kalerkantho

শনিবার । ২১ জানুয়ারি ২০১৭ । ৮ মাঘ ১৪২৩। ২২ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বিনম্র শ্রদ্ধায় কালরাতের শহীদদের স্মরণ

সংসদ ভবনে ভেসে উঠল বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সংসদ ভবনে ভেসে উঠল বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি

২৫ মার্চের কালরাত স্মরণে গতকাল জাতীয় সংসদ ভবন ঘিরে আলোর যাত্রা কর্মসূচিতে মোমের আলোয় শহীদদের স্মরণ করে জনতা। ছবি : নাভিদ ইশতিয়াক তরু

একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রাতের আঁধারে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সশস্ত্র পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ঢাকার বুকে চালানো হয় নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ। বাঙালির জীবনে নেমে আসে কালরাত। রক্তে ভিজে যায় রাজপথ। ঝরে পড়ে অজস্র নিষ্পাপ প্রাণ। হানাদার বাহিনীরই এক সদস্য পরে তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ঢাকায় সেই রাতে নরকের দরজা খুলে গিয়েছিল। গতকাল শুক্রবার ছিল সেই বিভীষিকার রাত। সেই কালরাতের শহীদদের স্মরণে গতকাল রাজধানীতে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এসবের মধ্যে ছিল আলোক প্রজ্বালন, পদযাত্রা, গান, কবিতা, আলোচনা ইত্যাদি কর্মসূচি। ভয়াল সেই ২৫ মার্চ রাতের স্মরণে গতকাল রাতে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে ‘আলোর যাত্রা’ অনুষ্ঠানে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া হয় প্রজ্বলিত আলো। গ্রামীণফোন আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রজ্বলিত আলো তুলে দেন বিশিষ্টজনরা।

থ্রিডি ম্যাপিং প্রদর্শনী : এর আগে কালরাত স্মরণে জাতীয় সংসদ ভবন ঘিরে প্রদর্শিত হলো ‘থ্রিডি ম্যাপিং প্রদর্শনী’। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে আলোর প্রক্ষেপণে থ্রিডি ভিডিও ম্যাপিংয়ে ভেসে উঠল দেশের পতাকা, জাতির জনকের প্রতিকৃতি এবং বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। গতকাল রাত ৮টা থেকে জমকালো এই খেলা উপভোগ করে লাখো দর্শনার্থী।

ওই সময় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ছাড়াও ভেসে ওঠে দেশের জন্য যাঁরা জীবন দিয়ে গেছেন তাঁদের প্রতিচ্ছবি। নাম না জানা অনেক মুখ এবং আরো অনেক বরেণ্য ব্যক্তিত্বের অবয়ব।

‘সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’—এই স্লোগানে বাংলাদেশকেই তুলে ধরতে এ আয়োজন করা হয়। এতে দেশের বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন, আবদুল হাদীর মতো অর্ধশতাধিক সংগীতশিল্পী। তাঁদের গানে গানে মুখরিত হয় সংসদ ভবন চত্বর।

স্বাধীনতা অর্জন আর তার জন্য লাখো প্রাণ বিসর্জনকে সাধারণ মানুষের কাছে ঐতিহ্যমণ্ডিত করতে এই আয়োজন করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। আজ সন্ধ্যায়ও একই কর্মসূচি থাকবে সংসদ ভবন ঘিরে।

আলোর যাত্রায় নতুন প্রজন্ম : পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে সম্পন্ন হয় ‘আলোর যাত্রা’ শীর্ষক কর্মসূচি। একাত্তরের ২৫ মার্চ ভয়াল রাতের স্মরণে গতকাল রাতে গ্রামীণফোন আয়োজিত ‘আলোর যাত্রা’ অনুষ্ঠানে নতুন প্রজন্মের হাতে তা তুলে দেন বিশিষ্টজনরা।

আলোর যাত্রা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ, চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফরিদুর রেজা সাগর, গ্রামীণফোনের সিইও রাজীব শেঠী প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন শহীদ বুদ্ধিজীবী সন্তান শমী কায়সার।

রাত সাড়ে ১০টায় আলোর যাত্রা অনুষ্ঠান শুরু হয় আবৃত্তিকার শিমূল মুস্তফার কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে। এরপর সংগীতশিল্পী বাপ্পা মজুমদার, পার্থ বড়ুয়া, কোনাল ও এলিটা একে একে গেয়ে শোনান স্বাধীন বাংলা বেতারের ও দেশের গান। এরপর মঞ্চে আসেন নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের। তিনি একাত্তরের ভয়াল সেই ২৫ মার্চের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন নতুন প্রজন্মের কাছে। পাশাপাশি ভিডিও চিত্রে তুলে ধরা হয় একাত্তরের ভয়াল দিনগুলোকে। এরপর বক্তব্য দেন কবি সৈয়দ শামসুল হক।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, একাত্তরের ২৫ মার্চের প্রথম প্রহরেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। তিনি ওই সময় বলেছিলেন, ‘এটিই হতে পারে আমার শেষ ভাষণ। ’ ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানি হানাদাররা ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আমরা লাভ করি স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল একটি ক্ষধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তোলার। ’ স্পিকার বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে প্রজ্বলিত আলো। নতুন প্রজন্ম এই আলো নিয়ে এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। গড়ে তুলবে সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা আর বাস্তবায়ন করবে জাতির জনকের স্বপ্ন। ’

স্পিকারের বক্তব্য শেষ হলে রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া হয় প্রজ্বলিত মোমবাতি। নতুন প্রজন্ম অংশ নেয় মোমবাতি প্রজ্বালনে।

ছবির হাটে প্রাচ্যনাটের লাল যাত্রা : কালরাত স্মরণে গতকাল বিকেলে ‘লাল যাত্রা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নাট্যদল প্রাচ্যনাট। স্বাধীনতার স্মৃতিবিজড়িত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ছবির হাট থেকে বের করা হয় শোভাযাত্রা। কালো পাড়ে আবৃত বিশাল আকৃতির লাল পতাকা হাতে নিয়ে এগিয়ে যায় দলটি। গোলাপের লাল পাপড়ি ছড়াতে ছড়াতে টিএসসি হয়ে স্বাধীনতাস্তম্ভে গিয়ে শেষ হয় এই পদযাত্রা। ওই সময় সবার মুখে উচ্চারিত হয় ‘ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’ গানটি। পুরো আয়োজনটিকে উৎসর্গ করা হয় ধর্ষণ-নির্যাতনে নিহত নাট্যকর্মী তনুকে। পদযাত্রার আগে ছবির হাটে অনুষ্ঠিত হয় লাল যাত্রা শীর্ষক সংক্ষিপ্ত পরিবেশনা। পাকিস্তানি বাহিনীর অতর্কিত হামলায় একটি সুখী-সমৃদ্ধ গ্রামের মানুষের জীবন তছনছ হয়ে যাওয়ার কাহিনী তুলে ধরা হয় এতে।

শিল্পকলার নন্দন মঞ্চে আলোক প্রজ্বালন : সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচির ফলে একাডেমির নন্দন মঞ্চটি যেন হয়ে ওঠে আলোর মিছিল। মঞ্চের তিন ধার ধরে প্রজ্বলিত আলোক শিখার মাধ্যমে স্মরণ করা হয় কালরাতের শহীদদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কালরাত স্মরণ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ২৫ মার্চ কালরাতকে স্মরণ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। এদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে বর্বরোচিত হামলা চালায়। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারী অনেকেই প্রাণ হারান।

গতকালের অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। এতে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজ, উদয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, নীলক্ষেত উচ্চ বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকাগুলোর শিশুরা অংশ নেয়। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, হলের প্রাধ্যক্ষ অসীম সরকার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া সন্ধ্যায় শহীদদের স্মরণে স্থাপনাশিল্পের প্রদর্শন, কালরাত্রি নাটক প্রদর্শন, দেশাত্মবোধক গান ও কবিতা আবৃত্তি এবং মশাল প্রজ্বালন করা হয়। রাত ১১টা ৫৯ মিনিটে শহীদদের ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়।

ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেও সন্ধ্যা ৬টায় ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি চিরন্তনে কালরাত স্মরণে আলোচনা সভার আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালমনাই অ্যাসোসিয়েশন।


মন্তব্য