kalerkantho

25th march banner

মাত্র ৬৭ বীরাঙ্গনার ‘মুক্তিযোদ্ধা’ স্বীকৃতি

স্বাধীনতার ৪৫ বছর

পার্থ সারথি দাস   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মাত্র ৬৭ বীরাঙ্গনার ‘মুক্তিযোদ্ধা’ স্বীকৃতি

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও প্রচার দপ্তর থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত প্রতীকী চিত্রকর্মসংবলিত একটি পোস্টারে দেখা যায়, এক নারী রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে, তাতে লেখা আছে—‘বাংলার মায়েরা মেয়েরা সকলেই মুক্তিযোদ্ধা’। মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীদের বেশির ভাগই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছেন। সরাসরি যুদ্ধও করেছেন কেউ কেউ। পোস্টারে নারীর স্বীকৃতি মিললেও বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতির হার হতাশাজনক। স্বাধীনতার ৪৫ বছরে মাত্র ৬৭ জন বীরাঙ্গনা সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। বর্তমান সরকারের সময়ে ছয় মাসের ব্যবধানে দুই দফায় এ জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট গবেষকরা বলছেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সরকারগুলোর অবহেলায় বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতির বিষয়টি ঝুলে থাকে। স্বীকৃতি না পেয়ে মারা গেছেন অনেকে। লজ্জায় অনেকে মুখ ফুটে পরিচয়ও প্রকাশ করছেন না।

বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দিতে কাজ করছে ‘চেষ্টা’ নামের একটি বেসরকারি সংগঠন। হবিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, পুঠিয়া (রাজশাহী), আত্রাই (নওগাঁ), হালুয়াঘাট, গোপালগঞ্জ, কুমিল্লাসহ ঢাকার আশপাশে এমন ৬৮ জন বীরাঙ্গনার খোঁজ পেয়েছে সংগঠনটি, যাঁদের অনেকের নাম প্রজ্ঞাপনে ওঠেনি। সংগঠনের সভাপতি সেলিনা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, সিরাজগঞ্জের কালিয়া হরিপুরের হাজেরা বেগম, একই জেলার ছয়া ধানগড়ার রাহেলা বেগম ও নুরজাহান, মনগড়িয়ার করিমন বেগম ও নতুন ভাঙাবাড়ি গ্রামের খোদেজা বেগম (আয়েশা) এখনো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পাননি। গত ১১ মার্চ সংগঠনটি রাজধানীতে পঁচাত্তরোর্ধ্ব পাঁচ বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা হাওয়া খাতুন, আয়শা খাতুন, শরফুলি বেগম, শাহেরা খাতুন ও ময়মুনকে সংবর্ধনা দেয়। তাঁরা ময়মনসিংহের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা।

একই দিন রাজধানীর রবীন্দ্রসরোবর প্রাঙ্গণে ঠাকুরগাঁওয়ের বীরাঙ্গনা টেপরি বেওয়া ও তাঁর যুদ্ধশিশু সুধীরকে সম্মাননা জানায় বাক-শিল্পাঙ্গন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি উদ্যোগে সম্মাননা মিললেও সরকারিভাবে কোনো সম্মানই মিলছে না অনেকের ভাগ্যে।

সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীর বাবা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী হবিগঞ্জের চা বাগান এলাকায় চা শ্রমিকদের সংগঠিত করে গড়ে তুলেছিলেন ‘তীরন্দাজ বাহিনী’। বাবার মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুবাদে একাত্তরে নির্যাতিতাদের খুঁজতে ২০০৬ সাল থেকে কেয়া চৌধুরী তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধান শুরু করেন। তাঁর ৯ বছরের চেষ্টায় হবিগঞ্জের ছয় নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর। কেয়া ‘চেতনা একাত্তর’ নামের সংগঠনের মাধ্যমে অনুসন্ধানের কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। কেয়ার অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা ছয় নির্যাতিতার পাঁচজনই বীরাঙ্গনা। একজন পঙ্গু। এই ছয় নারী হলেন পুষ্পরানী শুল্কবৈদ্য, মালতী রানী শুল্কবৈদ্য, হীরামনি সাঁওতাল, ফারিজা খাতুন, সাবিত্রী নায়েক ও রাজিয়া খাতুন। এর মধ্যে হীরামনি সাঁওতাল ও সাবিত্রী নায়েক চা শ্রমিক। কেয়া জানান, তাঁদের মধ্যে হীরামনি ২ মার্চ মারা গেছেন। তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চান্দপুর (চানপুর) চা বাগানের লোহার পুল এলাকায়। মারা যাওয়ার পর তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়েছে। আজ রবিবার বিকেলে হবিগঞ্জ শহরের শহীদ বেদি প্রাঙ্গণে হীরামনি স্মরণে সভার আয়োজন করা হয়েছে।

বীরাঙ্গনা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী জানান, এখনো বেশির ভাগ বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি পাননি। নারী মুক্তিযোদ্ধারা বড় অবহেলার শিকার। ৬৭ জন বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও তাঁদের নাম এখনো প্রজ্ঞাপনে ওঠেনি। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বীরাঙ্গনা হিসেবে আমি বক্তব্য দিয়েছি। আমি নাম চাই না, স্বীকৃতি চাই না, তবে আমাকে স্বীকার না করলে ইতিহাস বিকৃত করা হবে। আমার নাম তো সবার ওপরে থাকার কথা। ’ ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী জানান, বাধ্য হয়ে গত সোমবার তিনি আবেদন করেছেন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে। তাঁর মতো হাজার হাজার বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি পাননি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি আমরাই দিয়েছি। এখন পাঁচ শর বেশি বীরাঙ্গনার একটি তালিকা নিয়ে আমরা কাজ করছি। গেজেটভুক্ত হওয়ার পর তাঁরা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন। আসলে সামাজিক অবস্থার কারণে গেজেটে অনেক বীরাঙ্গনা নাম তোলাতে চান না। এই কঠিন বাস্তবতার মুখে আমাদের কাজ করতে হচ্ছে। ’

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকার-আলবদর দ্বারা অসংখ্য মা-বোন ধর্ষিত ও নির্যাতিত হয়েছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রাথমিক সরকারি হিসাবে বলা হয়েছিল, হানাদারদের দ্বারা কমপক্ষে দুই লাখ নারী ধর্ষিত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেশি-বিদেশি একাধিক গবেষকের গবেষণায় উঠে আসে, মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিতার সংখ্যা চার লাখের বেশি। চার লাখ থেকে চার লাখ ৩০ হাজার নারী ধর্ষিত হওয়ার তথ্যটি প্রথম তুলে ধরেছিলেন ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যানড প্যারেন্টহুড ফেডারেশনের প্রতিনিধি ড. জেফরি ডেভিস। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের নারী পুনর্বাসন জাতীয় বোর্ডের সভাপতিকে ড. ডেভিস ওই সংখ্যা জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশ ঘুরে ওই তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন ড. ডেভিস। এই অস্ট্রেলীয় বিশেষজ্ঞের মতে, কেবল নির্যাতিত অন্তঃসত্ত্বা নারীর সংখ্যাই দুই লাখ।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা উইমেনস মিডিয়া সেন্টার পরিচালিত উইমেন আন্ডার সিজ প্রজেক্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে দুই লাখ নন, অন্তত চার লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

গবেষক সুসান ব্রাউন মিলার তাঁর এক বইয়ে লিখেছেন, একাত্তরে সম্ভাব্য চার লাখ বাঙালি নারী ধর্ষণের শিকার হন। নারীদের জোর করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের রাতের পর রাত ধর্ষণ করা হয়। শিশুকন্যা থেকে ৭৫ বছরের বৃদ্ধাও এই নিগ্রহের হাত থেকে রেহাই পাননি।

মুক্তিযুদ্ধের পর নির্যাতিতাদের পুনর্বাসনে যুক্ত থাকা একাধিক ব্যক্তি জানান, নির্যাতিতাদের একটি অংশ গর্ভধারণ করতে বাধ্য হয়েছে। তারা জন্ম দিয়েছে ‘যুদ্ধশিশু’। ঢাকায় মাদার তেরেসার শিশু সদন, ২২টি বেবিহোম, বিভিন্ন হাসপাতালে কমপক্ষে ২০ হাজার যুদ্ধশিশু ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে জন্মদাত্রীরা নিজের পরিচয় লুকিয়ে রেখেছেন সামাজিক অবস্থার কারণে। যুদ্ধশিশুদের একটি অংশকে সরকারি একটি আইনের আওতায় বিভিন্ন দেশে দত্তক পাঠানো হয়েছিল। তাদের বেশির ভাগ শিকড়ের সন্ধানে দেশে এসে ঠিকানা খুুঁজে পাচ্ছে না, পাচ্ছে না মায়ের পরিচয়ও।

জানা গেছে, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিতাদের ‘বীরাঙ্গনা’ স্বীকৃতি দিয়ে তাঁদের সম্মান জানান। তাঁরই নির্দেশনায় বীরাঙ্গনাদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কাজও শুরু হয়েছিল। তবে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ওই সব কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সুকুমার বিশ্বাস তাঁর সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১/নারী প্রত্যক্ষদশী ও অংশগ্রহণকারীর বিবরণ’ গ্রন্থে সম্পাদকের কথায় লিখেছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা আলাদা করে দেখার প্রয়াস শুরু হয় বিগত নব্বইয়ের দশক থেকে। এর আগ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আলোচনায় নারীরা ছিলেন অনুপস্থিত।

সরকারি উদ্যোগ না থাকলেও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান ও কয়েকজন গবেষক নিজ তাগিদ থেকেই স্থানে স্থানে খোঁজ নিয়েছেন বীরাঙ্গনাদের। সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি যে বীরাঙ্গনা নারী চা শ্রমিকদের খোঁজ পেয়েছি তাঁদের কেউ কেউ সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, কেউ সন্তানসহ সেনা ক্যাম্পে অবরুদ্ধ ছিলেন দিনের পর দিন। ছয়জনের মধ্যে খাদিজা খাতুন বোমার আঘাতে পা হারিয়েছেন। আমি ২০০৯ সালের ২৭ মার্চ বীর নারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতির আবেদন জানিয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। প্রথম দিকে বিষয়টির গুরুত্ব দেয়নি কেউ। পরে গেজেট প্রকাশ হলে আমি ভীষণ খুশি হই। ’

কেয়া চৌধুরী জানান, তাঁর বাবা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী চা বাগান এলাকায় চা শ্রমিকদের দিয়ে প্রথমেই প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলেন। এ জন্য চান্দপুর (চানপুর) চা বাগানে ‘তীরন্দাজ বাহিনী’ গড়ে তোলেন চা শ্রমিকরা। তাঁরা সমবেত হতেন নাটমণ্ডপে। সেখানে লঙ্গরখানাও খোলা হয়েছিল। পাকিস্তানি হায়েনারা চা শ্রমিকদের টার্গেট করেছিল। এ কারণে চা শ্রমিক নারীরাও নির্যাতিত হন। নির্যাতিত নারী চা শ্রমিকদের একজন ছিলেন হীরামনি সাঁওতাল ও অন্যজন সাবিত্রী নায়েক। সাবিত্রী এখনো বেঁচে আছেন, তাঁর বয়স ৬৫। হীরামনি ৭৫ বছর বয়সে মারা যান। বীরাঙ্গনাদের খুঁজে বের করে তাঁদের কাহিনী সংগ্রহ করছেন সুরমা জাহিদ। কিন্তু তাঁদের সবার ভাগ্যে সরকারি স্বীকৃতি মেলেনি। প্রথম দফায় গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ৪১ জনকে এবং গত ১৪ মার্চ ২৬ বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।


মন্তব্য