kalerkantho


মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একদিন

শুধু হয়রানি অবহেলা আর গ্লানি

মোশতাক আহমদ   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শুধু হয়রানি অবহেলা আর গ্লানি

মুক্তিযোদ্ধা নাধু মোহাম্মদের বয়স এখন ৯২ ছুঁই ছুঁই। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ভারতের শিলিগুড়ি থেকে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে এসে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর লাল মুক্তিবার্তার ৬৬ নম্বর ক্রমিকে তাঁর নাম নাধু মোহাম্মদ আর বাবার নাম কমির উদ্দিন ঠিকই লেখা আছে, তবে ২০০৫ সালের ৫ জুন তারিখের বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় তাঁর বাবার নাম ভুলবশত মৃত কছির উদ্দিন লেখা হয়েছে। এই সামান্য ভুলটুকুর জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নাধু মোহাম্মদ এখনো মুক্তিযোদ্ধা সনদ পাননি।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কথা হয় নাধু মোহাম্মদের নাতি শাজাহান আলীর সঙ্গে। তিনি জানালেন, তাঁর নানা এখন ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারেন না। জীবদ্দশায় তিনি সরকারি তালিকায় নিজের নাম দেখে যেতে চান। তাই তিনি নানার সনদের জন্য এখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

জানা গেল, নাধু মোহাম্মদ ২০১১ সালে প্রথম যখন মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য আবেদন করেন, তখন তাঁকে বলা হয়েছিল, ‘আপনার বাড়ির ঠিকানায় মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাঠিয়ে যোগাযোগ করা হবে। ’ কিন্তু মন্ত্রণালয়ের সেই চিঠি তাঁর বাড়িতে গেছে পাঁচ বছর পর ২০১৬ সালের ৬ জানুয়ারি। তবু একটি সনদের জন্য এখনো ছোটাছুটি করতে হচ্ছে তাঁকে।

এভাবে ছোটাছুটি করতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধারা স্পষ্টই বুঝতে পারছেন, সম্মুখসমরে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করার চেয়েও যেন অনেক কঠিন কাজ একটি সনদ জোগাড় করা। তাঁদের সেবা নিশ্চিত করার জন্য যে মন্ত্রণালয় গড়েছে সরকার, সেই মন্ত্রণালয়ের গেট দিয়ে প্রবেশ করা থেকে শুরু করে বের হওয়া পর্যন্ত শুধু হয়রানি, অবহেলা আর গ্লানি।

সাবেক সেনাপ্রধান ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের মহাসচিব লে. জেনারেল (অব.) হারুন অর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের পর অনেক মুক্তিযোদ্ধা আগের চাকরিতে ফিরে গেছেন; অনেকে গ্রামে চলে গেছেন। তাঁরা এত দিন কখনো সনদ নেওয়ার কথা ভাবেননি। সরকার যখন মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সুবিধা দেওয়া শুরু করেছে, তখন অনেক অমুক্তিযোদ্ধা বিকল্প পন্থায় মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়েছে এবং এখনো নিচ্ছে। সরকারও অনেক ভুয়া সনদ বাতিল করেছে। এর ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে। অনেকের হয়তো গেজেটে নাম নেই। কারো কারো গেজেটে বাবার নামে সামান্য ভুল আছে। এসব সংশোধন করার জন্য যেসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে বলা হচ্ছে, ৬৫-৭০ বছর বয়সী মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না টেবিলে টেবিলে ঘুরে তা সংশোধন করা। আর মন্ত্রণালয়ের যেসব কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন তথ্য যাচাই করছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁদের জন্মও হয়নি। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান পাওয়ার বদলে নানাভাবে হয়রানির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এ অবস্থায় আবার উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। তাই মন্ত্রণালয়ের উচিত আইনি বাধা দূর করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজতর করা।

নাধু মোহাম্মদের বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ হান্নান কালের কণ্ঠকে জানান, ঘটনাটি তাঁর জানা নেই। তবে ভুল ঠিক করার পর বিষয়টি তিনি বিবেচনা করে দেখবেন। কিন্তু কবে নাগাদ দেখবেন, তা তিনি বলতে পারেননি। সচিব অবশ্য এ-ও বললেন, এ রকম অনেকেরই নামের সঙ্গে বাবার নামের মিল নেই। তাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়েই সন্দেহ আছে। তাই কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না।

একটি করে সনদের জন্য হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ঘুরছেন বছরের পর বছর। মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি কক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে বা তাঁদের সনদ পাওয়ার আবেদন দেখতে হবে বলে রীতিমতো দরজা বন্ধ করে রাখেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরের পর মন্ত্রণালয়ের ৬১২ নম্বর কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখা যায়। দরজার বাইরে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষা করছিলেন। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ‘অফিস চলাকালে দরজা বন্ধ কেন’ জানতে চাইলে ভেতর থেকে বলা হয়, ‘স্যারকে গিয়ে বলে দেখি, তিনি ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেন কি না। অনেকক্ষণ পর এ প্রতিবেদককে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হলেও বাইরে অপেক্ষমাণদের সেভাবেই রাখা হলো। কক্ষের ভেতর গিয়ে দেখা গেল, একজন উপসচিব বসা আছেন। তাঁর নাম মো. রেজাউল ইসলাম। তাঁর কাছে ‘এই দপ্তর থেকে তো মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা গেজেট করা হয়, তো এ পর্যন্ত কতজন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা গেজেট করা হয়েছে’ জানতে চাইলে উপসচিব বলেন, তিনি জানেন না। ‘অফিস সময়ে কক্ষের দরজা বন্ধ কেন’ জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘দরজা বন্ধ শুধু আমার একার নয়; এ মন্ত্রণালয়ের প্রত্যেকেরই দরজা বন্ধ থাকে। ’

কেন বন্ধ থাকে—প্রশ্ন করলে রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘এর জবাব সচিব স্যার দিতে পারবেন। ’

ওই দিন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে কথা হয় আরেক মুক্তিযোদ্ধা তমিজউদ্দিনের সন্তানের সঙ্গে। তিনিও ১৬ বছর ধরে মন্ত্রণালয়ে ঘুরছেন বাবার মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য; কিন্তু মন্ত্রণালয় কোনো সায় দিচ্ছে না। মাহবুব জানান, তাঁর বাবা যখন মারা যান তখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা হয়নি। বাবা মারা যাওয়ার পর ২০০৩ সালে বিএনপি সরকারের আমলে বাবার সনদের জন্য প্রথম আবেদন করা হয়।

মুক্তিযোদ্ধা তমিজউদ্দিন জীবদ্দশায় রাজশাহীর তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ার কারণে বিএনপির আমলে তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেওয়া হয়নি। এখন আওয়ামী লীগ টানা দুই দফায় সরকার পরিচালনা করলেও সনদ জুটছে না।

মাহবুব জানান, তাঁর বাবা ১৯৭২ সালে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্থানীয় চেয়ারম্যানের কাছে রেশন কার্ড পাওয়ার আবেদন করলে তাতে জাতীয় চার নেতার একজন শহীদ এইচ এম কামরুজ্জামান সুপারিশ করেন। সেই কাগজও মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। তাঁর বাবার সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন এমন চারজনের প্রত্যয়নপত্র, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গনি ওসমানীর প্রদত্ত সনদ, জাতীয় শিক্ষক রাখাল চন্দ্রের প্রত্যয়ন এবং তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগ অফিসের সনদও আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করে দিয়েছেন। এর পরও মন্ত্রণালয় সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়াই শুরু করেনি।

মন্ত্রণালয়ের নিচতলায় কথা হলো একজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে, যিনি রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের লোকাল শাখায় চাকরি করেছেন মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে। গত মাসে অবসরেও গেছেন। কিন্তু আবেদন করেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের সনদ পাননি। মো. ইউনুছ হাওলাদার নামের এ মুক্তিযোদ্ধা জানান, তিনি সিনিয়র অফিসার হিসেবে ২০১১ সালে সোনালী ব্যাংক থেকে অবসরে যান। চাকরিতে যোগদানের সময়ও তিনি মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়েছেন। অথচ এখন চাকরি শেষ, এখনো সনদ পাচ্ছেন না। আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রও জমা দিয়েছেন, এর পরও মন্ত্রণালয়ের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে তাঁকে। তিনি দুঃখ করে বলেন, মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা তাঁর সঙ্গে ভালো করে কথাও বলেন না। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এ মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠে বাজল হাতাশার সুর—‘আমি কি জীবদ্দশায় আর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির সনদ দেখে যেতে পারব না?’

জানা গেল, মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য এখন মন্ত্রণালয়ে আবেদন জমা আছে প্রায় ২০ হাজার। এ ছাড়া নতুনভাবে অনলাইনেও আবেদন করা আছে আরো দেড় লাখের মতো। এই দেড় লাখের বিষয়ে স্ব স্ব উপজেলায় যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া থাকলেও হাইকোর্টে একটি মামলার কারণে তিন বছর ধরে তা আলোর মুখ দেখছে না।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ হান্নান জানালেন, প্রতিদিন শত শত মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পক্ষের আবেদনকারীরা মন্ত্রণালয়ে আসেন। প্রতি সপ্তাহের রবিবার ও মঙ্গলবার সাক্ষাতের জন্য সময় নির্ধারণ করা আছে। সে দিনগুলোতে উপচে পড়া ভিড় থাকে। তিনি জানালেন, এখনো মন্ত্রণালয়ে ২০ হাজারের মতো আবেদন জমা আছে। তাঁদের আবেদনের জবাব দেওয়া এবং কোন মুক্তিযোদ্ধার কোন তথ্য প্রয়োজন, তা জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে চিঠির মাধ্যমে। তবে লোকবল অনেক কম হওয়ার কারণে কাজে সমস্যা হচ্ছে। লোকবল চেয়ে তিনি সরকারের কাছে পত্র দিয়েছেন। লোকবল পাওয়া গেলে ভোগান্তি অনেকটা কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন সচিব।


মন্তব্য