kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০১৭ । ৬ মাঘ ১৪২৩। ২০ রবিউস সানি ১৪৩৮।


মুস্তাফিজের কীর্তি ম্লান লজ্জার হারে

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মুস্তাফিজের কীর্তি ম্লান লজ্জার হারে

বিশ্ব টি-টোয়েন্টির শেষটা দারুণ বোলিং কীর্তিতে রাঙিয়ে নিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। ২২ রানে ৫ উইকেট নিয়ে গড়লেন এবারের আসরে সেরা বোলিংয়ের বর্ণিল রেকর্ড। ছবি : মীর ফরিদ

না হয় নিতান্তই নিয়ম রক্ষার ম্যাচ। যেখানে দুই দলের কারো জয়-পরাজয়ে তেমন কিছু যায়-আসে না। তবু তা অমন ম্যাড়মেড়ে হলে চলে? খানিকটা আলোচনার খোরাক দেওয়ার জন্য, খানিকটা উত্তেজনার রেণু ছড়াতেই যেন তাই ইডেন গার্ডেন্সের ফ্লাডলাইটের একাংশ নিভে যায় বাংলাদেশ ইনিংসের ১১তম ওভার শেষে। ততক্ষণে অবশ্য মাশরাফি বিন মর্তুজার দলের সম্ভাবনার মশালের আলোও নিভু নিভু। ১৪ মিনিট বিরতির পর ফ্লাডলাইটে আলোর ঝরনা ফিরেছে। কিন্তু বাংলাদেশের আশার মশালের সলতে আর উসকানো যায় না। ধুঁকতে ধুঁকতে তা নিভে যায় লজ্জার বেশ কিছু রেকর্ডের সাক্ষী হয়ে। টি-টোয়েন্টিতে সর্বনিম্ন রানে অলআউট হওয়ার। রানের হিসাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার। টুর্নামেন্টের চালচিত্র বিবেচনায় নিউজিল্যান্ডের কাছে ৭৫ রানের এই হার হয়তো গভীর ক্ষতচিহ্ন এঁকে দিতে পারছে না। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের বিব্রতকর ক্ষত হয়ে ঠিকই তা থাকবে রেকর্ডবুকে।

গ্রুপে নিজেদের প্রথম তিন ম্যাচ জিতে আগেই সেমিফাইনাল নিশ্চিত নিউজিল্যান্ডের। মূল পর্বের তিন ম্যাচ হেরে বাংলাদেশের বিদায়ও যেমন। সেই হিসাবে ইডেনের এই ম্যাচটি একেবারে অর্থহীন। কিন্তু তাই কি? আগের ম্যাচের দুঃস্বপ্ন থেকে উত্তরণের উপলক্ষ তো ছিল মাশরাফির দলের সামনে। কিন্তু ভারতের কাছে ওই আর্তনাদমাখা পরাজয়ের প্রভাব এতই তীব্র যে, এখানে আর পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পায় না বাংলাদেশ। কিউইদের সামনে তাই অসহায় আত্মসমর্পণ তাদের।

মুস্তাফিজুর রহমানের ক্ষেত্রে অবশ্য সেটি বলা যাবে না। দল হারলেও কাল তো জেতেন এই পেসার, ক্রিকেটের নন্দনকাননের দর্শকদের মনে জয় করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, কেন তাঁর ভেতর বিশ্বজয়ের প্রতিশ্রুতি দেখে বাংলাদেশ। আইপিএলের সৌজন্যে এখানে প্রতিবেশী দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। কিন্তু ভারতীয় সাংবাদিক মহলে এবারের বিশ্বকাপে তাঁর চেয়ে ঢের বেশি খোঁজ পড়ে মুস্তাফিজের। গত বছর ওয়ানডে অভিষেক সিরিজে তাঁর ভারতকে নাকানি-চুবানি খাওয়ানো একটি কারণ। এবার আবার খেলবেন আইপিএলে। দুয়ে মিলে মুস্তাফিজকে মিলে আগ্রহের পারদ অনেক উঁচুতে। আর সেটি যে একেবারে বাড়াবাড়ি না, কাল তা দেখিয়ে দেন কাটার-মাস্টার।

ইনজুরির কারণে বাছাই পর্বের তিন ম্যাচের কোনোটিতে মাঠে নামতে পারেননি। মূল পর্বে পাকিস্তানের বিপক্ষেও না। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ফেরেন। খেলেন ভারতের বিপক্ষেও। তাতে প্রতিশ্রুতির ঝলক ছিল খানিকটা। কাল তাঁর পারফরম্যান্স পূর্ণ শতদলে উদ্ভাসিত। টি-টোয়েন্টিতে ৫ উইকেট শিকার তো আর যেনতেন ব্যাপার না!

এই ইডেনেই মুস্তাফিজহীন বোলিং আক্রমণ নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলায় মেতেছিল পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরা। কাল কিউইরা পারেনি তা। উইকেটও অবশ্য অমন ব্যাটিং স্বর্গ ছিল না। আর মুস্তাফিজের কাটারে বিভ্রান্ত হয়ে নিউজিল্যান্ড উইকেট হারায় একের পর এক। ফিল্ডিংয়ে ক্যাচ পড়ে বার দুয়েক। কিন্তু সাতক্ষীরার তরুণ তাতে হন না বিচলিত। নিজের করা প্রথম তিন ওভারেই একটি করে শিকার। আর শেষ ওভারে পর পর দুই বলে উইকেট নিয়ে হ্যাটট্রিকের সুযোগ তৈরি করা। সেটি না হলেও ৪-০-২২-৫ বোলিং ফিগারে ইডেনের আলো ছড়ানো বিকেলটা আরো আলোকিত করে তোলেন মুস্তাফিজ। ২০১২ সালে ইলিয়াস সানির ৪-১-১৩-৫ এর পর এটি এই ফরম্যাটে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সফল বোলিং বিশ্লেষণ।

কে তখন ভেবেছিলেন, এই ম্যাচে রানের হিসাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবধানে পরাজিত হতে চলেছে বাংলাদেশ! আর নিজেরা করবে তাদের সর্বনিম্ন রান! মুস্তাফিজ-কীর্তিতে নিউজিল্যান্ডকে ৮ উইকেটে ১৪৫ রানে আটকে রাখার পর অন্তত তা ভাবা যায়নি।

মূল পর্বের আগের তিন ম্যাচে বাংলাদেশের রান যথাক্রমে ১৪৬, ১৫৬ ও ১৪৫। কাল ব্যাটিং শুরুর সময় তাই জয়ের আশা ভালোভাবেই ছিল মাশরাফির দলের। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সফলতম ব্যাটসম্যান তামিম ইকবাল (৩) রান আউট হয়ে যান। মোহাম্মদ মিঠুন (১১) বোল্ড। আশার বেলুন চুপসে যায় না তখনো। কিন্তু এরপর দ্রুতই যে সাকিব আল হাসান (২), সাব্বির রহমান (১২), সৌম্য সরকার (৬), মুশফিকুর রহিম (০) সেই শবযাত্রা মিছিলের সঙ্গী! দেখতে না দেখতে ৪৪ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বসে বাংলাদেশ। মুশফিকের আউটের দুই বল পর আর এক রান যোগ করতেই ইডেনের ফ্লাডলাইটের সেই আলোবিভ্রাট। কিন্তু ম্যাচের ফল নিয়ে তা বিভ্রম ছড়াতে পারে না মোটেই।

এরপর আর একটি উত্তেজনাই ছিল টিকে। ২০১০ সালে হ্যামিল্টনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে যে ৭৮ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ, সেই রান টপকে যেতে পারে কিনা! পারেনি। ১৫.৪ ওভারে ৭০ রানে গুটিয়ে গিয়ে ম্যাচটি হারে ৭৫ রানে। ২০০৮ সালে করাচিতে পাকিস্তানের কাছে ১০২ রানে হারের পর এটি দ্বিতীয় বড় পরাজয়।

তবু এই হারের চেয়ে বাংলাদেশের বুকে শেল হয়ে বিঁধবে ভারতের বিপক্ষে ওই শেষ তিন বল। কে জানে, ওই খেলা জিতে গেলে কাল হয়তো কিউইদের বিপক্ষে অন্য বাংলাদেশকেই দেখা যেত!


মন্তব্য