kalerkantho

অকাতরে গুলি কেন!

নিহত ১১ জনের ৯ জনই মারা গেছে পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে, তদন্ত কমিটি গঠন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



অকাতরে গুলি কেন!

প্রথম দফা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে গত মঙ্গলবার পাঁচ জেলায় ১১ জনের প্রাণহানি ঘটে। এদের মধ্যে পরিস্থিতি আমলে না নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অকাতরে গুলিতেই প্রাণ যায় ৯ জনের।

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় একটি ঘটনাতেই পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে পাঁচজনের প্রাণ গেছে। অবরুদ্ধ ম্যাজিস্ট্রেট জনতার হাত থেকে নিজের প্রাণ বাঁচাতেই গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার আগে সেখানে বিশৃঙ্খল কর্মীদের সরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আরেক ঘটনায় কক্সবাজারের টেকনাফে গুজবের ওপর ভিত্তি করে গুলি করায় প্রাণ গেছে দুই নিরীহ কৃষকের। নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার সদর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে পুলিশের গুলিতে। কক্সবাজার ও নেত্রকোনায় কোনো রকম সতর্কতা ছাড়াই পুলিশ গুলি করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশের গুলিতে তিনটি জেলায় এসব প্রাণহানির ঘটনায় তাজা গুলি ছোড়ার আগে কোথাও রাবার বুলেট বা টিয়ার শেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেনি। তাই গুলি করে প্রাণ ক্ষয় না করেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারতেন—এমন কথাও বলছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রার্থী, কর্মী-সমর্থক ও নিহতদের স্বজনরা। মানবাধিকারকর্মীরা তদন্ত দাবি করে বলেছেন, এ ঘটনার দায় নির্বাচন কমিশনও এড়াতে পারে না।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী এলিনা খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন বলতে যা বোঝায়, নির্বাচন কমিশন তা আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সংবাদমাধ্যম, পুলিশ এমনকি আমরাও আগে থেকে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা দিয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে কমিশনকে বলেছিলাম। কমিশন তার কিছুই করেনি। এখন কমিশন বলছে, এসব ঘটনার দায় পুলিশের। এসব কথা বলে নির্বাচনের আগে ও পরের ঘটনার দায় নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারে না। ’

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরাসরি গুলি না করে রাবার বুলেট বা টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে প্রাণহানি এড়াতে পারত। তবে তারা তা করেনি। এ ক্ষেত্রে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দোষী সদস্যদের চিহ্নিত করে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্লোজ বা বরখাস্ত করে দায় এড়ানো যাবে না।

আমাদের পিরোজপুর প্রতিনিধি ও আঞ্চলিক প্রতিনিধি জানান, গতকাল বুধবার সকালে মঠবাড়িয়া শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূূরে সাফা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, ঘটনাস্থলজুড়ে স্থানীয় মানুষের জটলা। লাশ পড়ে থাকার স্থানজুড়ে ছোপ ছোপ রক্ত ও নিহত মানুষের মাথার মগজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, বিজিবি ও র‌্যাব গুলি চালিয়ে রাস্তার ওপর পড়ে থাকা নিহতদের লাশের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ভোট গণনার সময় স্বাক্ষরবিহীন বেশ কিছু ব্যালট বাতিল নিয়ে নির্বাচনী কর্মকর্তা ও প্রশাসনের ওপর আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকরা হামলায় উদ্যত হয়। সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে বিজিবি-পুলিশ গুলি চালায়। এ সময় পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনায় ধানিসাফা ইউনিয়নের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে স্বজনদের আহাজারিতে। থেমে থেমে স্বজনহারাদের কান্নার রোল ভেসে বেড়াচ্ছে। স্তম্ভিত মানুষের একটাই প্রশ্ন—এতগুলো প্রাণ রক্ষার কি কোনো উপায় ছিল না?

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার ২ নম্বর ধানিসাফা ইউনিয়নের সাফা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে প্রাণহানির এই লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা পাশের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার হরিণপালা গ্রামের শাহাদত হোসেন, কামরুল মৃধা ও সোহেল তালুকদার নিহত হন। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বরিশাল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে উপজেলার বুড়িরচর গ্রামের বেলাল হোসেন ও সোলায়মান মোল্লা নামের আরো দুজনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত হওয়া মিশু, ইয়াসিন, রাজীবকে  বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া আহত ২০-২২ জনকে মঠবাড়িয়া, ভাণ্ডারিয়াসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত নৌকা মার্কার সমর্থকদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ধৈর্য না ধরেই চরম অবস্থান নেন।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা মার্কার প্রার্থী হারুন অর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাঁরা আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই গুলি ছোড়ে। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আমার সমর্থকদের গায়ে গুলি ছোড়ে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম মেট্রো রেল প্রকল্পে নিযুক্ত অতিরিক্ত সচিব মোফাজ্জেল হোসেন মন্টু মিয়ার আপন চাচাতো ভাই। মূলত ওই সচিবের হুকুম বাস্তবায়ন করতেই ম্যাজিস্ট্রেট এতটা কঠোর আচরণ করেছেন। তবে সিলবিহীন ব্যালট কিভাবে বক্সে ঢুকল, এর জবাব কেউ দিতে পারেনি। ভোট স্থগিত করার নির্দেশও কেন দেওয়া হলো না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ’

দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেট কাজী জিয়াউল বাছেদ বলেন, ‘আমি এলাকার কাউকেই চিনি না। ভোটগ্রহণের শুরু থেকেই কিছু লোক ওই কেন্দ্রে ঝামেলা করছিল। গণনার শেষে তারা স্বাক্ষরবিহীন ব্যালটসহ ফল ঘোষণার দাবি তোলে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, উপজেলা চত্বরে এসে ওই কেন্দ্রের ফল ঘোষণা করা হবে। এটা শুনে প্রায় দুই শত লোক লাইট বন্ধ করে দিয়ে দেশীয় অস্ত্রসহ আমার ওপর হামলা করতে ঘিরে ফেলে। ওই মুহূর্তে প্রাণ বাঁচাতে গুলির নির্দেশ দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। তারা এতটাই উত্তেজিত ছিল যে তারা আমাকে মেরে ফেলতেও দ্বিধা করত না।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ভাণ্ডারিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মিরাজুল ইসলাম বলেন, ম্যাজিস্ট্রেটকে কেউ আক্রমণ করেনি। ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ, বিজিবি কোনো লাঠিচার্জ বা রাবার বুলেট ছোড়েনি। সরাসরি গুলি করে লাশ ফেলে দিল। চারদিক দিয়ে ঘেরাও করলে লাশগুলো এক জায়গায় পড়ল কেন—প্রশ্ন তাদের।

জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সেখ এবং পুলিশ সুপার মো. ওয়ালিদ হোসেন জানান, এ ব্যাপারে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (জেলা প্রশাসক) এবং পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মানিকহার রহমানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির অপর সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুব্রত হালদার ও মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমান।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বরিশাল রেঞ্জের পুলিশের ডিআইজি মো. হুমায়ূন কবির সাংবাদিকদের বলেন, দুই তদন্ত কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন রাবার বুলেট ব্যবহার করা হলো না, তদন্তে তাও খতিয়ে দেখা হবে।

মঠবাড়িয়া থানার ওসি খন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাফা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে ভোট গণনাকালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হারুন অর রশীদের নৌকা মার্কার স্বাক্ষরবিহীন সাত শতাধিক ব্যালট বাতিল করেন দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং অফিসার দিপাঞ্জল পাল। বিষয়টি জানতে পেরে কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি জানতে চান হারুন অর রশীদ। এ নিয়ে কথাকাটাকাটির সময় কেন্দ্রে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জিয়াউল বাসেতও কেন্দ্রে উপস্থিত হন। তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। এ সময় বাইরে হারুন অর রশীদের ২০০-৩০০ কর্মী-সমর্থক জড়ো হয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তা ও প্রিসাইডিং অফিসারের সঙ্গে বাগিবতণ্ডায় লিপ্ত হন। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর এসব কর্মী-সমর্থক কেন্দ্রে থাকা ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

ওসি আরো জানান, এ পরিস্থিতিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে কেন্দ্রে নিয়োজিত বিজিবি সদস্যরা ২৯ রাউন্ড এবং পুলিশ সদস্যরা ১০ রাউন্ড গুলি ছোড়েন। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত এবং গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরো দুজনের মৃত্যু হয়।

ওই এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মঙ্গলবার রাতেই একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে কয়েক প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে পিরোজপুর জেলা প্রশাসন। এদিকে মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. মাহাফুজুর রহমান জানিয়েছেন, এ ঘটনায় একটি মামলার প্রক্রিয়া চলছে। ধানিসাফা ডিগ্রি কলেজের ভোটকেন্দ্র ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ গাউস বলেন, সাত দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্নের পর কারো গাফিলতি বা দোষ প্রমাণিত হলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এর আগে দুপুর আড়াইটায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খায়রুল আলম শেখ এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ওয়ালিদ হোসেন। এ সময় আশপাশের বাসিন্দাদের কাছে ঘটনার বিবরণ জানতে চান।

বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মো. হুমায়ূন কবির ও বিভাগীয় কমিশনার মো. গাউস গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তাঁরা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ও নিহত পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে সকলে আশ্বস্ত করেন।

মঠবাড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌরসভার মেয়র রফি উদ্দিন আহমেদ ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেন, ধানিসাফা ইউনিয়নের ধানিসাফা কলেজ কেন্দ্রের ফলাফল গণনার শেষে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের প্রার্থী হারুন উর রশীদ ৭৪৬ ভোটে এগিয়ে আছেন। উল্লিখিত ব্যালট ত্রুটিপূর্ণ দেখিয়ে তা বাতিল করে ফলাফল ঘোষণা দিতে গেলে উত্তেজনা দেখা দেয়। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী রফিকুল ইসলামের সমর্থকরা এ ব্যালটগুলো বাতিলের দাবি জানান। এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বাগিবতণ্ডা শুরু হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুলি চালায়।

কক্সবাজার থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী সোনা আলীকে ‘বিজয়ী’ ঘোষণার জন্য কেন্দ্র থেকে ভোটের বাক্স নিয়ে যাওয়ার গুজবই কাল হল নিরীহ দুই গ্রামবাসীর। বাস্তবে এটা স্রেফ গুজবই ছিল। অপরদিকে একই ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপে ভোটকেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের গোলাগুলিতে নিহত হন অপর এক তরুণ। একই ইউনিয়নে দুটি পৃথক ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়াল তিনজনে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পুলিশ গুলি করার আগে গাছ কেটে রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া কর্মীদের সরে যাওয়ার জন্য কোনো সতর্কতা জারি করেনি। তাদের সরে যেতে মাইকিং করা, লাঠিচার্জ করা বা  টিয়ার শেল কিংবা রাবার বুলেট—কোনো কিছুই ব্যবহার না করে সরাসরি তাজা গুলি ছুড়েছে।

টেকনাফ থানার ওসি আবদুল মজিদ গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, সাবরাং ইউনিয়নের মুণ্ডার ডেইল নামক স্থানে রাস্তায় ব্যারিকেডের ঘটনায় গুলিতে ঘটনাস্থলে নিহত হন দুজন। নিহতদের একজন ওই ইউনিয়নে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত চেয়ারম্যান (আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী) নুর হোসেনের ছোট ভাই এবং অন্যজন তাঁর সমর্থক। অন্যদিকে শাহপরীর দ্বীপে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থক ও পুলিশের ত্রিমুখী গোলাগুলিতে গুরুতর আহত মোহাম্মদ শফিক (২২) প্রাণ হারান গভীর রাতে কক্সবাজার হাসপাতালে নেওয়ার পথে।

সাবরাং মুণ্ডার ডেইল নামক স্থানে পুলিশ ও বিজিবির গুলিতেই প্রাণ হারান দুই ব্যক্তি—এমন দাবি করেছেন সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী জাহেদ হোসেন। জাহেদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উপজেলা সদর থেকে পুলিশ-বিজিবি এসে রাস্তায় ব্যারিকেড আর মানুষের জটলা দেখে গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে আমার ভাই আবদুল গফুর (৩৫) পিতা-হাজি আমির হামজা এবং আমাদের প্রতিবেশী মনির আহমদ (৩০) পিতা-আবদুস সালাম প্রাণ হারান। ’

চট্টগ্রাম রেঞ্জের পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) শফিকুল ইসলাম গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ভোটকেন্দ্র দখল ও সরকারি কাজে বাধা দিচ্ছিল একদল দুর্বৃত্ত। এ সময় তাদের সরানোর চেষ্টা করলে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে গুলি চালানো হয়। তবে কোনো রকম সতর্কতা জারি না করে সরাসরি গুলি করা হয়েছে কি না, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

নেত্রকোনা থেকে আমাদের প্রতিনিধি জানান, মঙ্গলবার খালিয়াজুরী উপজেলা সদর ইউনিয়নের আদাউরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ছোট ভাই আবু কাওসার পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন পুলিশের এসআই মো. ফজলুল হক। পুলিশ ঘটনা নিয়ন্ত্রণে ১৩ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এ ঘটনায় ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মোজাম্মেল হক বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী প্রার্থী সানোয়ারুজ্জামান যোসেব কালের কণ্ঠকে জানান, চিৎকার চেঁচামেচি করে উত্তেজিত লোকজন পুলিশের ওপর হামলা করলে তারা এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পরে ভোটবাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি করেছে বলে তিনি শুনেছেন।

গুলির ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত কয়েকজন আওয়ামী লীগের সমর্থক জানান, পুলিশ ছত্রভঙ্গ করতে প্রথমে লাঠিচার্জ করে। তবে তাতে কাজ হয়নি। এ সময় উচ্ছৃঙ্খল কর্মীদের লাঠির আঘাতে মাথায় ব্যথা পেয়ে মাটিতে পড়ে যান এক পুলিশ সদস্য। তখন অন্য পুলিশ সদস্য কর্মীদের ধাক্কা দিয়ে সরানোর চেষ্টা করলে সেখানে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। তখন পুলিশ রাইফেল দিয়ে গুলি ছোড়ে।  

আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী আবু ইসাকের ছোট ভাই আরিফুল ইসলাম ফালাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সন্ধ্যা ৭টার পর একপর্যায়ে ব্যালটবাক্স ও ফলাফলের কাগজপত্র ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। তখন ধাক্কাধাক্কিতে পুলিশও আহত হয়। ফলে পুলিশ গুলি করে। ওই সময় সোয়েব ও যোসেবও গুলি করে। এতে আমার ভাই নিহত হয়েছেন। তবে কার গুলিতে নিহত হয়েছেন তা বলতে পারছি না। ’

নেত্রকোনা জেলা পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী কালের কণ্ঠকে জানান, পিস্তলের ৮ রাউন্ড ও শর্টগানের ৫ রাউন্ড গুলি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে খালিয়াজুরী থানায় প্রিসাইডিং অফিসার বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। তবে কার গুলিতে কাওসার নিহত হয়েছেন তা ময়নাতদন্তে জানা যাবে।


মন্তব্য