kalerkantho


মঠবাড়িয়ায় তুলকালাম

ভোট বাতিল কর্মকর্তা অবরুদ্ধ উদ্ধারে গুলি

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল ও আঞ্চলিক প্রতিনিধি, পিরোজপুর   

২৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ভোট বাতিল কর্মকর্তা অবরুদ্ধ উদ্ধারে গুলি

প্রতিদ্বন্দ্ব্বী দুই চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও তাঁদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ভোট গণনা চলছিল। একপর্যায়ে নৌকা প্রতীকের কয়েক শ ব্যালট বাতিলের তালিকায় ফেলে দেন নির্বাচনী কর্মকর্তা। এ নিয়ে বাগিবতণ্ডার জের ধরে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা কেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে ফেলে। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুলি ছুড়লে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হন। গুলিবিদ্ধ আটজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান আরো দুজন। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার ধানীসাফা ইউনিয়নের সাফা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন পাশের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার হরিণপালা গ্রামের আওয়ামী লীগ সমর্থক মো. শাহাদাত হোসেন (৩৫), বুড়িরচর গ্রামের সোহেল মিয়া (২৫), বেল্লাল হোসেন (২৫), সোলায়মান মিয়া (২৭) ও হরিণপালা গ্রামের কামরুল মৃধা (৩০)। সোহেল ও বেল্লাল ধানীসাফা ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হারুন অর রশীদের ভাগ্নে। গুলিবিদ্ধ পাঁচজনকে সংকটজনক অবস্থায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ভোটগ্রহণ শেষে সাফা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে ভোট গণনা চলছিল। এ সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থী হারুন অর রশীদের নৌকা প্রতীকের ত্রুটিপূর্ণ ৭০০ ভোট বাতিল ঘোষণা করেন কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার।

এতে ভোটকেন্দ্রের আশপাশে থাকা আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায় তারা বাতিল করা ব্যালটসহ ফের ভোট গণনার দাবি তোলে। এ নিয়ে নির্বাচনে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের বাগিবতণ্ডা হয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থকরা ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রিসাইডিং অফিসারসহ অন্য কর্মকর্তাদের কেন্দ্রের ভেতর অবরুদ্ধ করে ফেলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাত সাড়ে ৮টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। গুলিতে ঘটনাস্থলে তিনজন নিহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরো দুজন মারা যান। এ ঘটনার পর পুরো এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী আবদুর রহমান বলেন, তিনি কোনো রকমে অত্মরক্ষা করতে পারলেও তাঁর ভাতিজা বাদলের শরীরে গুলি লেগেছে। বাদলকে নিয়ে শের-ই-বাংলা মেডিক্যালে এসেছেন তিনি। গতকাল রাতের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীকে ভোট গণনার মাধ্যমে কৌশলে পরাজিত করার বিষয়টি লোকমুখে তাঁরা জানতে পারেন। তখন ওই এলাকার সহস্রাধিক কর্মী-সমর্থক কেন্দ্রের সামনে জড়ো হয়ে ফল স্থগিতের পাশাপাশি পুনরায় ভোট গণনার দাবি তুলে মিছিল শুরু করে। তখন কেন্দ্রের ভেতর থেকে এলোপাতাড়ি গুলি শুরু হয়।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী হাফিজুর রহমান বলেন, কলেজ মাঠের দুই দিকে দুই চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর পক্ষে স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল। এক পক্ষ ফল স্থগিতের পাশাপাশি পুনরায় ভোট গণনার দাবি তোলে। আরেক পক্ষ ফল ঘোষণার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের ভেতরে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গুলি শুরু করেন।

ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মঠবাড়িয়া সরকারি কলেজের শিক্ষক দ্বীপাঞ্চল পাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভোট গণনা শেষে ফল আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিপক্ষে গেলে তিনি ফল ঘোষণা স্থগিত রাখতে বলেন। আমি অপারগতা প্রকাশ করায় তাঁর কর্মী-সমর্থকরা আমাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জানালে তারাও কেন্দ্রে আসে। তাদেরও অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে নিজেরা অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্তি পায়, আমাদেরও অবমুক্ত করে। ’ তবে ওই কেন্দ্রে কত ভোট বাতিল হয়েছে সে ব্যাপারে কোনো তথ্য দেননি তিনি।

সাফা কলেজ কেন্দ্রে দায়িত্বরত ঢাকা ওয়াসার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজী জিয়াউল বাসেত (সিনিয়র সহকারী সচিব) বলেন, ‘সন্ধ্যার পর আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সমর্থকরা ফল পাল্টানোর জন্য আমাকে অবরুদ্ধ করে মেরে ফেলার চেষ্টা করলে আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা চাই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছত্রভঙ্গ করতে বাধ্য হয়ে গুলি চালায়। ’

মঠবাড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র রফিউদ্দিন আহমেদ ফেরদৌস জানান, ফল ঘোষণা নিয়ে দুই চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর কর্মীদের সঙ্গে নির্বাচন কর্মকর্তার কথাকাটাকাটি বাধে। এ সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে তাঁদের ঘিরে রাখার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর গুলি চালিয়ে পাঁচজনকে মেরে ফেলেন।

পিরোজপুরে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ সাংবাদিকদের জানান, ফল ঘোষণায় বাধাদানসহ নির্বাচন কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ রাখার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গুলি চালিয়েছেন। ওই ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন।


মন্তব্য