kalerkantho


শোক ভুলে শক্তি দেখানোর ম্যাচ

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শোক ভুলে শক্তি দেখানোর ম্যাচ

বড্ড আশাহীনভাবে শুকিয়ে গেছে প্রত্যাশার বাগান। নিষ্করুণ বাস্তবতায় অসহনীয় হয়ে উঠছে কল্পনাবিলাস।

বারবার সবার কেবলই মনে হয়, ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি জিতলে তো আর এমন খরায় পুড়ত না বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বপ্নের জমিন।

আজ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বৈরথে তাহলে বুনোবৃষ্টির টাপুরটুপুর সুরে কী অন্য রকম আত্মবিশ্বাস নিয়েই না মাঠে নামত বাংলাদেশ!

চীনের দুঃখ হোয়াং হো নদী—সেই ছোটবেলায় সবারই পাঠ্যবইয়ে পড়া। বেঙ্গালুরু-ট্র্যাজেডিতে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসপাঠে এমনই এক দুঃখ চিরস্থায়ী জায়গা করে  নিয়েছে—তিন বলের দুঃখ। সময়ের টাট্টুঘোড়ায় চেপে টগবগিয়ে কত প্রতিপক্ষকে দুমড়ে-মুচড়ে চলে যাবে বাংলাদেশ, একদিন হয়তো করবে বিশ্বজয়ও। বেঙ্গালুরুতে ভারতের বিপক্ষে ওই ৩ বলের কষ্টটা তবু বুকের গোপন গহিনে সময়-অসময়ে মোচড় দিয়ে উঠবে ঠিকই। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ‘হোয়াং হো’ হয়ে থাকবে ওই তিন বলের দুঃস্বপ্ন।

কিন্তু ওই দুঃখবিলাসও-বা এখন করার সময় কোথায়! আজই যে কিউইদের বিপক্ষে মাঠের লড়াইয়ে নেমে পড়তে হচ্ছে মাশরাফি বিন মর্তুজার দলকে! ঝিনুকের খোলসে আবেগকে বন্দি করে পারফরম্যান্সের মুক্তো বের করে আনার চ্যলেঞ্জটা এখানেই। বিশ্ব ক্রিকেটের সমীহ জাগানো শক্তি থেকে পরাশক্তি হয়ে ওঠায় পথে আরেক পদচিহ্ন এঁকে দেওয়ার উপলক্ষ তা। পারবে না বাংলাদেশ?

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে মাশরাফির দলের আবেগের ওপর কম অত্যাচার হয়নি।

শুরুতে তাসকিন আহমেদকে হারিয়ে বিশাল হোঁচট। ভারতের বিপক্ষে হারে আরেক ধাক্কা। প্রতিপক্ষের মাঠে পাগলপারা দর্শক-সমর্থনের বিপরীতে অমন সম্ভাবনার সূর্যটা হেসে উঠতে উঠতেও তো শেষ পর্যন্ত গ্রহণের আঁধার। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগেও এর রেশ অধিনায়ক মাশরাফির কণ্ঠে, ‘এটি খুব হতাশার। ভারতের মাটিতে ওদের ৪০ হাজার দর্শকের সামনে খেলে আমরা জয়ের ভালো সুযোগ তৈরি করতে পেরেছিলাম। কিন্তু জিততে তো আর পারলাম না। এটি অবশ্যই প্রচণ্ড ধাক্কা। আমরা কেউ ভেঙে পড়িনি তবে সবার খুব মন খারাপ। ’ আবার মন খারাপ নিয়ে বসে থাকলে যে চলবে না, সেটিও মনে করিয়ে দেন তিনি, ‘আমরা সবাই শোকের মধ্যে আছি। কিন্তু কেউ কাউকে দোষ দিচ্ছে না। আবার মেনেও নিতে পারছে না। এভাবেও হারতে হলো! এখান থেকে মানসিকভাবে ফিরে আসা কঠিন। তবে খেলোয়াড় হিসেবে ওখানে পড়ে থাকাটা ঠিক হবে না। আগেও বলেছিলাম বাংলাদেশর ক্রিকেট এখানে থেমে থাকবে না। ’

এগিয়ে যাওয়ার পথে আজকের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড। যে ম্যাচকে সামনে রেখে কাল আর অনুশীলন করেনি বাংলাদেশ। কেবল মাশরাফি ইডেন গার্ডেন্সে এসেছিলেন গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার বাধ্যবাধকতা সারতে। সেখানেই কিউইদের বিপক্ষে ভালো কিছু করার তাগিদ অধিনায়কের, ‘আমাদের আবার ক্রিকেটে মনোযোগ দিতে হবে। আরো একটি ম্যাচ যেহেতু বাকি রয়েছে, ভারতের বিপক্ষে খেলা নিয়ে অত চিন্তা না করাই ভালো। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভালো কিছু করলে, সেই ইতিবাচকতা নিয়ে আমরা দেশে ফিরতে পারব। ’ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে ইতিবাচক অনেক নুড়িই কুড়িয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট। এখন অভিযানে শেষবেলায় আরো কিছু সাফল্য নিয়ে যেতে উদগ্রীব মাশরাফি, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে ম্যাচটা বাদ দিলে আমরা অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সঙ্গে ভালো ক্রিকেট খেলেছি। পরিস্থিতি অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খারাপ খেলিনি। ভারতের বিপক্ষে তো ম্যাচে শেষ পর্যন্ত। শেষ দুটো ম্যাচ আমরা ভালো ক্রিকেট খেলেছি। অর্জন করেছি অনেক ইতিবাচক জিনিস। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অমন কিছু করতে পারলে ভালো সম্ভাবনা আছে আমাদের। ’

সাম্প্রতিক সময়ে কিউইদের বিপক্ষে দারুণ রেকর্ড বাংলাদেশের। বিশেষত সর্বশেষ দুটি ওয়ানডে সিরিজের সাত ম্যাচের সাত জয় তাতিয়ে রাখবে মাশরাফির দলকে। ২০১৫ বিশ্বকাপে সর্বশেষ মুখোমুখিতে অবশ্য হারতে হয়েছিল। তবু ব্রেন্ডন ম্যাককালামের উড়তে থাকা দলকে প্রবলভাবে কাঁপিয়ে দেন সেই বাংলাদেশ। চলতি বিশ্বকাপে আগের তিন ম্যাচে জয় কিউইদের, বাংলাদেশের হার আবার সব কটিতে। এই পরিস্থিতিতেও ভালো খেলার আশা ছাড়েন না মাশরাফি, ‘নিউজিল্যান্ড এই কন্ডিশনের সঙ্গে খুব ভালোভাবে মানিয়ে নিয়েছে। বিশ্বকাপে খুব ভালো অবস্থায় আছে তাই। তবে আমাদের তো এই মুহূর্তে হারানোর কিছু নেই। আশা করি, আমরাও ভালো ক্রিকেট খেলতে পারব। ’

বাংলাদেশ দলের জন্য এই ম্যাচটি যেমন আনুষ্ঠানিকতার কেবল, নিউজিল্যান্ডের জন্যও তাই। টানা তিন জয়ে সেমিতে তো আগেই উঠে গেছে তারা! তবু কলকাতার নন্দনকাননে কাল সকালে ঘাম ঝরানো অনুশীলন করে দলটি। প্রতিপক্ষ বাংলাদেশকে যে হালকাভাবে নেওয়ার দিন শেষ, কেউ যে আর সে ভুল করে না—কাল কিউই দলের প্রতিনিধি হয়ে আসা ইশ সোদি বলে যান অমনটাই, ‘এমন কন্ডিশনে ওদের সঙ্গে যতবার খেলেছি, বাংলাদেশ খেলেছে দারুণ প্রতিপক্ষ হিসেবে। ওরা যে কত শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, ভারতের বিপক্ষে শেষ ম্যাচই এর প্রমাণ। ভারতের মতো দলের বিপক্ষে জয়ের এত কাছাকাছি যাওয়া সহজ ব্যাপার নয়। আমার মনে হয় না, বাংলাদেশকে কেউ হালকাভাবে নেয়। ওদের দলে দুর্দান্ত কিছু ক্রিকেটার রয়েছেন। আমাদের কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে আবার ভালো শুরু করতে হবে। ’ আপাত অর্থহীন ম্যাচ হলেও তাতে চ্যালেঞ্জের কমতি দেখেন না তিনি, ‘এত দিন যেসব প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলেছি, তার চেয়ে বাংলাদেশ একেবারে আলাদা। তবে আমরা এটিকে অন্য ম্যাচগুলোর মতোই দেখছি। কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের চ্যালেঞ্জের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে মাঠে তার সঙ্গে লড়াই করার চেষ্টা থাকবে। ’

আর বাংলাদেশের চেষ্টা থাকবে সেই তিন বলের দুঃস্বপ্ন ভোলার। বাংলার ক্রিকেট আবার বুনোবৃষ্টির গানে মাতিয়ে তোলার। টুপুরটাপুর সুরে দুরাশার মাঠ ভিজিয়ে দেওয়ার। বাংলাদেশের জন্য সব ছাপিয়ে আজকের নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটির গুরুত্ব তো সেখানেই!


মন্তব্য