kalerkantho

শনিবার । ২১ জানুয়ারি ২০১৭ । ৮ মাঘ ১৪২৩। ২২ রবিউস সানি ১৪৩৮।


মঠবাড়িয়ায় ভোটকেন্দ্রে গুলি

বিজিবির বাড়াবাড়ি ছিল কি না তদন্ত হচ্ছে

ওমর ফারুক, ঢাকা ও দেবদাস মজুমদার, পিরোজপুর   

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিজিবির বাড়াবাড়ি ছিল কি না তদন্ত হচ্ছে

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় গত মঙ্গলবার রাতে ভোটকেন্দ্রে গুলি করার ক্ষেত্রে বিজিবি অতিরিক্ত কিছু করেছে কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য এরই মধ্যে বিজিবির পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তে অতিরিক্ত কিছু করার প্রমাণ মিললে তাদের শাস্তি ভোগ করতে হবে। বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ গতকাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, গুলি করার আগে দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেট লিখিত নির্দেশ দেন। গুলি চালানোর আগে প্রথমে ফাঁকা গুলি ছুড়ে সতর্ক করেছিলেন বিজিবি সদস্যরা। এর পরও স্থানীয় জনতা ম্যাজিস্ট্রেট, প্রিসাইডিং অফিসার ও বিজিবি সদস্যদের ওপর হামলা করতে চাইলে  বিজিবি গুলি করে।

এদিকে গুলিতে গ্রামবাসী হতাহত হলেও ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের পক্ষ থেকে বুধবার গভীর রাতে মঠবাড়িয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। নির্বাচনের রাতে স্থানীয় ধানীসাফা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশের উপপরিদর্শক সানোয়ার আলী খান এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ জন গ্রামবাসীকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করেন। তবে আসামি হিসেবে কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি।

অন্যদিকে ঘটনার সময় সেখানে দায়িত্বরত অল্প কয়েকজন পুলিশ সদস্য অসহায় হয়ে পড়েছিলেন বলে জানা গেছে। পরে খবর পেয়ে পুলিশের দুটি মোবাইল টিম গিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ঘটনার দিন পিরোজপুর জেলায় ৪০টি ইউনিয়নে ৩৬৬ কেন্দ্রে ভোটগ্রহন চলে। অন্যান্য কেন্দ্রের মতো সাফা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে অস্ত্রধারী তিনজন পুলিশ ও তিনজন আনসার ছিল। পরবর্তী সময়ে সেখানে গণ্ডগোলের কথা শুনে পুলিশের দুটি মোবাইল টিম পাঠানো হয়। তখন পুলিশের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০-এ। চাইলেই আরো পুলিশ পাঠানোর সুযোগ ছিল না। ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রিসাইডিং অফিসার যদি জানেনই যে জাল ভোট হচ্ছে তাহলে তিনি ভোট গণনার সময় প্রতিবাদ না করে ভোট নেওয়ার সময় প্রতিবাদ করলে তো এই সমস্যায় পড়তে হতো না। প্রিসাইডিং অফিসার ও ম্যাজিস্ট্রেটের ধৈর্যচ্যুতির কারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে। ’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিরোজপুরের এসপি ওয়ালিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, পুলিশের গুলিতে কেউ নিহত হয়নি। পুলিশ শটগানের গুলি করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ভোট গণনার সময় চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকরা জানতে পারে, প্রাপ্ত সব ভোট গণনা করা হবে না। এখানে জাল ভোট রয়েছে। এ কথা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে তারা। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রিসাইডিং অফিসার ও ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর হামলা চালাতে গেলে বিজিবি সদস্যরা গুলি করেন।

দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেট কাজী জিয়াউল বাছেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি এলাকার কাউকেই চিনি না. ভোটগ্রহণের শুরু থেকেই কিছু লোক ওই কেন্দ্রে ঝামেলা করছিল। গণনার শেষে তারা স্বাক্ষরবিহীন ব্যালটসহ ফলাফল ঘোষণার দাবি তোলে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, উপজেলা চত্বরে এসে ওই কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। এটা শুনে প্রায় দুই শ লোক লাইট বন্ধ করে দিয়ে দেশীয় অস্ত্রসহ আমাকে আক্রমণের জন্য ঘিরে ফেলে। ওই মুহূর্তে প্রাণ বাঁচাতে গুলির নির্দেশ দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। তারা এতটাই উত্তেজিত ছিল যে তারা আমাকে মেরে ফেলতেও দ্বিধা করত না। ’

বিজিবির এক কর্মকর্তা বলেন, অন্ধকারে গুলি করার সময় দেখা যাচ্ছিল না কারো গায়ে গুলি লাগছে কি না। পরবর্তী সময়ে শোনা যায় দুজন মারা গেছে। এরপর শোনা যায় চারজন, পাঁচজন মারা গেছে।

বিজিবির কোর্ট অব ইনকোয়ারি : বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মঠবাড়িয়ার ঘটনা তদন্তের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোথাও গুলির ঘটনা ঘটলেই আমরা কোর্ট অব ইনকোয়ারি করে থাকি। যদি বিজিবি সদস্যদের গুলি করাটা অনিয়মতান্ত্রিক মনে হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে বিজিবি আইনে বিচার করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এতে চাকরিচ্যুতিসহ জেল পর্যন্ত দেওয়া হয়ে থাকে। ’ 

গতকাল সকালে বিজিবি সদর দপ্তর পিলখানায় মোবাইল বেইজড টেলিকনসালটেশন সাপোর্ট প্রোগ্রাম ও নবগঠিত হাসপাতালে ভিডিও কনফারেন্সিং সুবিধা উদ্বোধন করেন বিজিবি মহাপরিচালক। উদ্বোধন শেষে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে বিজিবি মোতায়েন করা হয় নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী। কিছু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত এবং দুঃখজনক। এ ধরনের ঘটনা কারো জন্য কাম্য নয়। ’ তিনি বলেন, ‘মঠবাড়িয়া নির্বাচনে জাল ভোট মনে করে প্রিসাইডিং অফিসার তা রিজেক্ট করেন। কিন্তু প্রার্থীরা জানান, জাল ভোট কাউন্ট করতে হবে। তা না হলে প্রিসাইডিং অফিসারকে যেতে দেওয়া হবে না। এ সময় প্রিসাইডিং অফিসার ম্যাজিস্ট্রেট জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে ম্যাজিস্ট্রেট জিয়া বিজিবির প্যাট্রল টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। একজন জেসিওর নেতৃত্বে প্যাট্রল টিম ছিল বিজিবির। সেখানে তখন প্রচুর লোকজনের সমাগম হয়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে ক্যান্ডিডেটদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। লোকজনকে চলে যেতে বলেন। এ সময় তারা বলতে থাকে—নির্বাচন বৈধ হয়েছে, ফলাফল ঘোষণা করেন। ফলাফল ঘোষণা না করায় মারমুখী হয়ে ওঠে তারা। তারা বিজিবির ওপর আক্রমণ করতে যায়। এ সময় ম্যাজিস্ট্রেট গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। তখন বিজিবির কর্মকর্তা তাঁর কাছ থেকে লিখিত অনুমতি চান। ম্যাজিস্ট্রেট লিখিত অনুমতি দেওয়ার পর উপস্থিত মারমুখী জনতাকে সরাতে প্রথমে ফাঁকা গুলি ছোড়ে বিজিবি। তখন বিজিবির দিকে এগিয়ে আসে তারা। এ সময় বিজিবি গুলি করতে বাধ্য হয়। তখন খবর পাই—কেউ বলে পাঁচজন মারা গেছে, কেউ বলে ছয়জন মারা গেছে। ইচ্ছে করে কাউকে হত্যা করা হয়নি। ’

এক প্রশ্নের জবাবে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, ‘স্থানীয় জনগণেরও দায়িত্ব-কর্তব্য আছে। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়ী করলে সঠিক হবে না। ’ আরেক প্রশ্নের জবাবে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, ‘বিজিবি কখনো রাবার বুলেট ইউজ করে না। ’

এদিকে মঠবাড়িয়ায় গুলিতে নিহত পাঁচ গ্রামবাসীর লাশ বুধবার সন্ধ্যায় ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। স্বজনরা লাশ নিজ নিজ বাড়িতে নিয়ে গেলে শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শত শত গ্রামবাসী এসব বাড়িতে উপস্থিত হয়ে শোকার্ত স্বজনদের সান্ত্বনা দেয়। পরে জানাজা শেষে লাশ নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজায় শোকার্ত গ্রামবাসীসহ জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অংশ নেয়।


মন্তব্য