮ মার্চ যুক্তরাজ্য ঢাকা থেকে সরাসরি লন্ডনগামী কার্গোবাহী বিমান নিষিদ্ধ করলে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। মন্ত্রীর সঙ্গে দূরত্বের কারণে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম সাইদুল হককে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই কারণে জামাল উদ্দিন আহম্মেদও আরেক দফা চেয়ারম্যান হওয়ার দৌড়ে পিছিয়ে পড়েন।

বিমান পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পদে নিয়োগ পাওয়ার পর গত সাত বছরে জামাল উদ্দিন আহম্মেদ তিনজন বিমানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন। এর মধ্যে সবার আগে বিরোধের সৃষ্টি হয় মহাজোট সরকারের বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী জি এম কাদেরের সঙ্গে। জামাল উদ্দিন আহম্মেদকে সরিয়ে জি এম কাদের বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে প্রস্তাবে সায় দেননি প্রধানমন্ত্রী। একপর্যায়ে জি এম কাদেরকেই সরে যেতে হয়। বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ফারুক খান। এই সময় বিভিন্ন ইস্যুতে সিবিএ চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে। তারা বিভিন্ন দাবিতে কয়েক ঘণ্টার জন্য শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অচল করে দেয়। এতে তৎকালীন বিমানমন্ত্রী ফারুক খানের প্রশ্রয় ছিল বলে কথা ওঠে। শেষ পর্যন্ত ফারুক খানকেও সরে যেতে হয়।

২০১৪ সালে নতুন সরকার গঠিত হলে রাশেদ খান মেনন বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। শুরুতে ভালো চললেও এক সময় বিভিন্ন ইস্যুতে রাশেদ খান মেনন চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিনের ওপর বিরক্ত হন। কিন্তু সর্বোচ্চ মহলের সমর্থন থাকায় মেনন শুরুতে সব কিছু মেনে নেন। একপর্যায়ে তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। তিনি জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে সংসদে জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। এরপর তিনি জানান দিতে থাকেন, জামাল উদ্দিন আহম্মেদকে চেয়ারম্যান বহাল রাখা হলে তাঁকে যেন বিমান মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরই মধ্যে আদালতের নির্দেশনায় ২৭ মার্চ এজিএম করার সুযোগ পায় বিমান। নতুন বোর্ড গঠনের আগ পর্যন্ত শুধু এজিএম-বিষয়ক বোর্ডসভা করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হলেও বিমান চেয়ারম্যান তা আমলে নেননি। চলতি মাসে তিনি দুটো বোর্ডসভা করেন। এসব বোর্ডসভায় এজিএম ছাড়াও একাধিক বিষয় এজেন্ডাভুক্ত ছিল। সবকিছু বিবেচনা করে জামাল উদ্দিন আহম্মেদের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, জামাল উদ্দিনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বারবার জবাবদিহি করতে হয়েছে। এমনকি সংবাদ সম্মেলনেও প্রধানমন্ত্রীকে জামাল উদ্দিন আহম্মেদের বিষয়ে কথা বলতে হয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, ২০০৭ সালের ১১ জুলাই জারি করা অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী বাংলাদেশ বিমান করপোরেশনকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেড কম্পানিতে রূপান্তরিত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিমানের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। সংস্থাটির অর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী সর্বনিম্ন পাঁচ এবং সর্বোচ্চ ১১ সদস্যের সমন্বয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে। যত দিন পর্যন্ত বিমানের মোট শেয়ারের ন্যূনতম ৫১ শতাংশ সরকারের মালিকানায় থাকবে তত দিন পর্যন্ত সরকার বিমান পরিচালনা পর্ষদের ৬০ শতাংশ পরিচালক মনোনয়ন দিতে পারবে। বর্তমানে বিমানের শতভাগ শেয়ারের মালিকানা সরকারের হাতে রয়েছে। এ কারণে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে সরকারই।

বেবিচকে নতুন চেয়ারম্যানের যোগদান : শেষ পর্যন্ত সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যানকেও সরে যেতে হলো। গতকাল রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম সানাউল হক নতুন চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এহসানুল গনি চৌধুরীর কাছে দায়িত্বভার হস্তান্তর করেন। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে সাবেক চেয়ারম্যানকে বেবিচকের পক্ষ থেকে বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

বেবিচকের জনসংযোগ কর্মকর্তা রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, সিভিল এভিয়েশনের আগের চেয়ারম্যান চলে গেছেন। নতুন চেয়ারম্যান আজ (গতকাল) যোগ দিয়েছেন।

বিমানের এজিএম অনুষ্ঠিত : গতকাল সন্ধ্যায় বলাকা ভবনে বাংলাদেশ বিমানের বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিমান চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) জামাল উদ্দিন আহম্মেদ। গত এক বছর কী পরিমাণ আয়-ব্যয় হয়েছে তা সভায় আলোচনা করা হয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বিমানের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, আজ (গতকাল) চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। পর পর সাত বছর তিনি চেয়ারম্যান হিসেব দায়িত্ব পালন করেন। দু-এক দিনের মধ্যে নতুন চেয়ারম্যানকে নিয়োগ দেওয়া হবে। আজ মন্ত্রণালয় থেকে নতুন চেয়ারম্যানের নাম ঘোষণা আসতে পারে।

 


মন্তব্য