kalerkantho

তবু ভোলা যায় না

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তবু ভোলা যায় না

কত উপকারেই তো আসে নদী! কিন্তু নদীভাঙা মানুষের কাছে শেষ পর্যন্ত তা বেদনার সমুদ্রই। ঠিক তেমনিভাবে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ থেকেও বাংলাদেশের পাহাড়সম প্রাপ্তি। তবু শেষে তা অপ্রাপ্তির হিমালয় হয়ে চেপে বসে বুকে। ওই শেষ তিন বলের দুঃস্বপ্নে বিলীন যে আগের ২৩৭ বলের স্বপ্নিল পারফরম্যান্স!

বেঙ্গালুরুর ব্যাটিং উইকেটে ভারতকে ১৪৬ রানে আটকে দিতে পারবে বাংলাদেশ—কে ভেবেছিল! ওই রান টপকে জয়ের সঙ্গে অমন নিঃশ্বাস দূরত্বে চলে আসবে—অতটাও ভাবা যায়নি। শেষ তিন বলে চাই ২ রান। হাতে চার উইকেট, ক্রিজে দুই স্বীকৃত ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদ উল্লাহ। প্যাড পরে অপেক্ষায় শুভাগত হোম। এ অবস্থায় ম্যাচ হারা সম্ভব! কিন্তু বাংলাদেশ তো ঠিকই হেরে যায় ম্যাচটি! শেষ তিন বলে নিতে পারে না একটি রানও; হারায় ৩ উইকেট। ওই অবিশ্বাস্য কাণ্ডটি পরশু সারা রাত দুঃস্বপ্নের মতো তাড়িয়েছে বাংলাদেশ দলকে। কাল তাদের বেঙ্গালুরু থেকে কলকাতার উড়ালজুড়েও নিঃশব্দে উড়ে বেড়ায় সেই আক্ষেপের রেণু।

ভারতবর্ষজুড়ে হোলির রং খেলার দুটো দিনে বাংলাদেশের ক্রিকেট তারকারা রঙ হারিয়ে কী বিবর্ণ যে!

অথচ শেষ ওভারে পর পর দুটো বাউন্ডারিতে মুশফিক আনন্দের স্বর্গোদ্যানের চাবিটা মুঠোবন্দি করেন প্রায়। এরপর বোলার হার্দিক পান্ডের সামনে গিয়ে তাঁর মুষ্টিবদ্ধ উদ্যাপন। জয়ের আগে জয় উদ্যাপনটা ম্যাচ শেষে বুমেরাংয়ের মতো ফিরে আসে তাঁর দিকে। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা অবশ্য তৎক্ষণাৎ সমর্থনের হাত দেন সতীর্থের পিঠে। মুশফিকের অমন উদ্যাপনের বর্ম তুলে এটিকে নেতিবাচক হিসেবে না নেওয়ার আহ্বান তাঁর, ‘এখানে দুটো জিনিস হতে পারে। আমাদের ৬ বলে ১১ রান লাগত। ওই সময়ে দুটি চারে সব কিছু পক্ষে চলে আসছিল। এটি ঠিক যে মুশফিক তখন আরেকটু সতর্ক থাকতে পারত। আবার জয়ের কাছাকাছি দলকে নিয়ে যাওয়ায় ওর ভালো লেগেছে। দুইভাবেই ব্যাপারটি নেওয়া যায়। তবে তা নেতিবাচকভাবে নেওয়ার কিছু নেই। অমন পরিস্থিতিতে দুটো চার মারার পর যেকোনো ব্যাটসম্যানই উদ্দীপ্ত হয়। ’

কিন্তু সেই উদ্দীপনা তো জয়ের আবিরে রাঙিয়ে দিতে পারেননি মুশফিক। জয়ের আগে জয় উদ্যাপনের জন্য না হলেও তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো লোকের সংখ্যা কম না। বাংলাদেশের হৃদয় ভেঙে দেওয়া ওই হারে মুশফিকের মনটও তো গেছে দুমড়ে-মুচড়ে। নিজের ফেসবুক ফ্যান পেজে দলের হারের দায় নিজের কাঁধে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন টেস্ট অধিনায়ক, ‘আমি জানি, গতকালের হারটি আপনাদের জন্য অনেক বেদনাদায়ক ছিল। কিন্তু দলের সকলেই প্রতিটি ম্যাচে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে খেলে। তাই আমার ও দলের সবার জন্যই পরাজয়টা কষ্টকর ছিল। এ রকম সময়ে আমার এভাবে আউট হওয়া ঠিক হয়নি। হয়তো আমার জন্যই দল হেরে গেছে। ’ খোলা চিঠিতে দুঃখ প্রকাশের পাশাপাশি ভবিষ্যতে সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটানোর প্রত্যয়ও মুশফিকের, ‘দেশবাসীর কাছে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আশা করি এটা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আপনাদের মুখে আবারও হাসি এনে দিতে পারব। ’

মুশফিক না হয় ব্যর্থ, ভারতের বিপক্ষে হাসি এনে দেওয়ার সুযোগ তো ছিল মাহমুদ উল্লাহর। স্ট্রাইকে চলে আসেন যখন দুই বলে চাই ২ রান। পান্ডের ফুলটস বলও পেয়ে যান তিনি। কিন্তু যে বলটিকে মাঠের যেকোনো কোনায় পাঠানোর কথা, সেটিকে কিনা ক্যাচ বানালেন মিড উইকেটে! খলনায়কের কাঠগড়ায় এই ব্যাটসম্যানকেও তাই তুলছেন অনেকে। বরাবর কম কথা বলা মাহমুদ নিজের সামনে আত্মরক্ষার বর্ম হিসেবে তুলে ধরেন মহেন্দ্র সিং ধোনির মন্তব্য। ‘অনেক সময় বড় শট খেলে ম্যাচ শেষ করতে ইচ্ছে করে। বিশেষ করে হাতে উইকেট থাকলে মনে হয়, নিজে না পারলেও অন্য কেউ তো দলকে জেতাতে পারবেই। মাহমুদ উল্লাহর জন্য এটি তাই শিক্ষা। ক্রিকেট খেলাটাই এমন। ওই শটটি ছক্কা হলে বলা হতো, দারুণ সাহসিকতা। অথচ এখন করা হচ্ছে সমালোচনা’—ম্যাচের পর ধোনির এই মন্তব্যটা নিজের ফেসবুক পেজে শেয়ার দেন মাহমুদ। কিন্তু হৃদয়ের যে নিরন্তর রক্তক্ষরণ, প্রতিপক্ষ অধিনায়কের সান্ত্বনায় কি আর উপশম হয় তাতে!

পরশু রাতটি বড্ড দীর্ঘ কেটেছে বাংলাদেশ দলের। কাল দিনটিও কম নয়। ভূমিকম্পের পরের ‘আফটার শক’-এর মতো হতভম্ব পুরো দল। তবু দলের মানসিকতার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেই কাল সন্ধ্যায় জানান বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ, ‘ওই ম্যাচটি আমাদের সবার জন্যই ছিল কষ্টের। কিন্তু তা ধরে বসে থাকলে হবে না। আর আগের দিনের চেয়ে দলের মানসিক অবস্থা এখন ভালো। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সামনে আরো একটি ম্যাচ আছে। ভারতের বিপক্ষে খেলা পিছু ফেলে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। ’

কিন্তু চাইলেই কি আর এক রানের এই আক্ষেপ, এই হাহাকার, এই হৃদয় ভাঙার গল্প পিছু ফেলা যায়!


মন্তব্য