kalerkantho


স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপন

জাতিকে দ্রুত কলঙ্কমুক্ত করার ডাক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জাতিকে দ্রুত কলঙ্কমুক্ত করার ডাক

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে গতকাল সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : পিআইডি

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার আহ্বান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে জাতি উদ্‌যাপন করল স্বাধীনতার ৪৫তম বার্ষিকী। বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করা হলো পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার সশস্ত্র যুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করা মহান শহীদ, নির্যাতিত নারী ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে গতকাল শনিবার রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ছিল নানামাত্রিক আয়োজন। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি দপ্তরগুলো শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ছাড়াও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে বাঙালির জাগরণ ও অহংকারের এই দিনটি উদ্‌যাপন করে। দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে ছিল স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন, মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,আলোকচিত্র ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী,মসজিদ-মন্দির-প্যাগোডায় দেশের কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা ইত্যাদি।

সূর্যোদয়ের মুহূর্তে রাজধানীর তেজগাঁও পুরনো বিমানবন্দর এলাকায় ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের কর্মসূচি। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধাসরকারি ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।

রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে সকালে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে জাতির পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের অমর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। এরপর জাতীর বীর সন্তানদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ বেদি।

অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করা হয়।

রাজধানীর স্বাধীনতা দিবসের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সকালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোর সমাবেশ ও মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান। এতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কুচকাওয়াজসহ বিভিন্ন শরীরচর্চা প্রদর্শন করে। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

এবারের স্বাধীনতা দিবসের আরেকটি অন্যতম আকর্ষণ ছিল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আয়োজনে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত ৩৬ মাইল পদযাত্রা। ৪৫ বছর আগে পঁচিশে মার্চ কালরাতের দুঃসহ সেই স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণ তহবিল সংগ্রহের জন্য ছিল এই ব্যতিক্রমী আয়োজন।

সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে রক্ষিত জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে তিনি শ্রদ্ধা জানান। সকাল থেকে দলীয় নেতাকর্মীসহ অনেক শ্রেণি-পেশার মানুষ বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হয় ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের অভিনন্দন জানান। তিনি শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন কেন্দ্রে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ফুল-ফল ও মিষ্টি পাঠান। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় ৮০টি পরিবার এই ভবনে বসবাস করছে।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও তাঁর স্ত্রী রাশিদা খানম দেশের ৪৬তম স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বঙ্গভবনে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। রাষ্ট্রপতি ভবনের প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ সংবর্ধনায় যোগ দেন। রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও বিশিষ্ট নাগরিকদের পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বীরশ্রেষ্ঠ পদকপ্রাপ্তদের পরিবারের সদস্যরা সংবর্ধনায় যোগ দেন। বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর ও বাপ্পা মজুমদার অন্যান্যের মধ্যে অনুষ্ঠানে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সাভার স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে এসে শেরে বাংলানগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে বিএনপি।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ছায়ানট, জাতীয় প্রেস ক্লাব, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ব্যাপক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপন করে। প্রতিটি অনুষ্ঠানে ছিল মানুষের উপচেপড়া ভিড়। রাজধানীর বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে ছিল মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি। এ ছাড়াও অনেক সাধারণ মানুষ লাল-সবুজ পোশাক পরে ঘুরে-বেড়িয়ে উপভোগ করেছে বাঙালি জীবনের এই বিশেষ দিনটি।

বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠান থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির যেকোনো ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক থাকার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানানোর পাশাপাশি স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে জঙ্গিবাদী তত্পরতা প্রতিরোধের আহ্বান জানানো হয়।

দিনটি ছিল সরকারি ছুটির দিন। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে ঢাকা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলো জাতীয় পতাকাসহ বিভিন্ন পতাকায় সজ্জিত করা হয়। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বিভিন্ন বেসরকারি রেডিও, টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে। সরকারি ভবনে আলোকসজ্জা করা হয়।

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সকাল ১০টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা এহসানুল হক। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি, অগ্রগতি এবং শহীদদের আত্মার সদ্গতি কামনায় এক বিশেষ প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হয়।

আওয়ামী লীগের একটি কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে। টুঙ্গিপাড়ায়ও নেমেছিল মানুষের ঢল।

বিদেশে অবস্থিত বিভিন্ন দূতাবাসও স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে।

আজ রবিবারও বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আজ বিকেল ৩টায় রাজধানীর খামারবাড়ী কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। এতে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।


মন্তব্য