kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ জানুয়ারি ২০১৭ । ১১ মাঘ ১৪২৩। ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বিদায় কিংবদন্তির ক্রুইফ

সামীউর রহমান   

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিদায় কিংবদন্তির ক্রুইফ

বিশ্বকাপ ফুটবল জেতেননি কখনো, ইউরোতে নেদারল্যান্ডসের তৃতীয় হওয়া দলের সদস্য ছিলেন। তবু ইয়োহান ক্রুইফ বিশ্বের সেরা পাঁচজন ফুটবলারের একজন, আধুনিক ফুটবলের জনক বললেও অত্যুক্তি হবে না।

মাঠে খেলোয়াড় হিসেবে, পরবর্তী সময়ে কোচ হিসেবে দল পরিচালনায়, ফুটবল দর্শনে ক্রুইফের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব আধুনিক ফুটবলে প্রবলভাবে দৃশ্যমান। ডাচ ফুটবলের সেই রাজপুত্র কাল পাড়ি জমিয়েছেন না-ফেরার দেশে। ক্রুইফের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, ২৪ মার্চ বার্সেলোনায় শান্তিপূর্ণ মৃত্যু ঘটেছে তাঁর। মৃত্যুর সময় ক্রুইফের পরিবার ও পরিজন তাঁর পাশে ছিল। ক্রুইফ দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন।

ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখে একটি বার্তায় নিজস্ব ওয়েবসাইটে ক্রুইফ জানিয়েছিলেন, ‘অনেক চিকিৎসা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এটা বলতে পারছি যে ফলগুলো ইতিবাচকই এসেছে। চিকিৎসকদের অশেষ ধন্যবাদ, তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য। কোনো খেলায় প্রথমার্ধ শেষে ২-০ গোলে এগিয়ে থাকার মতোই আনন্দে আছি। জীবনের এই খেলাটা এখনো শেষ হয়নি, তবে আমি নিশ্চিত যে জিতবই। ’ ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ খেলায় ক্যান্সারকে হারাতে পারলেন না ক্রুইফ। একটা সময় প্রচুর ধূমপান করতেন, সেখান থেকেই ফুসফুসে ক্যান্সার। ১৯৯১ সালে হার্ট সার্জারির পর  ধূমপান ছেড়ে দিলেও রোগ তাঁকে ছেড়ে যায়নি। কাতালান সরকারের ধূমপানবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে প্রচারিত বিজ্ঞাপনে ক্রুইফকে বলতে শোনা যেত, ‘ফুটবল আমাকে জীবনে যা দিয়েছে, ধূমপান তার প্রায় সবটুকুই কেড়ে নিয়েছে। ’ শেষ পর্যন্ত জীবনটাও কেড়ে নিল সেই ধূমপানই।

আয়াক্স আমস্টারডাম ক্লাবের সে সময়কার স্টেডিয়াম দে মির থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা দূরত্বে, শ্রমজীবী পরিবারের দ্বিতীয় ছেলে হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার বছরখানেক পর জন্ম ক্রুইফের। ইউরোপের অর্থনীতি তখনো যুদ্ধের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ক্রুইফের বাবা ফুটবল পছন্দ করতেন, অবসরে বড় ছেলে হেনরি আর ছোট ইয়োহানের সঙ্গেও কখনো মেতে উঠতেন খেলার আনন্দে। বাবার মৃত্যুটা কিশোর ক্রুইফকে শোকাতুর করার বদলে ফুটবলার হতে আরো অনুপ্রাণিত করে, বাবার স্বপ্নকে সত্যি করার জন্যই তাঁর জেদটা বেড়ে যায়। অভাবের সংসারে ক্রুইফের মা চাকরি নেন আয়াক্সের স্টেডিয়ামে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে। আর সেই মাঠেই তাঁর ছেলে একসময় ফুটবল নৈপুণ্য দেখিয়ে আদায় করে নেন বৈশ্বিক শ্রেষ্ঠত্ব আর সম্মান।

অস্ট্রিয়ার আর্নেস্ট হ্যাপেল থেকে আয়াক্সের সাবেক কোচ জ্যাক রেনল্ডস, হাঙ্গেরির ম্যাজিকাল ম্যাগায়ার্সের কোচ গুস্তাভ সেবেস, ‘টোটাল ফুটবল’-এর ধারণাটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন অনেকেই। তবে আয়াক্সে রাইনাস মিশেল আর ইয়োহান ক্রুইফের যুগলবন্দিতেই ফুল হয়ে ফোটে ফুটবলের এই নতুন কৌশল। মাঠে শুধু গোলরক্ষকের জায়গাটাই থাকবে নির্দিষ্ট, বাকি ১০ জন ফুটবলারই অংশ হয়ে উঠবেন টোটাল ফুটবল নামের এই কৌশলে, যেখানে রক্ষণ, মাঝমাঠ কিংবা আক্রমণ—সব জায়গাতেই অবিরত গতিপ্রবাহের মতোই ওঠানামা করবেন ফুটবলাররা। এই কৌশলের প্রাণকেন্দ্র ছিলেন ক্রুইফ, নিজেই এককথায় যে কৌশল সমপর্কে  বলেছিলেন, ‘সহজ ফুটবল হচ্ছে সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল, তবে এই সহজ ফুটবলটা খেলাই হচ্ছে কঠিনতম কাজ। ’

আয়াক্সের হয়ে জিতেছিলেন টানা পাঁচটিসহ আটটি ডাচ লিগের শিরোপা, ইউরোপিয়ান কাপ জিতেছিলেন টানা তিন মৌসুম আর সঙ্গে ডাচ কাপ, উয়েফা সুপার কাপ, ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপের মতো শিরোপা তো আছেই ক্রুইফের ক্যারিয়ারে। ১৯৭৩ সালে ট্রান্সফার ফির বিশ্বরেকর্ড গড়ে বার্সেলোনা সে সময়ের ছয় মিলিয়ন গিল্ডার (দুই মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ) দিয়ে তাঁকে নিয়ে আসে ন্যু ক্যাম্পে। ১৯৬০ সালের পর সেবারই প্রথম লিগ জেতে কাতালানরা, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদকে তাদেরই মাঠে ৫-০-তে হারিয়ে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক সাংবাদিক সে সময় কাতালানদের ওপর ক্রুইফের প্রভাব সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘বহু বছর ধরে রাজনীতিবিদরা যা করতে পারেননি, মাত্র ৯০ মিনিটে সেটা করে দেখিয়েছেন ক্রুইফ। ’

১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে এই ডাচ জাদুকরের ‘ক্রুইফ টার্ন’ চোখ ধাঁধিয়ে দেয় বিশ্ববাসীর, পরে যেটা বহুবার করার চেষ্টা করেছেন বিশ্বের বহু ফুটবলার এবং এখনো করে যাচ্ছেন। অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে ক্রুইফের ‘ফ্যান্টম গোল’ এখনো বিখ্যাত, তাঁর ভক্তরা এখনো চেষ্টা করেন ক্রুইফের মতো চোখধাঁধানো এই গোলের অনুকরণে গোল করতে। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে ক্রুইফের নেতৃত্বে টোটাল ফুটবল খেলা নেদারল্যান্ডস দল আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও পূর্ব জার্মানিকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে এবং পশ্চিম জার্মানির শক্তিশালী দল বলে প্রথমবারের মতো পা ছোঁয়ানোর আগেই ১-০-তে পিছিয়ে পড়ে। যদিও পরে জার্মান যন্ত্রের কাছে হার মানে ডাচ শিল্পীরা। খেলোয়াড়ি জীবনের সাফল্য এনে দেওয়া দর্শনকে কোচ হিসেবেও ক্রুইফ ছড়িয়ে দিয়েছেন আয়াক্স ও বার্সেলোনায়। সাফল্য সেখানেও তাঁকে করেছে কুর্নিশ। ১৯৯৫ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে আয়াক্স সেটা অর্ঘ্য হিসেবে নিবেদন করেছিল কোচ ক্রুইফকে, বার্সেলোনায়ও ক্রুইফ গড়েছিলেন ‘স্বপ্নের দল’, যারা জিতেছিল ১১টি শিরোপা। বার্সেলোনার ফুটবলারদের আঁতুড়ঘর যাকে বলা হয়, সেই ‘লা মাসিয়া’ হচ্ছে ক্রুইফের সৃষ্টি, যেখান থেকে আজকের তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তাদের উত্থান। ছোট ছোট পাস এবং দ্রুত জায়গা বদলের যে কৌশল বার্সেলোনার অমিত সাফল্যের কল্যাণে তিকিতাকা নামে সুপরিচিত, সেটাও ক্রুইফের মস্তিষ্কপ্রসূত। খেলোয়াড় হিসেবে, কোচ হিসেবে এবং ফুটবল দার্শনিক হিসেবে এতটা প্রভাব আর কেউই রাখেননি বিশ্বের জনপ্রিয়তম এই খেলায়।

ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন স্পষ্টবাদী, আপস করে চলেননি কখনোই। তাইতো বার্সেলোনা ক্লাবের অনারারি প্রেসিডেন্ট পদটি দেওয়া হয়েছিল তাঁকে; যদিও ২০১০ সালে হুয়ান লাপোর্তার বিরুদ্ধপক্ষ সান্দ্রো রসেল ক্লাবের নতুন প্রেসিডেন্ট হয়ে সেই আলংকারিক পদ কেড়ে নেন। তবে তাতে কি ক্রুইফের গৌরব কমে! তিনবার করে ডাচ ফুটবলের বর্ষসেরা ফুটবলার ও ব্যালন ডি’অর জিতেছেন, হয়েছেন ডাচ বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ, ১৯৭৪ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়, ফুটবলের সর্বকালের সেরা দল, স্বপ্নের দল—কোথায় নেই এই ক্রুইফ! ক্যান্সারের কাছে হার মেনে বাস্তব পৃথিবী থেকে কাল বিদায় নিয়েছেন ক্রুইফ, তবে তাঁর দর্শনটা থেকে যাচ্ছে লা মাসিয়ায় আর ইয়োহান ক্রুইফ কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট ও ফাউন্ডেশনে। ক্রুইফের নামেই হয় ডাচ সুপার কাপ, নেদারল্যান্ডসের বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কারের নামটাও তাঁর নামে। তাই ফুটবল যত দিন থাকবে, তত দিন স্মৃতিতে অম্লান থাকবেন মহান এই ফুটবলশিল্পী।


মন্তব্য