kalerkantho


দুই মন্ত্রীর সাজা

আদালত অবমাননার দায়ে ৫০,০০০ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে ৭ দিনের জেল

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দুই মন্ত্রীর সাজা

অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, আ ক ম মোজাম্মেল হক

আদালত অবমাননার দায়ে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এমপি এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপিকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। দুই মন্ত্রীর প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে, এই অর্থ অনাদায়ে সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জরিমানার এই অর্থ দুটি দাতব্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান—ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল ও লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের কোষাগারে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগ গতকাল রবিবার এ রায় দেন। প্রধান বিচারপতি এবং বিচারাধীন বিষয় নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করায় দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এই রায় দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী পদে আসীন কোনো ব্যক্তিকে সাজা দেওয়ার এটা দ্বিতীয় নজির। এর আগে হাবিবুল্লাহ খান নামের এক মন্ত্রীকে ১০ টাকা জরিমানা করেছিলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

গতকালের রায়ের মধ্য দিয়ে দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে আদালত থেকে দেওয়া সংক্ষিপ্ত আদেশে মন্ত্রী হিসেবে শপথ ভঙ্গের কোনো কথা সরাসরি বলা না হলেও আদালত বলেছেন, তাঁরা সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন।

রায় ঘোষণার আগে প্রধান বিচারপতি তাঁর সংক্ষিপ্ত আদেশে বলেন, ‘আমরা উচ্চ আদালতের সব বিচারক বেশ কয়েক দিন ধরে তাঁদের বক্তব্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করেছি। দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় যাঁদের নাম এসেছে আমরা তাঁদের সবাইকে ইচ্ছাকৃতভাবে ডাকিনি। তাঁদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে ব্যবস্থা নিইনি। নানা দিক বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিইনি। আমরা বাড়াবাড়ি করতে চাইনি। শুধু দুজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে বিচারিক কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। এর কারণ গোটা দেশবাসীর কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে কেউ যদি এর পুনরাবৃত্তি করে তবে আমরা কত কঠোর হতে পারি। ’  

আদেশে আরো বলা হয়, ‘তাঁরা (দুই মন্ত্রী) আদালত অবমাননার অভিযোগ থেকে অব্যাহতির জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেছেন। তাঁদের এই আবেদন গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করছি। তাঁরা মন্ত্রী। সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত। তাঁরা সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছেন। তাঁরা প্রধান বিচারপতি ও সর্বোচ্চ আদালতকে অবমাননা করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা বিচার বিভাগের মর্যাদাহানি করেছে। বিচার প্রশাসনের ওপর হস্তক্ষেপ করেছেন। যদি তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে যেকোনো ব্যক্তি বিচার বিভাগ সম্পর্কে একই রকম অবমাননাকর বক্তব্য দেবেন। তাঁদের বক্তব্য গুরুতর আদালত অবমাননামূলক। তাই তাঁদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করছি। যেহেতু তাঁরা শুরুতেই নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেছেন, তাই তাঁদের সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখানো হচ্ছে। তাঁদের আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হলো। তাঁদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হলো। ’

গতকাল প্রধান বিচারপতি ছাড়াও অন্য যেসব বিচারপতি এজলাসে বসেন তাঁরা হলেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি মো. ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মো. নিজামুল হক। গতকাল বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন না।

গতকাল আদালত বসার আগেই দুই মন্ত্রী আদালত কক্ষে উপস্থিত হন। সকাল সাড়ে ৯টায় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আট সদস্যের বেঞ্চে মামলার শুনানি শুরু হয়। শুরুতেই খাদ্যমন্ত্রীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুল বাসেত মজুমদার বলেন, নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে খাদ্যমন্ত্রী নতুন করে আবেদন করেছেন। এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, কবে করেছেন? জবাবে বাসেত মজুমদার বলেন, আজ। এরপর প্রধান বিচারপতি তাঁকে আবেদনটি পড়তে বলেন। বাসেত মজুমদার আবেদনটি পাঠ করেন। আবেদনে বলা হয়, ‘ভবিষ্যতে বিচার বিভাগ নিয়ে এ ধরনের আদালত অবমাননাকর কোনো ধরনের মন্তব্য করব না, এই অঙ্গীকার করছি। নিঃশর্ত ক্ষমা চাচ্ছি। দুঃখ প্রকাশ করছি। একই সঙ্গে সকল ধরনের দেওয়ানি ও ফৌজদারি দায় থেকে অব্যাহতি চাচ্ছি। ’

বাসেত মজুমদারের আবেদন উপস্থাপন করার পর প্রধান বিচারপতি অন্য বিচারপতিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। এ সময় আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, মি. অ্যাটর্নি জেনারেল, গত ৬ মার্চ দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখেছেন? জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, না। এ সময় বেঞ্চ অফিসারের হাত ঘুরে অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় পেপার কাটিংয়ের একটি ফাইল। সেখান থেকে তাঁকে জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন পড়তে বলেন আদালত। এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল পুরো প্রতিবেদনটি পাঠ করেন। প্রতিবেদন উপস্থাপন শেষ হলে খাদ্যমন্ত্রীর আইনজীবীকে উদ্দেশ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনারা জানেন, স্বদেশ রায় (জনকণ্ঠ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক) একজন সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি। আর বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বিচারক থাকা অবস্থায় আমার বক্তব্য রেকর্ড করেছেন। এটার পর তাঁর নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোনো কোনো মামলায় চার-পাঁচ বছর পর্যন্ত রায় দিচ্ছেন না। তাঁর বেতন আটকে রাখা হয়েছে। এঁরা তো বিতর্কিত ব্যক্তি। এঁদের সঙ্গে মন্ত্রীরা কেন গেলেন? এটা তো নৈতিকতার প্রশ্ন। ’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা অনেক চিন্তাভাবনা করেছি। বারবার কেন প্রসিকিউটরদের বিষয়ে রায়ে বলা হচ্ছে, সেটা ভাবতে হবে। ’ তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর যে কজন অ্যাটর্নি জেনারেল হয়েছেন তাঁদের মধ্যে তিনজন—আমিনুল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম ও মাহবুবে আলম অত্যন্ত সততার সঙ্গে কাজ করেছেন। অথচ এই মাহবুবে আলমকে পর্যন্ত কালিমা লেপন করল।

এ সময় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর আইনজীবী সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘আমার মক্কেল দুঃখ প্রকাশ করেছেন। নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেছেন। ’ এ সময় আবদুল বাসেত মজুমদার বলেন, ‘জনকণ্ঠ পত্রিকা পড়িনি। আমি দুঃখিত। ’

এ পর্যায়ে বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি ও বিচার বিভাগ নিয়ে কটাক্ষ করা হয়েছে। আমরা প্রতিবেদনটি পড়ালাম এ কারণে যে তাঁরা যা বলেছেন, তা সবার জানা দরকার। ’

এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘রায় তো চূড়ান্ত পর্যায়ে। আমরা জানি, টাকা কোন দিকে ফেলা হয়েছে। কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে, এটা রায়ে দিয়ে দেব। ’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আজ পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মর্যাদা রক্ষা করা হয়েছে। যত ক্ষমতাধর ব্যক্তিই হোক না কেন, হাউজিং কম্পানি, বুড়িগঙ্গা দখল ইত্যাদি মামলায় হাইকোর্ট যে রায়ই দেন না কেন, আজ পর্যন্ত এই আদালত (আপিল বিভাগ) মাথা নত করেননি। করবও না। ’ এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা ১০ মিনিটের জন্য বিরতিতে যাব। এরপর আদেশ দেব। ’ আদালত ৯টা ৫৮ মিনিটে এজলাস থেকে নেমে যান। এ সময় খাদ্যমন্ত্রী চা খাওয়ার জন্য আদালত কক্ষের বাইরে যেতে চাইলে আইনজীবীরা বাধা দেন। কিন্তু খাদ্যমন্ত্রী বারবার চা খাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে একজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) তাঁকে এক কাপ কফি এনে দেন। আদালত কক্ষে বসেই তিনি কফি পান করেন বিরতি শেষে ১০টা ২০ মিনিটে বিচারকরা এজলাসে বসেন। এরপর দুই মন্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করে প্রধান বিচারপতি সংক্ষিপ্ত আদেশ দেন।

আদেশ দেওয়ার পর খাদ্যমন্ত্রীর আইনজীবী বাসেত মজুমদার আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘আমরা নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছি। এর পরও সাজা দেওয়া হলো। তাই আমরা ক্ষমার আবেদন প্রত্যাহার করে মামলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাই। ’ আইনজীবীর কাছ থেকে এ বক্তব্য শোনার পর প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘তাহলে বসুন। পাঁচ মিনিটের জন্য আমরা বিরতিতে যাচ্ছি। এরপর এসে আদেশ দেব। ’ এ পর্যায়ে বাসেত মজুমদার দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এ বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। এরপর বিচারকরা এজলাস ত্যাগ করেন।

গত ৫ মার্চ রাজধানীর বিলিয়া মিলনায়তনে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত ‘৭১-এর গণহত্যাকারীদের বিচারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র : সরকার, বিচার বিভাগ ও নাগরিক সমাজের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকসহ বক্তারা প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের সমালোচনা করেন। তাঁরা প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে মীর কাসেম আলীর মামলায় ফের আপিল বিভাগে শুনানির দাবি জানান। এ সময় প্রধান বিচারপতি নেপাল সফরে ছিলেন। তিনি ৭ মার্চ দেশে ফেরেন। এরপর ৮ মার্চ দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করা হয়। তাঁদের ১৪ মার্চের মধ্যে রুলের জবাব দাখিল এবং ১৫ মার্চ আদালত হাজির থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত ১৪ মার্চের মধ্যে উভয় মন্ত্রী আইনজীবীর মাধ্যমে তাঁদের ব্যাখ্যা দাখিল করেন। ১৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আদালতে হাজির হলেও খাদ্যমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সফরে দেশের বাইরে থাকায় আইনজীবীর মাধ্যমে সময়ের আবেদন জানান। আদালত ২০ মার্চ পরবর্তী দিন ধার্য করেন। এ অবস্থায় ২০ মার্চ খাদ্যমন্ত্রী ক্ষমা চেয়ে সম্পূরক ব্যাখ্যা দাখিল করেন। এদিন আদালত খাদ্যমন্ত্রীর জবাব দেখে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আদালত ২৭ মার্চ পরবর্তী দিন ধার্য করে এদিন দুই মন্ত্রীকে হাজির থাকতে নির্দেশ দেন। নির্ধারিত দিনে গতকাল দুই মন্ত্রী উপস্থিত হন এবং তাঁদের উপস্থিতিতে শুনানি ও রায় হয়।

রায়ের পর অ্যাডভোকেট বাসেত মজুমদার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, তাঁর (খাদ্যমন্ত্রী) সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তাঁর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালত তাঁর রায়ে বলেছেন, এই দুই মন্ত্রী চরমভাবে আদালত অবমাননা করেছেন। এ জন্য তাঁদের নিঃশর্ত ক্ষমার আবেদন গ্রহণ করেননি আদালত। তাঁদের আবেদন খারিজ করেছেন। আদালত বলেছেন যে তাঁদের অপরাধের গুরুত্ব এত বেশি যে তাঁদের ক্ষমা করা যাবে না। আগামী সাত দিনের মধ্যে এই জরিমানার টাকা দাতব্য দুটি প্রতিষ্ঠানে জমা দিতে হবে। ’


মন্তব্য