kalerkantho


কুড়িগ্রামে ধর্মান্তরিত মুক্তিযোদ্ধাকে গলা কেটে হত্যা

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি   

২৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কুড়িগ্রামে ধর্মান্তরিত মুক্তিযোদ্ধাকে গলা কেটে হত্যা

স্বজনদের আহাজারি

কুড়িগ্রামে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করা এক মুক্তিযোদ্ধাকে নিজের বাড়ির পাশে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল মঙ্গলবার সকালে জেলা শহরের গালিয়ালপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

পরে দুর্বৃত্তরা হাতবোমা ফাটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে পালিয়ে যায়।

নিহত মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলী (৬৮) সদর উপজেলার মোগলবাসা ইউনিয়নের চর সিতাইঝাড় এলাকার মৃত ছেপাত উল্লাহর ছেলে। শহরের গালিয়ালপাড়ায় তাঁর বাসভবন। তিনি পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক খান মো. নুরুল আমিন,  পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তবারক উল্লাহসহ প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের লোকজন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় পুলিশ সুপার এ হত্যাকাণ্ডকে পূর্বপরিকল্পিত মন্তব্য করে বলেন, ‘উগ্রপন্থীরা, নাকি শত্রুতা থেকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে তা আমরা খতিয়ে দেখছি। এরই মধ্যে সন্দেহভাজন হিসেবে তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ’

ঘটনার কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবার জানায়, প্রতিদিনের মতো সকাল ৭টার দিকে বাড়ি থেকে প্রায় আড়াই শ গজ দূরে আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন কুড়িগ্রাম-জিগামারীঘাট পাকা রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করছিলেন হোসেন আলী। সে সময় রাস্তায় মানুষজন খুব একটা ছিল না।

হঠাৎ শহরের দাদা মোড়ের দিক থেকে একটি মোটরসাইকেলে করে তিন যুবক এসে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে তাঁর গলায় কোপ মারে। এতে গলার বেশির ভাগ অংশ কেটে গিয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এ সময় চিৎকার, হইচই শুনে স্থানীয়রা ছুটে এলে ঘাতকরা দুটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তালতলা হয়ে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের পেছনের রাস্তা ধরে পালিয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী কবির হোসেন ও নয়ন জানান, কালো রঙের ১৩৫ সিসি ডিসকভার একটি মোটরসাইকেলে এসে ২৫ থেকে ৩০ বছরের তিন যুবক চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যে হত্যার ঘটনাটি ঘটায়। খুনিদের দুজনের মাথায় হেলমেট ছিল। পালিয়ে যাওয়ার সময় কৃষ্ণপুর এলাকায় স্থানীয়রা গাছের গুঁড়ি ফেলে আটকানোর চেষ্টা করলেও খুনিরা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে পালিয়ে যায়।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম টুকু জানিয়েছেন, হোসেন আলী একাত্তরের রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা সনদ নম্বর ম-৯৪৭৩৫৫ এবং স্বারক নম্বর বি/ম/সা/কুড়িগ্রাম/প্র:৩/৪৩/২০০২/২৯৮০। টুকু বলেন, ‘স্বাধীনতার মাসে একজন মুক্তিযোদ্ধার এমন মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। অবিলম্বে খুনিদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি। ’

কুড়িগ্রাম জেলার পাস্তর (ধর্মযাজক) রেভারেন্ট ফোরকান আল মসিহ জানান, মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলী ১৯৯৯ সালে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে সহকারী পাস্তর হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন। এলাকায় কারো সঙ্গে তাঁর কখনোই বিরোধ ছিল না।

হোসেন আলীর ছেলে রাহুল আমিন আজাদ বলেন, ‘প্রয়োজন ছাড়া বাবা বাড়ির বাইরে যেতেন না। কারো সঙ্গে কোনো শত্রুতা ছিল না। বাড়িতেই ধর্মচর্চা করতেন। ধর্মান্তরিত হওয়া নিয়ে বড় বোন হাসিনা বেগম অসন্তুষ্ট ছিল, সে বিষয়টি মেনে নেয়নি। কিন্তু মা, আমি ও ছোট বোন নাসিমা এটা মেনে নিয়ে বাবার পক্ষে ছিলাম। ’

আজাদ জানায়, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে আবুল বাশির নামের এক যুবক নিজেকে রংপুরের মাহিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা পরিচয় দিয়ে হোসেন আলীর বাসা ভাড়া নেয়। ২৫-২৬ বছর বয়সী ওই যুবক শনিবার থেকে বাসায় নেই। তার দেওয়া ন্যাশনাল আইডি নাম্বার ও মোবাইল ফোন নাম্বারও এখন দেখা যাচ্ছে ভুয়া।

কুড়িগ্রাম সদর থানার ওসি (তদন্ত) মো. রুহানী জানান, হত্যার ঘটনায় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ উদ্ধার করে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্নধর্মাবলম্বী বা মতাবলম্বী ও বিদেশি নাগরিকদের ওপর একই ধরনের বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে হিন্দু ধর্মগুরুকে গলা কেটে হত্যা, ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানের সড়কে ইতালির এক নাগরিককে গুলি করে হত্যা, ৩ অক্টোবর রংপুরের কাউনিয়ায় জাপানের এক নাগরিককে গুলি করে হত্যা, ৫ অক্টোবর পাবনার ঈশ্বরদীতে খ্রিস্টান ধর্মযাজককে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা, ১৮ নভেম্বর দিনাজপুরে ইতালীয় চিকিৎসক ও ধর্মযাজককে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় পরপরই বিদেশি একটি ওয়েবসাইটে জঙ্গি সংগঠন আইএস দায় স্বীকার করেছে বলে দাবি করা হলেও প্রতিবারই পুলিশ দেশে আইএসের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছে।


মন্তব্য