kalerkantho


সেনাবোঝাই লঞ্চ ভিড়তেই দেয়নি গ্রামবাসী

হাফিজুর রহমান চয়ন হাওরাঞ্চল   

২৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সেনাবোঝাই লঞ্চ ভিড়তেই দেয়নি গ্রামবাসী

একাত্তরের ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত নেত্রকোনা সদরসহ জেলার প্রতিটি থানা এলাকা ছিল হানাদারমুক্ত। স্থানীয় বিশিষ্টজনদের কাছ থেকে বন্দুক-রিভলবার নিয়ে মহকুমা পুলিশ প্রশাসককে জিম্মি করে কালেক্টরিয়েট ভবনসংলগ্ন পুলিশ অস্ত্রাগার লুট করেছিল নেত্রকোনার ছাত্র-তরুণরা।

পুলিশ অস্ত্রাগার থেকে পাওয়া ৩০০ রাইফেল ও ১০ হাজার রাউন্ড গুলি নিয়ে হানাদারদের মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছিল তরুণসমাজ। সে অবস্থায় ২৩ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে নেত্রকোনা শহরে বিমান হামলা শুরু করে পাকিস্তানি বাহিনী। ফলে শহর হয়ে পড়ে জনশূন্য। সংগ্রামী ছাত্র-তরুণরাও চলে  যায় সীমান্তের ওপারে। মহকুমা সদর ও বিভিন্ন থানা সদর থেকে সংগৃহীত অস্ত্রের মাধ্যমে সেখানে গড়ে তোলা হয় কয়েকটি ক্যাম্প। ২৯ এপ্রিল নেত্রকোনা শহরে ঢোকে পাকিস্তানি সেনারা। দুই দিনের মধ্যে তারা খালিয়াজুরী থানা সদর বাদে সব থানা সদরেও অবস্থান নেয়।

টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনী ও ভালুকার আফসার বাহিনীর মতো স্থানীয় কোনো বাহিনী নেত্রকোনায় গড়ে না উঠলেও মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টায় জেলার বেশ কিছু এলাকা মুক্ত রাখতে সক্ষম হন মুক্তিযোদ্ধারা। তবে এ ক্ষেত্রে স্থানীয় অনেক যুবক-তরুণের ভূমিকাও ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে নেত্রকোনার অনেক ভিন্নতা রয়েছে। জেলার একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে হাওর। রাস্তাঘাটবিহীন দুর্গম এলাকায় যাতায়াত করাটা হানাদার বাহিনীর জন্য ছিল খুবই কঠিন। সংগত কারণেই জেলার মুক্ত এলাকার অন্যতম ছিল খালিয়াজুরী ও মোহনগঞ্জের হাওরাঞ্চল। তা সত্ত্বেও সিলেট-ভৈরব নৌপথের অনেকটাই এ এলাকায় হওয়ায় রুটটি নিয়ন্ত্রণে নিতে লঞ্চ, গানবোট, স্পিডবোট নিয়ে বারবার চেষ্টা করেছে হানাদার বাহিনী। কিন্তু মুক্তবাহিনী ও মুজিব বাহিনীসহ স্থানীয় জনতার প্রতিরোধের মুখে সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

মোহনগঞ্জের চানপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবু সিদ্দিক ও আবু ফয়েজ কেনু এবং মান্দারবাড়ী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন জানান, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা এলাকায় আসার আগে মে মাসে একবার পাকিস্তানি সেনারা লঞ্চযোগে গাগলাজুর বাজারে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু স্থানীয় লোকজন নিজস্ব বন্দুক ও আশপাশের এলাকা থেকে আগে সংগ্রহ করা কিছু অস্ত্র নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করে। প্রতিরোধের মুখে হানাদারদের লঞ্চটি বাজারে ভিড়তেই পারেনি। ওই প্রতিরোধে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে ছিলেন মরহুম আব্দুল খালেক তালুকদার, গোলাম রব্বানী চৌধুরী, মরহুম জানু মিয়া, মরহুম লাট মিয়া প্রমুখ। কম বয়সী তরুণরা ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে চলে যাওয়ার পরও এলাকাটি মুক্ত রাখতে সর্বক্ষণ চেষ্টা করেছেন চানপুর ও মান্দারবাড়ী গ্রামের একদল যুবক। মরহুম আব্দুল খালেক তালুকদার ও মরহুম জানু মিয়ার নেতৃত্বে ওই দলে ছিলেন আনোয়ার মিয়া, মালু মিয়া, মরহুম মুসলিম, মরহুম লোকমান তালুকদার, এখলাস মিয়া, সাত্তার, ফজল হক প্রমুখ।

মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন জানান, নিজ এলাকাসহ আশপাশের এলাকায় আব্দুল খালেক তালুকদার ও জানু মিয়ার অনেক অনুসারী ও প্রভাব ছিল। এর সুবাদে নিজস্ব দলবল নিয়ে তাঁরা মুক্তিবাহিনীর অনুপস্থিতিতেও এলাকাটি মুক্তাঞ্চল হিসেবে রাখতে সক্ষম হন। পাশাপাশি সমাজবিরোধীদের দমনেও সচেষ্ট ছিলেন তাঁরা। মুক্তিবাহিনী থেকে অস্ত্রসহ পালিয়ে লুটপাটে জড়িত কিছু সমাজবিরোধীকে চেষ্টা করেও ধরতে পারছিলেন না সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন এম এ হামিদ (মতিউর রহমান)। তাদের মধ্যে দিরাই থানার রফিনগর গ্রামের আক্কাসকে খালিয়াজুরীর লিপসা থেকে ধরে এনে দিয়েছিলেন আব্দুল খালেক তালুকদার, জানু মিয়া ও তাঁদের সহযোগীরা। এসব কারণে ক্যাপ্টেন হামিদ গাগলাজুর বাজারে মুক্তিযুদ্ধের জন্য নিজের প্রতিনিধি হিসেবে আব্দুল খালেক তালুকদার ও জানু মিয়াকে লিখিতভাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। খালিয়াজুরীর লিপসা ও জগন্নাথপুর এবং ধরমপাশার জয়শ্রী ও রাজাপুর এলাকাকে তাঁদের ‘লিংক স্টেশন’ হিসেবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল।

মুক্তিবাহিনীর ইলিয়াস গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড মুক্তিযোদ্ধা আবু ফয়েজ কেনু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমি ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে ইন্টারমেডিয়েটে পড়তাম। এপ্রিল মাসের তৃতীয় সপ্তাহে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শহরে প্রবেশ করার পর শহর থেকে লোকজনকে বের হতে নিষেধ করে। সেই অবস্থায় গৌরীপুর কলেজের এক শিক্ষকের কাছ থেকে একটি সাইকেল নিয়ে এক কাপড়ে লুকিয়ে আঠারবাড়ী, কেন্দুয়া, তেলিগাতী হয়ে নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাই। ’

অস্ত্র সংগ্রহ প্রসঙ্গে কেনু বলেন, ‘বাড়িতে আসার পরই খবর পাই, ধরমপাশা থানার ধানকুনিয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্টহাউসে একজন পাকিস্তানি মিলিটারি ওয়্যারলেসসহ অবস্থান করছে। আমার বড় ভাই আব্দুল খালেক তালুকদার, চাচাতো ভাই গোলাম রব্বানী চৌধুরী, ফুফাতো ভাই জানু মিয়া ও আবু সিদ্দিক, মান্দারবাড়ী গ্রামের মনোয়ার হোসেন, জয়নাল এবং গাগলাজুর গ্রামের বন্ধু গোলাম মৌলা তালুকদারসহ আরো অনেকে বন্দুক, লাঠিসোঁটাসহ নৌকাযোগে গিয়ে ওই রেস্টহাউস ঘিরে ওয়্যারলেসসহ মিলিটারিকে ধরে আনি। ওই মিলিটারিকে মোহনগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে হস্তান্তর করি। এ ঘটনায় সবার মনোবল চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কয়েক দিন পর দিরাই থানার একটি গ্রাম থেকে আরেকজন মিলিটারিকে ওয়্যারলেস ও অস্ত্রসহ ধরে এনে মোহনগঞ্জে সোপর্দ করি। এ ছাড়া জামালগঞ্জ থানার আমানীপুর গ্রাম থেকে একটি স্টেনগান উদ্ধার করে আনে আমাদের লোকজন। এরপর আমি ও চাচাতো ভাই মুকুল চলে যাই সীমান্তের ওপারে মহেশখলা ইয়ুথ ক্যাম্পে। সেখান থেকে তোরা ট্রেনিং সেন্টারে। রব্বানী চৌধুরী, আবু সিদ্দিক, গোলাম মৌলা, মনোয়ার, জয়নাল, নূরন্নবীসহ অনেকেই মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীতে যোগ দেয়। পরবর্তী সময়টা এলাকা আগলে রাখেন বড় ভাই আব্দুল খালেক, জানু মিয়াসহ অন্যরা। যদিও তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারেননি। ’

এদিকে গ্রামের নিরস্ত্র লোকজন আরেকটি দুঃসাহসী ঘটনা ঘটায় মোহনগঞ্জ থানা সদরের পাশেই বারহাট্টা থানার আলোকদিয়া গ্রামে। প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়, আবদুর রহমান নামের এক পাকিস্তানি সেনা ১৯৭১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আলোকদিয়া গ্রামে যায় ডাবের খোঁজে। স্থানীয় নিরস্ত্র যুবক আব্দুল মতিন ও আব্দুল আজিজ বাড়ির ক্ষেতমজুরদের সহযোগিতায় ওই সেনাকে ধরে জীবিত অবস্থায় মহেশখলায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেন। এতে হানাদাররা ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। পরদিনই তারা আলোকদিয়া গ্রামটি জ্বালিয়ে দেয়।


মন্তব্য