kalerkantho


উগ্রবাদীরাও নাশকতায়

এস এম আজাদ   

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



উগ্রবাদীরাও নাশকতায়

নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলো ছাড়াও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে উগ্রবাদীরা। জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের মতোই তারা লেখক-প্রকাশক, আইনজীবী, পীর-মাশায়েখসহ ভিন্ন মতাদর্শী ব্যক্তিদের হত্যা করার টার্গেট করছে। এমন একটি দলের ছয়জনকে শনাক্ত করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। রাজধানীর কল্যাণপুর এলাকা থেকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করা চারজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে সিটিটিসি ইউনিট চক্রটিকে শনাক্ত করেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ চক্রটি গত মাসে অমর একুশে বইমেলায় নাশকতার চেষ্টা করেছিল। তাতে পুরোপুরি সফল না হয়ে তারা ধর্মীয় বিষয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করা এক আইনজীবী ও মুন্সীগঞ্জের এক পীরকে হত্যার পরিকল্পনা করে। জেএমবি ও এবিটির মতোই পরিকল্পনা থাকলেও তারা এসব সংগঠনে সরাসরি যুক্ত নয়।

গত সোমবার কল্যাণপুর এলাকা থেকে আব্দুর রাজ্জামা উমায়ের, ফয়সাল আহমেদ, আহমেদ ফজলে আকবর ও আবু নাঈম মোহাম্মদ জাকারিয়া নামের চারজনকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি ইউনিট। পরে আদালতের নির্দেশে ওই চারজনকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে এসব তথ্য পাওয়া যায় বলে জানা গেছে।

সূত্র মতে, গত ২২ ফেব্রুয়ারি বইমেলার একটি স্টলে আগুন দেয় ছয়জনের দলটি। তবে ওই আগুন বইমেলায় ছড়িয়ে পড়ার আগেই নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

বইমেলার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দুই অগ্নিসংযোগকারীর ছবি পাওয়া যায়। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি হাতিরঝিল এলাকা থেকে চার জেএমবি সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি ইউনিট। ওই চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং মেলার ঘটনা তদন্তে ছয় উগ্রবাদীর ব্যাপারে তথ্য বেরিয়ে আসে। দলটির প্রধান শেখ সোহান সাদ ওরফে বারা আব্দুল্লাহ জেএমবির মতাদর্শে বিশ্বাসী। হাতিরঝিলে গ্রেপ্তার হওয়া জেএমবি সদস্য আবদুল্লাহ আল মঞ্জু ওরফে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে। বারা আব্দুল্লাহ ও তার এক সহযোগী মিনহাজ এখনো পলাতক। তদন্তকারীরা বলছেন, নিষিদ্ধ সংগঠনের বাইরে থাকা এসব উগ্রবাদীর নতুন কোনো নাশকতার পরিকল্পনা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তাঁরা।

সিটিটিসি ইউনিট প্রধান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ওই চক্রটি গত মাসে বইমেলায় নাশকতার পরিকল্পনা করেছিল। তবে পুলিশের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার কারণে তা সফল হয়নি। পরে দুজনকে হত্যার পরিকল্পনা করে এ দলটি। একজন আইনজীবী, যিনি সংবিধান ও ধর্মীয় বিষয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছিলেন। আরেকজন ঢাকার বাইরের পীর। মনিরুল ইসলাম আরো বলেন, ‘সবখানে জঙ্গিরা এখন লিডারলেস জিহাদ করছে। জেএমবি ও এবিটির মতো এরাও ভিন্ন মতাদর্শীদের টার্গেট করছে। এদের সরাসরি জেএমবি বলা যাবে না। তবে দলের প্রধান শেখ সোহান সাদ ওরফে বারা আব্দুল্লাহ জেএমবির মতাদর্শী। তারা মূলত তাবলিগ করে এমন ধর্মপ্রাণ তরুণদের দলে টানে। গত মাসে গ্রেপ্তার হওয়া মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী জেএমবি সদস্য আব্দুল্লাহর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল। সে এ গ্রুপটির অর্থায়নও করেছে। পলাতক আরেক প্রবাসীসহ একাধিক জেএমবি সদস্য তাদের অর্থদাতা। ’

মনিরুল বলেন, ‘এ গ্রুপটির ধারণা বইমেলায় নাস্তিকদের প্রচুর বই বের হয়। সেখানে ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড চলে। তাই বইমেলাকে টার্গেট করে তারা। এ ছাড়া পীররাও ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে ক্ষতি করছে বলে ধারণা তাদের। এ গ্রুপটির মতো আরো কিছু উগ্রবাদী আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যারা সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন। ’

জানা গেছে, গত ২২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একুশের বইমেলায় শিশু কর্নারের পাশে ৪৯২ নম্বর স্টল পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। পরে ওই স্টলসহ অন্য স্টলের কর্মীরা মিলে আগুন নিভিয়ে ফেলে। আগুনে স্টলের তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

ধরা পড়ল যেভাবে : তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বইমেলার ঘটনায় শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পুলিশ মেলার সিসিটিভি ফুটেজ জব্দ করে। পরে ঘটনাটির তদন্ত শুরু করে ডিবি ও সিটিটিসি ইউনিট। ওই ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৬টা ৭ মিনিটে দাড়িওয়ালা এক ব্যক্তি কাগজ জড়ো করে আগুন দিয়ে চলে যাচ্ছিল। একই সময়ে স্টলের সামনের অংশে আরেক ব্যক্তি বিক্রয়কর্মীর সঙ্গে আলাপ করছিল। তবে ফুটেজে কিছুটা অস্পষ্টতা দেখা যায়। এরপর সন্ধ্যা ৬টা ১৮ মিনিটে ওই দুজনকে রমনা কালীমন্দিরের ফটক দিয়ে একসঙ্গে বেরিয়ে টিএসসির দিকে যেতে দেখা যায়। তাদের একজন বাদামি রঙের পাঞ্জাবি-পাজামা পরা প্রায় ৩৫ বছর বয়সী। তার সঙ্গে থাকা অন্যজন হলুদ-সাদা রঙের টি-শার্ট পরা ছিল। তার বয়স একটু কম।

সিটিটিসি ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, ফুটেজের প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ করে দুজনকে পুরোপুরি শনাক্ত করে পুলিশ। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি হাতিরঝিল এলাকা থেকে হাফেজ জাফর আহম্মেদ, রাসেল আহম্মেদ রিংকু, আবদুল্লাহ আল মঞ্জু ওরফে জাহাঙ্গীর ও রাসেল উদ্দিন নামের জেএমবির চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি ইউনিট। তাদের রিমান্ডে নিয়ে বইমেলায় নাশকতার সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ছয়জনকে শনাক্ত এবং চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।


মন্তব্য