kalerkantho


বিএনপির কমিটি গঠন নিয়ে আঁধারে সবাই

এনাম আবেদীন   

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিএনপির কমিটি গঠন নিয়ে আঁধারে সবাই

জাতীয় কাউন্সিল শেষ হওয়ার পর কমিটি গঠন সামনে রেখে বিএনপির মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। এমনকি নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে উৎকণ্ঠাও।

কারণ দলের মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটিসহ জাতীয় নির্বাহী কমিটি কবে ঘোষণা করা হবে তা নিয়ে ন্যূনতম কোনো ধারণা নেই নেতাকর্মীদের। খোদ স্থায়ী কমিটির সদস্যরাও এ বিষয়ে আছেন অন্ধকারে। এ সুযোগে দলে প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে একে অন্যের বিরুদ্ধে নানা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন প্রতিদ্বন্দ্বী নেতারা। তাঁদের ব্যক্তিগত আলাপচারিতার সূত্র ধরে ছড়িয়ে পড়ছে নানা গুজবও। বিশেষ করে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করায় তাঁর পছন্দ-অপছন্দ উদ্ধৃত করে গুঞ্জন ছড়ানোর সুযোগ মিলছে বেশি। যে যার সুবিধামতো বলে বেড়াচ্ছেন, ‘অমুককে’ তারেক রহমান পছন্দ করছেন না বা ‘অমুককে’ সবুজ সংকেত দিয়েছেন। এ ছাড়া পদ লাভে আগ্রহী নেতারা গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের পাশাপাশি সিনিয়র নেতাদের বাড়ি বাড়ি দৌড়ঝাঁপ করছেন। দলীয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র মতে, তারেক সমর্থক বলে পরিচিত কয়েকজন সর্বশেষ গত মঙ্গলবার গুজব ছড়িয়ে দেন যে দলের সিনিয়র নেতাদের সরিয়ে তরুণদের স্থায়ী কমিটিতে নেওয়া হবে।

শেষ পর্যন্ত সিনিয়র নেতাদের কানেও এ গুজব চলে যায়। তবে একাধিক সিনিয়র নেতার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাঁদের মতে, কমিটি গঠনের পরে এবং কমিটি ঘোষণার আগে এ ধরনের অবস্থা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এর আগে রবিবার রাতে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের এক উপদেষ্টার বাসায় বৈঠক করেন, যেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রভাবশালী একটি দেশের এক কূটনীতিক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই বৈঠকের খবর গয়েশ্বর নিজেই ছড়িয়ে দেন দলের মধ্যে। এ ক্ষেত্রে তাঁর উদ্দেশ্য হলো নেতাকর্মীদের বোঝানো যে প্রভাবশালী দেশটির কূটনীতিকদের সঙ্গে তাঁর সখ্য রয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, গয়েশ্বর রায়ের তৎপরতার মূল লক্ষ্যই হলো মহাসচিব পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঠেকানো। প্রথমদিকে গয়েশ্বর নিজেই মহাসচিব হওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ করেছেন। কিন্তু এখন তৎপরতা চালাচ্ছেন সিনিয়র নেতা তরিকুল ইসলামকে সামনে রেখে। অথচ প্রবীণ নেতা তরিকুল বেশ কিছুদিন যাবৎ খুবই অসুস্থ। গঠনতন্ত্র সংশোধন কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে সর্বশেষ দুটি বৈঠকেও যোগ দিতে পারেননি তিনি। এমনকি অসুস্থতার কারণে গঠনতন্ত্র সংশোধন-সংক্রান্ত প্রস্তাবও তিনি কাউন্সিলে উত্থাপন করতে পারেননি। তাঁর  বদলে কাউন্সিলে ওই প্রস্তাব উত্থাপন করেন স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। এ ছাড়া সম্ভাব্য মহাসচিব পদপ্রার্থী হিসেবে তরিকুল এ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো তৎপরতাও চালাননি। অথচ তাঁর নাম ভাঙিয়ে গয়েশ্বর সমর্থকরা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে তাঁর প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতারাও বসে নেই। দলের ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা এখন লন্ডনে। সেখানে তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি গয়েশ্বরবিরোধী বলে পরিচিত নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, শামসুজ্জামাদ দুদু, আবদুস সালাম ও শিরিন সুলতানাদের পক্ষ থেকেও পাল্টা তৎপরতা চলছে।  

সূত্র মতে, কমিটি গঠন সামনে রেখে কয়েক দিন ধরে পরস্পরবিরোধী নেতাদের এমন তৎপরতায় দলে অস্থিরতা ছড়াচ্ছে। যদিও মহাসচিব হওয়ার ব্যাপারে এক রকম নিশ্চিত হয়ে বসে আছেন মির্জা ফখরুল, কিন্তু তাঁর বিরোধীরা চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে নানাভাবে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে নানা গুঞ্জনও ছাড়াচ্ছে।

সূত্র মতে, গয়েশ্বর সমর্থিত ওই অংশের তৎপরতার মূল লক্ষ্য হলো দলের পাশাপাশি ফখরুলের ব্যাপারে চেয়ারপারসনের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা। পাশাপাশি আবদুল্লাহ আল নোমান ও সাদেক হোসেন খোকার মতো নেতাদের স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি ঠেকানো। ওই দুই নেতা স্থায়ী কমিটিতে গেলে দলে ফখরুলের প্রভাব বাড়বে বলে মনে করছেন গয়েশ্বর সমর্থকরা। এ ছাড়া সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে রুহুল কবীর রিজভীর পদায়নও নিশ্চিত করতে চাইছে ওই অংশ। যদিও গয়েশ্বর সমর্থকদের মধ্যেই একটি অংশ আবার গোপনে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে মোহম্মদ শাহজাহানের পক্ষে কাজ করছে। সব মিলিয়ে আসলে কেউই নিশ্চিত হতে পারছেন না কবে কমিটি ঘোষিত হবে, আর শীর্ষ পদগুলোই বা কারা পাবেন। অনেকের মতে, কমিটি ঘোষণা যত দেরি হবে দলে অস্থিরতা বা অস্বস্তিও ততই বাড়বে।

জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপির মতো বড় একটি দলে কাউন্সিলের পর পদ-পদবি নিয়ে দৌড়ঝাঁপ বা আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। এটিকে অস্থিরতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাঁর মতে, সব দিক দেখেশুনে এবং যাচাই-বাছাই করে চেয়ারপারসন কমিটি ঘোষণা করবেন; সে কারণেই হয়তো কমিটি ঘোষণায় কিছুটা দেরি হচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘কমিটি ঠিক কোন দিন ঘোষণা করা হবে এটি  বলা সম্ভব নয়। তবে সব দিক গুছিয়ে আনতে হয়তো চেয়ারপারসন কিছুটা সময় নেবেন। ’

দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিএনপির মতো বড় একটি দলে পদ-পদবি নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক। সে কারণেই হয়তো মনে হচ্ছে দলে অস্থিরতা চলছে। আসলে কাউন্সিলের পর নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। তারা তৎপর হয়েছে। ’

এদিকে বিএনপির অনেকের ধারণা, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের ফল ঘোষণা এবং স্বাধীনতা দিবসের পর যেকোনো দিন মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটি ঘোষণা করতে পারেন খালেদা জিয়া। সুপ্রিম কোর্টে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ও অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন দুজনই স্থায়ী কমিটির সদস্য হতে চান। অনেকের মতে, স্থায়ী কমিটি আগে ঘোষণা করা হলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে প্রভাব পড়বে—এমন আশঙ্কায় ওই কমিটি ঘোষণা কিছুটা পিছিয়ে গেছে। কারণ দলের স্থায়ী কমিটিতে ওই দুজনের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত নয়। খন্দকার মাহবুব হোসেন আইনজীবী সমিতির বর্তমান সভাপতি আর জয়নাল আবেদীন এবারের নির্বাচনে সভাপতি পদপ্রার্থী।

জানা গেছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে আরো যেসব নাম আলোচিত হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ড. ওসমান ফারুক ও আবদুল আউয়াল মিন্টু। এ ছাড়া মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুসহ আরো কয়েকজন নেতা ওই পদ লাভে আগ্রহী। অথচ শূন্য পদ রয়েছে মাত্র তিনটি। আর বয়োবৃদ্ধ নেতা এম শামসুল ইসলাম ও সারোয়ারি রহমানকে সরিয়ে দিলে শূন্য পদ দাঁড়াবে পাঁচটিতে। কিন্তু খালেদা জিয়া প্রবীণ ওই দুজনকে সরাবেন কি না এ নিয়ে কিছুটা দোটানায় রয়েছেন।

এ ছাড়া সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের একটি, যুগ্ম মহাসচিবের সাতটি এবং প্রত্যেক বিভাগে একটি করে সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ ঘিরেই মূলত নেতাদের দৌড়ঝাঁপ। ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টাসহ নির্বাহী কমিটির অন্যান্য পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা তুলনামূলক কম।


মন্তব্য