kalerkantho


মুক্তিযোদ্ধা সনদও সোনার হরিণ

ভুয়াদের আগ্রাসী থাবা

আশরাফুল হক রাজীব ও আবুল কাশেম   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ভুয়াদের আগ্রাসী থাবা

মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সুসংবাদ হলো—তাঁদের জন্য সরকারের দেওয়া সুযোগ-সুবিধা কিছু কিছু করে বাড়ছে। কিন্তু এর বিপরীতে দিন দিন ভারী হচ্ছে দুঃসংবাদের পাল্লা। সরকারি সুযোগ-সুবিধার টানে মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য শুরু হয়েছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এই সনদ পেতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা ঘুরে ঘুরে হয়রান হচ্ছেন। অথচ মোটা অঙ্কের টাকায় এই সনদ সহজেই কিনে নিচ্ছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা। আবার দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেও নাম, জন্ম সনদের সামান্য হেরফেরে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’র গ্লানি জুটছে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার ললাটে।

জানা যায়, চারভাবে নিবন্ধিতরা পাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা সনদ। মুক্তিবার্তায় যাঁদের নাম আছে, তাঁরা সনদ পাচ্ছেন; লাল মুক্তিবার্তায় যাঁদের নাম আছে, তাঁরা পাচ্ছেন; যাঁদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র রয়েছে, তাঁরা পাচ্ছেন আর ভারতে প্রশিক্ষণ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় যাঁদের নাম আছে, তাঁরা সনদ পাচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রী যাঁদের প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন তাঁদের জন্য একটি রেজিস্টার খাতা করা হতো। এখন একটা নাম এলে সেটা ওই রেজিস্টারের সঙ্গে মেলানো হয়। প্রায় সময়ই দেখা যায়, একটা নামের জায়গায় রেজিস্টারে একাধিক নাম রয়েছে। কাটাকাটি করে এসব নাম ঢোকানো হয়েছে। ফলে কোন নামটি আসল আর কোনটি নকল তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পক্ষে। আর এই চার তালিকায় নাম নেই—এমন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ পাওয়া দিবাস্বপ্নের মতো। এই চার তালিকার কোনোটিতেই নাম না থাকায় বছর খানেক ধরে ঘোরাঘুরি করে এখনো সনদ পাননি সাবেক সেনাপ্রধান ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের মহাসচিব লে. জেনারেল (অব.) হারুন অর রশীদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা সত্য যে সব সরকারের অধীনেই মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ দেওয়া নিয়ে রাজনীতি হয়েছে। ১৯৯১ সাল থেকে এই রাজনীতি শুরু হয়ে এখনো চলছে। ’

নিজের সনদ না পাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আমরা যাঁরা সেনাবাহিনীতে ছিলাম, আগে তাঁদের এই সনদের কোনো দরকার হয়নি। কারণ, আমাদের চাকরির নথিপত্রেই এটি উল্লেখ করা ছিল যে আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। এখন আমার সনদের প্রয়োজন হয়েছে। গত বছর আবেদন করেছি। এখনো পাইনি। কবে নাগাদ পাওয়া যাবে তাও জানি না। ’

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন হয়েছে ২০০২ সালে। শুরুতে এলেনবাড়ীতে ছিল মন্ত্রণালয়ের অফিস। এরপর তা এসেছে সচিবালয়ের পাশে সুরম্য ভবনে। ঠিকানা পরিবর্তন হলেও মন্ত্রণালয়ের কাজের ধরনে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের চেয়ারম্যান আবু মোহাম্মদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা শুধু ভাতা ছাড়া আর কিছুই পান না। অন্য সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে গেলেও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা সম্মান পান না, উল্টো অনেক সময় খারাপ ব্যবহার করা হয় তাঁদের সঙ্গে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে বঙ্গভবনে প্রায় ১২ হাজার মানুষকে রাষ্ট্রপতি আমন্ত্রণ জানান। সেখানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হলেও ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয় না।

এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল হান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সেবা প্রাপ্তিতে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য যেসব সুবিধা দিচ্ছে, সেগুলো যাতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা ভোগ করতে পারেন, মন্ত্রণালয় সে ব্যাপারে কাজ করছে। আর যাঁরা ভুয়া সনদ সংগ্রহ করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভুয়া সনদ ইস্যুর সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একাত্তরে জীবনের মায়া ত্যাগ করে মাতৃভূমির স্বাধীনতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষ। তাদের অনেকে শহীদ হয়, অনেকে হয় পঙ্গু। অনেকে সুস্থ দেহেই বিজয়মাল্য পরে। এই মুক্তিযোদ্ধারা কখনোই আত্মত্যাগের স্বীকৃতি চাননি। তালিকায় নাম উঠল কি না তা নিয়েও ভাবেননি।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। তখন থেকে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করা হয়। সাধারণ চাকরি প্রার্থীরা যেখানে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করতে পারেন, মুক্তিযোদ্ধা সনদধারীদের সন্তানদের ক্ষেত্রে তা ৩২ বছর করা হয়। তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরসহ মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ দেওয়া শুরু হয়। শুধু ওই সব সনদধারী মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের সন্তানরা সরকারি এসব সুবিধা পান। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে পরের বছর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করে। তখন বিএনপিও মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ দেওয়া শুরু করে। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধা আরো বাড়ায়। তাঁদের সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত ৩০ শতাংশ চাকরির কোটা মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনি পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের ভর্তিতেও সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি চাকরিতে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমাও বাড়ানো হয়। চালু করা হয় মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, যানবাহনে বিনা ভাড়ায় যাতায়াতের সুবিধাও দেওয়া হয়েছে।

সরকার মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণের জন্য এসব সুবিধার ব্যবস্থা করে প্রশংসিত হলেও সনদের অভাবে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারছেন না। আবার অনিয়ম-দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব আর জালিয়াতি করে অনেক স্বাধীনতাবিরোধীও এসব সনদের মালিক বনে গেছেন। তাঁদের অপতত্পরতায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানহানি হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা চূড়ান্ত করে এই পদ্ধতিটি একটি একক কাঠামোয় এনে দুর্নীতির সব রাস্তা বন্ধ করা দরকার বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তা না হলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা আরো নাজেহাল হবেন। কারণ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করলেও তাঁদের সেবা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া যোদ্ধা ও তাঁদের স্ত্রীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এখনো নানা ধরনের প্রণোদনা রয়েছে। তবে সেখানে অবৈধ যোদ্ধার অনুপ্রবেশ নেই, সুযোগ-সুবিধাগুলোও অনন্তকালের জন্য নয়। কেবল যোদ্ধা ও তাঁর স্ত্রী জীবনভর নানা সুবিধা ভোগ করেন। যোদ্ধাদের একটি তথ্যভাণ্ডার রয়েছে। কোনো রাজ্যে একজন যোদ্ধা বা তাঁর স্ত্রী জীবিত থাকলেও সেখানে একটি অফিস করা আছে, যাতে তাঁর সেবাপ্রাপ্তিতে কোনো অসুবিধা না হয়। তাঁদের মৃত্যুর পর অফিসগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রকাশিত ‘মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহের ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের কার্যাবলি সম্পর্কিত বার্ষিক প্রতিবেদন’-এর তথ্য মতে, মুক্তিযোদ্ধা চাকরিজীবীদের চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের বয়স দুই বছর বৃদ্ধি করার জন্য ১১৪০ জনের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে ৫৩৭ জনকে প্রত্যয়ন করা হয়েছে। বাকি ৭৮৪ জনের গেজেট ও সনদে পার্থক্য থাকায় প্রত্যয়ন করা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং পুত্র-কন্যার পুত্র-কন্যা কোটায় নিয়োগ ও ভর্তির জন্য ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে ২০০৩ জনের সনদপত্র যাচাই-বাছাই করে ১২১৯ জনকে প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে। বাকি ৭৮৪ জনের গেজেট ও সনদে পার্থক্য থাকায় প্রত্যয়ন করা হয়নি।

ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মাসে মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে এক লাখ ৮০ হাজার ১৯৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে মোট এক হাজার ২০০ কোটি টাকা সম্মানী ভাতা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দুই হাজার ৫০০ শহীদ পরিবার, সাত বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারসহ পাঁচ হাজার ৩৩১ জন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে সর্বনিম্ন ৯ হাজার ৭০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা হারে মাসিক সম্মানী ভাতাসহ মোট ১৪৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। এর মধ্যে সম্মানী দেওয়া হয় সাত হাজার ৫৩ জনকে। এ ছাড়া ৬৭৬ জন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে (বীরশ্রেষ্ঠ ১২ হাজার, বীর-উত্তম ১০ হাজার, বীরবিক্রম আট হাজার ও বীরপ্রতীক ছয় হাজার টাকা) মোট ছয় কোটি টাকা মাসিক ভাতা দেওয়া হয়।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই একাধিক মুক্তিযোদ্ধার সনদ ভুয়া প্রমাণিত হচ্ছে। যাঁরা এসব সনদ নিচ্ছেন, শেষ মুহূর্তে তাঁরা চাকরি থেকে বা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা তাঁদের জন্য শাস্তিস্বরূপ। কিন্তু যাঁরা এসব সনদ ইস্যু করছেন, তাঁদের কোনো শাস্তি হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের অন্যতম একজন নীতিনির্ধারক জানান, ভুয়া সনদ ইস্যু করার দায়ে এ পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শাস্তি দেওয়া হয়নি। তবে কাজের ধরনে পরিবর্তন আনার কারণে এখন আর ভুয়া সনদ ইস্যু হচ্ছে না। আগে একসঙ্গে ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধার সনদ যাচাই-বাছাই করার জন্য একটা ফাইলে প্রস্তাব উপস্থাপন করা হতো। পরে সেটা ২৫ জনে নেমে আসে। একপর্যায়ে ১০ জনের সনদ একসঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হতো। এটি খুবই জটিল কাজ। একটা সনদ যাচাই-বাছাই করার সময় কোনো কারণে তা আটকে গেলে পুরো ফাইলই আটকে যেত। এ কারণে তাড়াহুড়ো করে সনদ যাচাই-বাছাই করা হতো। তাতে ভুলভ্রান্তি থেকে যেত। এখন প্রতিটি সনদ যাচাই-বাছাই করার জন্য আলাদা ফাইল উপস্থাপন করা হয়। তাড়াহুড়োয় ভুয়া সনদ ইস্যুর সুযোগ নেই। আগে সনদ ইস্যু করার সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের বাইরের লোকজন জড়িত থাকত। এতে কোনো জবাবদিহিতা ছিল না। তাঁরা ভুয়া সনদ ইস্যু করলেও তাঁদের শাস্তির আওতায় আনা যেত না। এখন সব কাজ করে মন্ত্রণালয়ের লোকজন।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানীদের শনাক্ত করার একক কোনো প্রক্রিয়া বের করা যায়নি। একেক সময় একেক সরকার তাদের মতো করে মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ দিয়েছে। এ কারণে শুরু থেকেই এ প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা।

মন্ত্রণালয়ের পদস্থ একজন কর্মকর্তা জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের শনাক্ত করার একক প্রক্রিয়ার জন্য বিভিন্ন সময় চেষ্টা করা হয়েছে; সরকার থেকে অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই টাকা-পয়সা লুট করে এই প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি একক প্রক্রিয়া নির্ধারণের কাজে বিতর্কিতদের রেখে পুরো প্রক্রিয়াকেই অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তাই এখন আর ঢাকঢোল পিটিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ডাটাব্যাংক না করে অনেকটা গোপনে তা করা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো—মন্ত্রণালয়ের জনবল সংকট। পুরো মন্ত্রণালয়ে জনবল মাত্র ৪৯ জন। তাঁরা দৈনন্দিন কাজ করতেই গলদঘর্ম হচ্ছেন।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আরেক সূত্র জানায়, এখানে আরো একটি সমস্যা হচ্ছে—কোনো কোয়ালিটি অফিসার এই মন্ত্রণালয়ে পোস্টিং নিতে চান না। মুখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে ফেনা তুলে ফেললেও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পোস্টিং হলে তাঁরা তা বাতিল করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরিপ্রাপ্তরাও সেখানে যেতে চান না। সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঁচজন দক্ষ কর্মকর্তা চায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পাঁচজনকেই দিয়েছে, তবে তাঁরা দক্ষ কর্মকর্তা নন, তাঁরা সবাই প্রমোটি অফিসার। দীর্ঘদিন একই পদে চাকরি করে অবসরে যাওয়ার আগ মুহূর্তে তাঁরা পদোন্নতি পেয়ে অফিসার হয়েছেন। বর্তমানে যিনি বিসিএস অফিসার সার্টিফিকেট ইস্যু করেন, তিনিও বদলি হয়ে গেছেন। নতুন কর্মস্থলে দ্রুত চলে যাওয়ার জন্য প্রতিদিনই চেষ্টা করছেন তিনি।

মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় চাকরি পাওয়া একজন সিনিয়র সহকারী সচিব বলেন, মন্ত্রণালয়টি খুবই স্পর্শকাতর। সারা দেশ থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বা তাঁদের পরিবারের সদস্যরা নানা কাজে এখানে ভিড় জমান। তাঁরা কোনো সিস্টেম মানতে চান না। একটু ভুলভ্রান্তি হলেই ক্যারিয়ারে ভয়াবহ সংকট তৈরি হতে পারে, যে সংকটে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল হান্নান নিজে। সচিব উপেক্ষা করেছেন এই অভিযোগ তুলে একজন মুক্তিযোদ্ধা আত্মহত্যা করেছেন। এটা নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সবাই তখন সচিবকে ধিক্কার দিয়েছে। কিন্তু পরে দেখা গেল, আত্মহত্যাকারী মুক্তিযোদ্ধাই নন। এটা সচিবের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। অন্য কোনো অফিসার হলে সম্ভব হতো না।


মন্তব্য