kalerkantho


চাঁদা তুলে ঘুষ দিচ্ছে পিডিবির গ্রাহকরা

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



চাঁদা তুলে ঘুষ দিচ্ছে পিডিবির গ্রাহকরা

বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের ৪০টি উপজেলায় পিডিবির জরাজীর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন আমূল সংস্কারে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। জাইকার অর্থায়নে ‘সেন্ট্রাল জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন প্রজেক্ট’ নামে পাঁচ বছর মেয়াদি বিশেষ এ প্রকল্প ঠিকাদারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে পিডিবি। কিন্তু ঠিকাদার ও পিডিবির অসাধু কর্মকর্তারা যোগসাজশ করে মেতে উঠেছেন ঘুষ-বাণিজ্যে। ফলে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড।

প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী, এর আওতাভুক্ত এলাকার সব বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার ও ট্রান্সফরমার পরিবর্তন করে নতুন পাকা খুঁটি, তার ও ট্রান্সফরমার বসানো হচ্ছে। গত ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কাজ শেষ না হওয়ায় চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। পিডিবির গ্রাহকদের সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে এ সুবিধা পাওয়ার কথা থাকলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে, পিডিবির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীর দোহাই দিয়ে ঠিকাদার ও কাজ তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিতরা গ্রাহকদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো ঘুষ আদায় করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি বসানো হলেও তার না টানিয়ে গ্রাহকদের জিম্মি করা হয়েছে। আবার অনেক এলাকায় প্রয়োজন ছাড়াই লাইন দেওয়া হয়েছে। এসব করা হয়েছে টাকা আদায়ের জন্য। গ্রাহকরা অভিযোগ করছে, মূল প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে ঠিকাদার ও নির্দিষ্ট এলাকা তদারকির দায়িত্বরত ‘টাউন ইনচার্জ’রা অলিখিত চুক্তির ভিত্তিতে ঘুষের বিনিময়ে নতুন নতুন এলাকায় খুঁটি-তার বসিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দিচ্ছেন। চাহিদামতো ঘুষ দিতে গিয়ে গ্রামবাসী চাঁদা পর্যন্ত তুলছে।

প্রকল্পের টাউন ইনচার্জের দায়িত্ব পালনকারী উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সবুজ কালের কণ্ঠকে বলেন, গ্রাহকদের কাছ থেকে একটি টাকা নেওয়ারও সুযোগ নেই। অথচ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ইচ্ছেমতো টাকা নিচ্ছেন। সুনামগঞ্জের মল্লিকপুরে পোল (খুঁটি) দাঁড় করিয়ে রেখে টাকা নিয়ে তারপর তার টানাতে দেখেছেন তিনি। বহু জায়গায় দরকার ছাড়াই টাকা নিয়ে লাইন দেওয়া হয়েছে। কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি চলছে। তিনি বলেন, ‘মহৎ উদ্দেশ্যে সরকার এ উন্নয়ন করছে। অথচ একশ্রেণির ঠিকাদার ও টাউন ইনচার্জ টাকা নিয়ে কাজ করছেন। নিঃস্বার্থভাবে কাজ না করে সবাই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। আসলে কাজের পরিবেশটাই নষ্ট হয়ে গেছে। এভাবে উন্নয়ন হয় না। ’ অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় আট মাস আগে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

প্রকল্পের ৩ নম্বর ডিভিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী চৌধুরী ওবায়দুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রকল্পের শুরুর দিকে এলাকায় মাইকিং করে জনগণকে টাকা-পয়সা না দেওয়া আহ্বান জানানো হয়। তার পরও কেউ টাকা নিয়ে থাকলে গ্রাহকদের অভিযোগ করা উচিত। নয়তো দুর্নীতি রোধ হবে না। তিনি জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে পিডিবির তদন্ত ও শৃঙ্খলা পরিদপ্তর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে।

পিডিবির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মাহবুবুর রহমান ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ শুনতে নারাজ। তিনি বলেন, কেউ হয়তো চাহিদা মতো কাজ করাতে না পেরে এসব অভিযোগ করছে। শোনা কথায় কান না দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে পিডি বলেন, ‘অনেক টাউট-বাটপার-দালাল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওরা পিডির নাম ভাঙিয়ে টাকা-পয়সা তুলছে। এক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতাও টাকা-পয়সা ওঠায়। ’

কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের সংসদ সদস্য মো. আফজাল হোসেন বলেন, ‘সিডিউল মতে বাজিতপুর পৌর শহরের কোনো কাজ না করে ঠিকাদার ঘুষের বিনিময়ে গ্রামাঞ্চলে কাজ করছে। বিষয়টি জানতে পেরে আমি ঠিকাদারকে খবর দিয়েছিলাম। কিন্তু ঠিকাদার আমার সঙ্গে দেখা না করে পালিয়ে যায়। ’

অনুসন্ধানে জানা যায়, কিশোরগঞ্জে সংস্কারকাজ চলছে দুই বছর ধরে। প্রকল্পের ৩ নং ডিভিশনের আওতায় পিডিবি ভৈরবের নির্বাহী প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানে জেলা সদর, বাজিতপুর, কুলিয়ারচর ও ভৈরবে শত কোটি টাকার কাজ চলছে। এর মধ্যে বাজিতপুর শহরে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন আমূল পাল্টানোর কথা। শহরে এক হাজার ১০০টি নতুন খুঁটি (খাম্বা), প্রায় ৫০০ কিলোমিটার তার ও নতুন প্রায় ৫০টি ট্রান্সফরমার স্থাপন করার কথা। এ ছাড়া পিডিবির আওতাভুক্ত উপজেলার সরারচর ও কৈলাগ ইউনিয়নে আরো প্রায় এক হাজার ৪০০টি নতুন খুঁটিসহ তার ও ট্রান্সফরমার স্থাপনের কথা।

কিন্তু ঠিকাদারের লোকজন গত দুই বছরে পৌর শহরে বড়জোর ১৫০টি খুঁটি বসিয়েছে। সরারচর ও কৈলাগ ইউনিয়নেও শিডিউল মতে কোনো কাজ করা হয়নি। ঠিকাদার মোটা অঙ্কের উেকাচের বিনিময়ে এসব এলাকার বাইরে ২৪-২৫ কিলেমিটার দীর্ঘ নতুন লাইন স্থাপন করেছে। ওই সব স্থানে যথারীতি খুঁটি-তার-ট্রান্সফরমার বসে গেছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনও চালু করা হয়েছে।

এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রামাঞ্চলে স্থাপন করা নতুন লাইনে প্রতিটি খুঁটির বিনিময়ে ১০ হাজার টাকা, ১০০ কেভিএ ট্রান্সফরমারের জন্য এক লাখ ও ২৫০ কেভিএ ট্রান্সফরমারের জন্য এক লাখ ২৫ হাজার টাকা ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কেবল বাজিতপুরে বসানো ৪০০ থেকে ৪৫০টি খুঁটি ও ২২-২৩টি ট্রান্সফরমারের জন্য এলাকাবাসীর কাছ থেকে ৬০-৭০ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে।

এ ছাড়া বাজিতপুরের কৈলাগ থেকে বেলভিটা হয়ে হিলচিয়া পর্যন্ত স্থাপিত ১২০টি খুঁটি, তার ও ট্রান্সফরমারের জন্য কেন্দ্র, বিভাগ ও প্রকল্পের লোকেরা মিলিয়ে প্রথম পর্যায়ে নিয়েছে চার লাখ টাকা। হিলচিয়ায় আলাদাভাবে ২৭টি খুঁটি, তার ও ২৫০ কেভিএ ট্রান্সফরমারের জন্য নেওয়া হয়েছে আড়াই লাখ টাকা। দিঘিরপাড় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বালুর মাঠ পর্যন্ত ৩৮টি খুঁটির জন্য ঠিকাদারের লোকজন নিয়েছে দুই লাখ টাকা। বাজিতপুরের ক্ষুদ্র ভাগলপুর থেকে কুলিয়ারচরের পল্লী বিদ্যুৎ এলাকাধীন কোনাপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৫০টি খুঁটিসহ অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য বিভাগীয় পর্যায়ের এক কর্মকর্তা নিয়েছেন ছয় লাখ টাকা।

সরিষাপুরে এক প্রবাসীর সুবিধার জন্য ট্রান্সফরমার ও তারসহ ২০টি খুঁটি বসিয়ে সাবেক এক আবাসিক প্রকৌশলী নিয়েছেন পাঁচ লাখ টাকা। বালিগাঁওয়ে ট্রান্সফরমার ও তারসহ ৩৩টি খুঁটির জন্য জেলা পর্যায়ের এক প্রকৌশলীর সঙ্গে চুক্তি (মৌখিক) হয় ছয় লাখ টাকার। এর মধ্যে দুই লাখ টাকা পরিশোধ করে গ্রামবাসী। ঠিকাদারের লোকজন নোয়াহাটায় ২৫টি খুঁটিসহ অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য নিয়েছে তিন লাখ টাকা। ইব্রাহিমনগর থেকে সাপলেঞ্জা এলাকায় ৩৭টি খুঁটি ও নতুন লাইনের জন্য নেওয়া হয়েছে ছয় লাখ টাকা। উপজেলার একজন জনপ্রতিনিধি তাঁর অটোগ্যারেজের জন্য ২৫০ কেভিএর একটি ট্রান্সফরমার বসানোতেও এক লাখ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন।

সরারচর-তেঘরিয়া ২০ খুঁটি লাইনের জন্য আড়াই লাখ টাকা নেওয়া হয়। এ ছাড়া মাসিমপুরে একটি লাইনের কাজ চলছে। একই গ্রামে অন্য একটি লাইনে এক বছরের বেশি সময় আগে খুঁটি বসানো হলেও কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে কুলিয়ারচরের রায়ান-তাতারকান্দি গ্রামের পাশে প্রায় ৪০টি খুঁটি ফেলে রাখা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ঘুষের টাকা পরিশোধ না করায় এসব কাজ করা হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঠিকাদার হারিছ মিয়া প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও পিডিবির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের ফুফাতো ভাই। ভাইয়ের ক্ষমতার দাপটে ঠিকাদার নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছেন না এবং মূল কাজ রেখে অবৈধ বাণিজ্য করে চলেছেন। প্রকল্পের মালামালও রাখা হচ্ছে পিডির আত্মীয় ভাগলপুরের জামাল মিয়ার বাড়িতে।

বলিয়ারদীর ব্যবসায়ী মো. মস্তু মিয়া জানান, সাপলেঞ্জা চৌরাস্তা এলাকার ৮১টি পরিবারের জন্য ৩৭টি খুঁটি দিয়ে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। গ্রামবাসী চাঁদা তুলে বিদ্যুতের লোকজনকে এর জন্য ছয় লাখ টাকা দিয়েছে। তবে শর্ত অনুযায়ী কাজ না করায় এলাকাবাসী পিডিবির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

পিডিবি সূত্র জানায়, ২০১০ সালে মূল প্রকল্পের ১ নম্বর ডিভিশন ময়মনসিংহ অঞ্চল ও ২ নম্বর ডিভিশন সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলে কাজ শুরু হয়। ২০১৪ সালে ৩ নম্বর ডিভিশন কিশোরগঞ্জ ও মৌলভীবাজার ও ৪ নম্বর ডিভিশন টাঙ্গাইল-শেরপুর-জামালপুর অঞ্চলে কাজ শুরু হয়। সূত্র মতে, ১ ও ৪ নম্বর অঞ্চলের কাজ প্রায় শেষ হলেও ২ ও ৩ নম্বর ডিভিশনে এখনো কাজ চলছে। ১ নম্বর ডিভিশনের নেত্রকোনায় সম্প্রতি কাজ শুরু করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সাতটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র উন্নয়নের কাজও রয়েছে। এর মধ্যে কেবল ৩ নম্বর ডিভিশনে বসবে ১২ হাজার খুঁটি ও ২৫০ ট্রান্সফরমার।

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে এ প্রকল্পের মূল ঠিকাদার এম আর এম ইন্টারন্যাশনাল। কাজটির উপঠিকাদার পিডির মামাতো ভাই মনিরুজ্জামান হারিছ। গত ১৯ মার্চ কালের কণ্ঠ’র এ প্রতিবেদকের সঙ্গে টেলিফোনে উপঠিকাদারের কথা হয়। তিনি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘কেউ প্রমাণ দিতে পারলে ফৌজদারি আইন অনুযায়ী নিশ্চয়ই আমার বিচার হবে। ’ গ্রাহকদের হাতে উপযুক্ত প্রমাণ থাকার কথা জানালে তিনি নিরুত্তর থাকেন।

পিডিবির বাজিতপুরের আবাসিক প্রকৌশলী (আরইই) মো. সালাহউদ্দিন অনুমোদিত কাজ যথাযথভাবে হচ্ছে না স্বীকার করে জানান, প্রকল্পের কাজ তদারকি বা অগ্রগতি জানার দায়িত্ব না থাকায় তাঁর পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়।

প্রকল্পের পরামর্শক (কনসালট্যান্ট) প্রকৌশলী লিয়াকত হোসেনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি কোনো তথ্য দিতে রাজি না হয়ে বলেন, ‘পিডিবির দেওয়া দিকনির্দেশনায় আমাদের চলতে হয়। ’

পিডি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘হারিছ আমার মামাতো ভাই এটা ঠিক। অন্য একজন ঠিকাদারের কাজ সে করছে। হারিছ টাকা-পয়সা কিভাবে নেয়! সে এমন ছেলেই না!’


মন্তব্য