kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ । ৪ মাঘ ১৪২৩। ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৮।


শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সাতক্ষীরা ‘টেস্ট কেস’

কাজী হাফিজ   

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সাতক্ষীরা ‘টেস্ট কেস’

নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রথম ধাপের নির্বাচনে সাতক্ষীরার ১৪টি ভোটকেন্দ্রসহ স্থগিত ৬৫টি কেন্দ্রের সব কটির জন্যই সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসারদের মামলা করতে নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরার ১৪টি কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসাররা বাদী হয়ে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডের সদস্য ও সাধারণ ওয়ার্ড সদস্যদের আসামি করে মামলা করেছেন। পরবর্তী ধাপে ইউপি নির্বাচন শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে দৃষ্টান্ত হিসেবে সাতক্ষীরা জেলার উদাহরণকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এ জেলার ১৪টি ভোটকেন্দ্রের ভোট বন্ধ করা হয়। ভোটের আগের গভীর রাতে জোর করে কেন্দ্রে ঢুকে ব্যালট পেপারে সিল মারা, জোর করে প্রিসাইডিং অফিসারের কক্ষে প্রবেশ করে তাঁকে আটকে রাখা ও মারধর করা হয় এ কেন্দ্রগুলোতে। জেলার শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউপির চারটি কেন্দ্রে ব্যালট পেপারে সিল মারে পুলিশের পোশাক পরা দুষ্কৃতকারীরা। একটি কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারকে মারধরও করা হয়। ১৪টি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র দুটি কেন্দ্র—তালা উপজেলার ভাগবহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পুলিশ গুলি ছোড়ে।

সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসারদের প্রতি নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ, ওই ১৪টি কেন্দ্রে যে প্রার্থীদের পক্ষে ব্যালটে সিল মারা হচ্ছিল, সেই প্রার্থীদের প্রধান আসামি করে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালা-২০১০-এর বিধি ৭০ ও ৭৭ অনুযায়ী থানায় মামলা করতে হবে। থানার ওসিদেরও ওই মামলা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ওই প্রার্থীদের গ্রেপ্তার করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া যেসব কেন্দ্রের ভোট লুটে প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি সেই ১১টি কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন-১৯৯১-এর ধারা ৫-এর (৩) উপধারা অনুসারে সাময়িক বরখাস্ত করার জন্য গত মঙ্গলবারই নির্দেশ দিয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার ও সংশ্লিষ্ট পাঁচটি থানার ওসিকে নির্বাচন কমিশনে এসে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য তলব করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে কবে এসব পুলিশ কর্মকর্তাকে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে হাজির হতে হবে তা গতকাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়নি। কমিশন সচিবালয় থেকে এ জন্য এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের একটি তারিখ নির্ধারণের জন্য প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন ইউপিতে যেসব প্রার্থীদের পক্ষে রাতে ব্যালট পেপারে সিল মারার ঘটনা ঘটে তারা আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। কলারোয়ার কুশডাঙ্গা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কার প্রার্থী আসলামুল হক আসলামের পক্ষে সিল মারা হয়। এখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ধানের শীষ মার্কার বিএনপি নেতা সাহাদাত হোসেন।

কলারোয়ার কেরালকাতা ইউনিয়নে নৌকা মার্কার প্রার্থী স ম মোর্শেদ আলীর পক্ষে সিল দেওয়া হয়।   এ ইউপিতে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ফারুক হোসেন অভি। তালার কুমিরা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আজিজুর রহমানের পক্ষে সিল মারা হয়। এখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বর্তমান চেয়ারম্যান বিএনপির গোলাম মোস্তফা। শ্যামনগরে কৈখালী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী রেজাউল করিমের পক্ষে সিল মারা হয়। এ ইউপিতে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শাহ আলম। দেবহাটার পারুলিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শফিকুর রহমানের পক্ষে সিল মারা হয়, এখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের গোলাম ফারুক। সাতক্ষীরা সদরের আলীপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মহিয়ুর রহমানের পক্ষে সিল মারা হয়।  

এদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ ভোটের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, রাতে ভোটকেন্দ্রে অবৈধভাবে জোর করে প্রবেশ করে ব্যালট পেপারে সিল মারার ঘটনা ঘটলে ওই ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের এর দায় নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকেও এর জবাবদিহি করতে হবে। সিইসির এ নির্দেশনা অনুসারেই সাতক্ষীরায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে গতকাল নির্বাচন কমিশন সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান।

এদিকে সাতক্ষীরা ছাড়া বাকি ১২টি জেলার ৫১টি কেন্দ্রের বিষয়ে ঘটনাস্থল, ঘটনার সময়, ঘটনার বিবরণী এবং ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কিত তথ্য দিয়ে মামলা করতে বলা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত নির্দেশনায় সাতক্ষীরার মতো কাকে প্রধান আসামি করে মামলা ও গ্রেপ্তার করতে হবে তা বলা হয়নি।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার প্রথম পর্যায়ের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ও  ব্যালট পেপার ছিনতাইসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে সারা দেশের ১৩ জেলার ৩০ উপজেলার মোট ৬৫টি  কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। এই তালিকায় ভোট স্থগিতের কারণ হিসেবে ২৮টি  কেন্দ্রেই ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার ছিনতাই ও জোর করে ব্যালট পেপারে সিল মারার কথা বলা হয়েছে। সাত হাজারের কাছাকাছি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে এই ৬৫টি কেন্দ্রের ভোট  স্থগিত করা হয়।

সাতক্ষীরার যে ১৪টি কেন্দ্রে ভোটের আগের রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করা হয় সেগুলো হচ্ছে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কুমিরা ইউনিয়নের অভয়তলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাগবহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের আলীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাহমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাড়ুখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গাংনিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নের পূর্ব কৈখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কৈখালী মহাজেরিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শৈলখালী এম ইউ দাখিল মাদ্রাসা, কলারোয়া উপজেলার কুশডাঙ্গা ইউনিয়নের কলাটুপি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাকদহ দাখিল মাদ্রাসা, কেরালকাতা ইউনিয়নের বলিয়ানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া ইউনিয়নের খেজুরবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

এই ১৪টি কেন্দ্র ছাড়া আরো যে ৫১টি স্থগিত কেন্দ্রের বিষয়ে মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো খুলনা জেলার দিঘলিয়া উপজেলার যোগীপাল ইউনিয়নের ফুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যোগীপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার সয়না রঘুনাথপুর ইউনিয়নের হোগলা বেতকা হাই স্কুল, দক্ষিণ বেতকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিয়ালকাঠি ইউনিয়নের মধ্য শিয়ালকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চিরাপাড়া পারসাতুরিয়া ইউনিয়নের বড় বেকটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মঠবাড়িয়া উপজেলার ধানী সাফা ইউনিয়নের উত্তর পাতাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দাউদখালি ইউনিয়নের নলবুনিয়া দাখিল মাদ্রাসা, টিকিকাটা ইউনিয়নের গণেশ হ্যাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড়মাছুয়া ইউনিয়নের ভোলমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ইকড়ি ইউপির ইকড়ি বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মধ্য আতরখালী কমিউনিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর উপজেলার পাটারিরহাট ইউনিয়নের ৪ নম্বর দক্ষিণ চরফলকন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বরগুনা সদর উপজেলার এমবালিয়াতলী ইউনিয়নের জেলখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভোলা সদর উপজেলার বাপ্তা ইউনিয়নের দক্ষিণ চারপোটকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব বাপ্তা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ধনিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ধনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইলিয়াছমিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, দৌলতখান উপজেলার চরখলিফা ইউনিয়নের চর দিদারউল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর চরখলিফা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম চর খলিফা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের বড়কান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভানী ইউনিয়নের খিরাইকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চর জব্বর ইউনিয়নের সমিতি বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দক্ষিণ চর রশিদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পটুয়াখালী সদর উপজেলার মরিচবুনিয়া ইউনিয়নের বাজারঘোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কলাপাড়া উপজেলার চাকামইয়া ইউনিয়নের চুঙ্গাপাশা ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, দশমিনা উপজেলার দশমিনা ইউনিয়নের সৈয়দ জাফর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব দশমিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের পশ্চিমপাড় ডাকুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর বিশ্বাস ইউনিয়নের পূর্ব চর বিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর আগস্থী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পূর্বচর আগস্থী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কলাগাছিয়া ইউনিয়নের মধ্য কল্যাণ কলস প্রস্তাবিত নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাউফল উপজেলার  সূর্যমণি ইউনিয়নের সূর্যমণি নিউ মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নওমালা ইউপির নওমালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার মানিকপুর ইউনিয়নের বাহেরচর পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার বড় মহেশখালী ইউনিয়নের মগরিয়া কাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বরিশালের উজিরপুরের হারতা ইউপির জামবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাকাল ইউপির বিএইচপি একাডেমি, বড়ধা ইউপির আমবৈলা কেরামতিয়া আলিম মাদ্রাসা, সদরের রায়পাশা কড়াপুর ইউপির কড়াপুর পপুলার হাই স্কুল, চরকাউয়া ইউপির পূর্বকর্ণকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাকেরগঞ্জের চরামদ্দি ইউপির গুয়াখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিয়ামতি ইউপির রামনগর এআরকে জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাবুগঞ্জের চাঁদপাশা ইউপির ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রহমতপুর ইউপির রামপট্টি এবতেদায়ি মাদ্রাসা, মেহেদীগঞ্জের চানপুর ইউপির কোলচরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বানারীপাড়ার সৈয়দকাঠি ইউপির ইন্দেরহাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সিলেট সদরের টুকের বাজার ইউপির আখালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।


মন্তব্য