kalerkantho


দুই মন্ত্রী যা বলেছিলেন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দুই মন্ত্রী যা বলেছিলেন

সুপ্রিম কোর্টে গতকাল রবিবার জনকণ্ঠ পত্রিকার যে প্রতিবেদনটি অ্যাটর্নি জেনারেল পাঠ করেন, তাতে বলা হয়—‘খাদ্যমন্ত্রী বলেন, এ মামলার রায় কী হবে, তা প্রধান বিচারপতির প্রকাশ্যে আদালতে বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আমরা অনুধাবন করতে পেরেছি। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে এটা অনুধাবন করেছি—এ মামলায় আর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

কামরুল বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্য আদালতে কী বললেন? প্রসিকিউশন এ মামলা নিয়ে রাজনীতি করছে। জামায়াত যে অভিযোগ করেছে, বিএনপি যে অভিযোগ করেছে, তাদের আন্তর্জাতিক লবিস্ট গ্রুপ যে সুরে কথা বলছে, একই সুরে কথা বলেছেন প্রধান বিচারপতি। প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন তিনি। শুধু তাই নয়, এ বক্তব্যে ট্রাইব্যুনালের পাঁচ বছরের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ ও হত্যা করা হয়েছে। ’

তিনি বলেন, এই প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা ২২টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে। এর মধ্যে চারজনের দণ্ড কার্যকর হয়েছে। এই প্রসিকিউশন টিমই সাকা চৌধুরীর মামলায় কাজ করেছে। তখন তো কোনো সমস্যা হয়নি। এখন কেন প্রশ্ন উঠল?

কামরুল আরো বলেন, ‘আমি জানি না আমার কথাগুলো আদালত অবমাননার মধ্যে পড়ে কি না।

তবে সত্য কথা বলতে আমি ভয় পাই না। সত্য নির্ভয়ে বলতে হয়। ’ তিনি বলেন, ‘আমি মীর কাসেমের ট্রাইব্যুনালের পুরো রায় পড়েছি। আমি যতটুকু দেখেছি, আমার কাছে মনে হয়েছে মামলাটি সঠিকভাবেই হয়েছে। প্রধান বিচারপতি যখন প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন আমি তখনই পুরো রায়টি পড়লাম। আমি কোথাও ত্রুটি খুঁজে পাইনি। আর ওই ট্রাইব্যুনালে তো তিনজন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকই বিচার করেন। তাঁরাও তো কোনো ত্রুটি পাননি। ’

জনকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়ের প্রশংসা করে কামরুল ইসলাম বলেন, ‘স্বদেশ রায় এখানে উপস্থিত, তাঁকে আমি ধন্যবাদ দিই। তাঁর প্রতি সমস্ত জাতি কৃতজ্ঞ। ’ তিনি বলেন, ‘সাকা চৌধুরীর রায় অন্য কিছু হতে পারত। কিন্তু স্বদেশ রায় তাঁর লেখনীর মাধ্যমে আমাদের সজাগ করেছেন বলে সাকা চৌধুরীর ফাঁসি হয়েছে। ’

কামরুল বলেন, ‘বাংলাদেশে ৪৫ বছরে অনেক বিচারপতি এসেছে আর গেছে, কিন্তু কেউ তার মতো এত অতি বক্তব্য দেয়নি। তার অতিকথনে সুধীসমাজের মানুষেরা জিহ্বায় কামড় দিচ্ছেন। তাই তাকে অতিকথন থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি। আর তা না হলে সরকারকে নতুন করে বিকল্প চিন্তাভাবনা করা উচিত বলে আমি মনে করছি। ’

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রধান বিচারপতির সঙ্গে একই সুরে কথা বলা শুরু করেছেন—এ মন্তব্য করে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, তাঁর দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনা করা। কিন্তু তিনিও প্রধান বিচারপতির সুরে কথা বলছেন। কোথায় যাব?

অ্যাটর্নি জেনারেলের বিষয়ে কামরুল বলেন, তিনি বেশি বোঝেন। তিনি বলেছেন, এ বক্তব্য দেওয়া হয়েছে বলেই রায় অন্য রকম হবে—এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তবে আমি বলব, প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্য আদালতে যা বলেছেন, এরপর হয় তিনি আসামিকে খালাস দেবেন, নয়তো সাজা কমিয়ে দেবেন, না হয় মামলা পুনর্বিচারে পাঠাবেন। মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার আর কোনো উপায় নেই তাঁর। তিনি আরো বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির সুরে আমাদের অ্যাটর্নি জেনারেলও প্রসিকিউশনের সমালোচনা করছেন। তিনি আপিল মামলায় প্রসিকিউটরদের সহায়তা নেন না। আমার আইনজীবী পেশার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, যে আইনজীবী বলবে তিনি অনেক জানেন, তিনি আসলে কিছুই জানেন না। ’

খাদ্যমন্ত্রী বলেন, কেন আজ মীর কাসেমের মামলায় প্রশ্ন উঠবে? মীর কাসেম মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিয়ে কারাগারের কনডেম সেলে অবস্থান করছে। কিন্তু তার অর্থ কিন্তু বাইরে কার্যকর। বাইরে কিন্তু তার বিরাট কর্মী বাহিনী সক্রিয়। তার দেহটা কারাগারে আছে, তার অর্থ-বিত্ত কিন্তু বাইরে আছে। খাদ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব হচ্ছে—প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে নতুন করে শুনানি হওয়া উচিত। প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে একটি বেঞ্চ হোক, সেই বেঞ্চে আপিলের শুনানি হোক। ’ একই সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলকেও শুনানি থেকে বাদ দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন সাবেক এই আইন প্রতিমন্ত্রী।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এখন সংকটময় মুহূর্ত চলছে। প্রধান বিচারপতি প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন। আর এখন যদি রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে তাহলে টবি ক্যাডম্যানরা বলতে থাকবে আমরা চাপ সৃষ্টি করেই এ রায় নিয়েছি। আর রায় যদি বিপরীত হয় তাহলে আমরা মানব না। এটা একটা বড় সংকট। ’ তিনি বলেন, ‘এ সংকট আমাদের সৃষ্টি। ’

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘আমিও একজন ছোট বিচারক ছিলাম। ১২ বছর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ২৪ বছর পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে অনেক বিচার করতে হয়েছে। আমার জীবনে কোনো রায়ের আগে কোনো মন্তব্যই করিনি। ’ তিনি বলেন, ‘আমার মনে কষ্ট হয়, প্রধান বিচারপতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকেও যদি রায়ের আগেই মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মন্তব্য করেন তাহলে জাতি কোথায় যাবে?

‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা...’ গানটির কয়েক লাইন গেয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘বিচারপতিরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন। আমাদের সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে—রাষ্ট্রের প্রধানও আইনের ঊর্ধ্বে নন, তাঁকেও ইমপিচমেন্ট করার সুযোগ আছে। তাই প্রধান বিচারপতিও আইনের ঊর্ধ্বে নন। ’ মন্ত্রী বলেন, আইন সবার জন্য সমান। তিনি যে সংকট সৃষ্টি করেছেন এখন সেই সংকটের সমাধান তাঁকেই করতে হবে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা নিয়ে প্রধান বিচারপতি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে। আর সেটা তিনি প্রত্যাহার না করলে পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি ভেবে দেখা উচিত বলে মন্তব্য করেন সরকারের এই মন্ত্রী।

মন্ত্রী আরো বলেন, ‘নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের কথা বলা হচ্ছে, তারা ১৮ দিনে বিচার শেষ করেছে। সেটা ন্যায়বিচার। আর আজ আমরা পাঁচ বছর ধরে সবার বক্তব্য শুনতেই যাচ্ছি, আসামিরাও সাফাই সাক্ষী দিচ্ছে। তার পরও আমাদের বিচার নাকি সঠিক নয়। এখন টাকার কাছেই সব কিছু। ’ বিবিসির মতো মিডিয়া, যারা একাত্তরে গণহত্যার চিত্র তুলে ধরেছে; কিন্তু আজ তারাই আবার যুদ্ধাপরাধীদের ইসলামিক লিডার বলছে। এমন হলে দুনিয়া কিভাবে চলবে? প্রশ্ন করেন তিনি।


মন্তব্য