kalerkantho


‘অপারেশন কাটাখালী ব্রিজ’

হাকিম বাবুল, শেরপুর   

২৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘অপারেশন কাটাখালী ব্রিজ’

মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো শেরপুরেরও রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। এর মধ্যে ‘অপারেশন কাটাখালী ব্রিজ’ অন্যতম একটি ঘটনা। একাত্তরের ৫ জুলাই দিবাগত রাতে সংঘটিত হয় এই অবিস্মরণীয় অভিযান।

শেরপুর জেলার কাটাখালী ব্রিজ ও তিনানী ফেরি ধ্বংসের সফল অপারেশন শেষে পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে এক সম্মুখ সমরে শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল আহসান, মোফাজ্জল হোসেন ও আলী হোসেন। আহত হন অনেকে। আর মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ায় নির্যাতনের শিকার হয় রাঙ্গামাটি গ্রামের মানুষ।

ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদের পঞ্চম বর্ষের মেধাবী ছাত্র নাজমুল আহসান ছিলেন ১১ নম্বর সেক্টরের অধীন ১ নম্বর কম্পানির কমান্ডার। এই কম্পানিতে সদস্য ছিলেন ১৩৯ জন। ‘ময়মনসিংহ সেক্টর’ নামে খ্যাত এই সেক্টরে নাজমুল কম্পানি ছাড়াও চুন্নু কম্পানি ও তারা কম্পানি নামে আরো দুটি কম্পানি ছিল। এদের মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বর্তমান ‘ওয়েস্ট গাড়ো হিল’ জেলার রংনাবাগ পাহাড়ে। চারটি ক্যাম্পের অবস্থান ছিল ডালু, বাঘমারা, রংড়া ও পোড়াখাসিয়ায়। এই ক্যাম্পগুলোর অপারেশন ইন্সট্রাক্টর ছিলেন বিএসএফ ক্যাপ্টেন বালজিৎ সিং।

১১ নম্বর সেক্টরের নির্ধারিত এলাকা বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হানাদার বাহিনীর গণহত্যাসহ নানা অপকর্ম প্রতিহত করতে পাকিস্তানি সেনাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সে লক্ষ্যেই সীমান্ত এলাকার যোগাযোগ রক্ষাকারী গুরুত্বপূর্ণ কাটাখালী ব্রিজ ও তিনানী ফেরি ধ্বংসের সিদ্ধান্ত হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এই অভিযানে পর পর দুটি মুক্তিযোদ্ধা দল পাঠানো হয়। তারা ব্যর্থ হলে মুক্তিযোদ্ধাদের কটাক্ষ করেন ক্যাপ্টেন বালজিৎ সিং। এটাকে সহজভাবে নিতে পারেননি অকুতোভয় নাজমুল। অনেকটা জোর করেই এই দুঃসাহসিক অভিযানের দায়িত্ব তুলে নেন নিজ কাঁধে।

৪ জুলাই দুপুরে নাজমুল কম্পানির যোদ্ধাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নাজমুল বললেন, ‘তোমরা যারা এই মুহূর্তে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত আছ, তারা অন্য লাইনে এসে দাঁড়াও। ’ এই আহ্বানে সাড়া দেন নালিতাবাড়ী উপজেলার মোফাজ্জল হোসেন, আলী হোসেন, আবদুল হালিম উকিল, মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল, জিয়াউল হক মাস্টার, আবু সাঈদ মাস্টার, রজব আলী, আবদুল উয়াহাব, মোজাফ্ফর, ইছামদ্দিন, আবদুর রহমান, ওয়াজেদ আলী মাস্টারসহ ২০ যোদ্ধা। প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে দলে যোগ দেন আবদুল গণির নেতৃত্বে আরো ৩৩ জন। শুরু হলো ডালু ক্যাম্প থেকে নাজমুলের নেতৃত্বে ৫৪ যোদ্ধার পদযাত্রা। সঙ্গে ৫১টি রাইফেল, তিনটি এসএমজি ও ব্রিজ ধ্বংসের জন্য ৩০০ পাউন্ড ‘পিকে ওয়ান’ এক্সপ্লোসিভ।

সূর্যনগরের অদূরে একটি গ্রামে সারা দিন আত্মগোপনে থেকে ৫ জুলাই অধিনায়ক দলটিকে দুই ভাগ করেন। একটি দলে ৩৩ জন অন্য দলে ২১ জন। আবদুল গণির নেতৃত্বে ৩৩ জনের দলকে তিনানী ফেরি ধ্বংসের জন্য পাঠানো হয়। নাজমুল ২০ জনের দল নিয়ে নৌকাযোগে রওনা হন কাঁটাখালী ব্রিজের দিকে। সন্ধ্যার পরপরই শুরু হয় বর্ষণ। অবশেষে নৌকা এসে থামে শেরপুরের কালিবাড়ী বাজারে। সেখান থেকে হেঁটে ব্রিজের দুই পাশে পাহারারত রাজাকারদের গতিবিধি লক্ষ্য করে নাজমুল দলকে দুই ভাগ করেন এবং অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে ব্রিজটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার নির্দেশ দেন। সঙ্গে সঙ্গে সহযোদ্ধারা ক্রলিং করে ঢুকে প্রথমে সেন্ট্রি পোস্টের রাজাকারদের অস্ত্রসহ ধরে ফেলে। দ্বিতীয় প্রহরী দলটি টের পেয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে কোয়ারি রোডে হানাদার ক্যাম্পের দিকে পালিয়ে যায়। ইতিমধ্যে নাজমুল কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে এক্সপ্লোসিভ স্থাপন করে ডেটোনেটরে আগুন দেন। কয়েক মিনিট পরই প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে পড়ে বিশাল সেতুটি। একই সঙ্গে শোনা যায় তিনানী ফেরি ধ্বংসের আওয়াজ। সফল অভিযান শেষে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গা ঢাকা দিতে উভয় দলই সূর্যোদয়ের আগেই উপস্থিত হয় পাশের রাঙ্গামাটি গ্রামের কৃষক নাঈমুদ্দিনের বাড়িতে।

৬ জুলাই সকালে গ্রামবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার-দাবার আয়োজনে ব্যস্ত। ওদিকে হানাদারদের দোসর জালাল মিস্ত্রি ও তার ভাই রাজাকার হক আলী মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রামে অবস্থানের খবর পৌঁছে দেয় হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে। হিংস্র হায়েনার দল সাদা পোশাকে অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে গ্রামটিকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে। অবরুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধারা হানাদারদের মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু গ্রামবাসী সায় না দেওয়ায় বিশেষত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবে মুক্তিসেনারা পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু কিভাবে?

গ্রামটির পূর্বদিকের রাস্তাটি ২০০ গজ পরই বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে একটি খাল দিয়ে। উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত রাঙ্গামাটি খালটি কানায় কানায় পূর্ণ। আর পশ্চিমে বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী একমাত্র রাস্তাটি অবরুদ্ধ। দলনেতা সহযোদ্ধাদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন বিলের পানিতে। আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় গুলি। আবু সাঈদ মাস্টারের হাতে গুলি লাগে। নকলার আবদুল জব্বারের কপালে গুলি লাগে। ঊরুতে গুলিবিদ্ধ হন মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল। এ অবস্থায় সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে শত্রুর মোকাবিলায় অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে যান দলনেতা নাজমুল। একপর্যায়ে শত্রুর এক ঝাঁক গুলি এসে বিদ্ধ হয় নাজমুলের শরীরে। লুটিয়ে পড়েন তিনি। তাঁকে ধরতে এসে গুলিবিদ্ধ হন চাচাতো ভাই মোফাজ্জল হোসেন। শহীদ হন নাজমুলের ভাতিজা আলী হোসেনও। একই পরিবারের তিন বীর সন্তানকে বিলের পানিতে রেখে দীর্ঘ চার-পাঁচ ঘণ্টা সাঁতরে সহযোদ্ধারা পৌঁছেন সূর্যনগর গ্রামে।

এদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ায় হানাদাররা রাঙ্গামাটি গ্রামের নিরীহ মানুষের ওপর চালায় অমানসিক নির্যাতন। ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সঙ্গে চলে লুটপাট। নারীদের ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন। এর মধ্যে প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে ঘাতকরা দেড় শতাধিক লোককে লাইনে দাঁড় করিয়ে নির্বিচার গুলি চালিয়ে গ্রাম ত্যাগ করে।

লোমহর্ষক কাটাখালী ব্রিজ অপারেশনের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মুস্তাফিজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘১০৩ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে সেই অপারেশনে অংশ নিয়েছিলাম। আজও কাটাখালী ব্রিজের ওপর দিয়ে শেরপুর জেলা শহরে যাওয়ার পথে বারবার তাকাই স্বাধীনতাযুদ্ধের নীরব সাক্ষী কাটাখালী ব্রিজ ও অদূরের খাটুয়াপাড়া রাঙ্গামাটি গ্রামটির দিকে।

কাটাখালী ব্রিজ অপারেশনের আরেক যোদ্ধা বিকেবির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক বলেন, ‘কাটাখালী অপারেশনের পর মনে হয়েছে সত্যিকারের যুদ্ধে জয় হয়েছে। কারণ ওই অভিযানের মধ্য দিয়ে আমরা হানাদারদের সরবরাহ লাইন বন্ধ করে দিয়েছিলাম। ’

রাঙ্গামাটি গ্রামের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ইউনুছ আলী বলেন, ‘শহীদ পরিবারের সদস্যরা বুকফাটা কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছেন। এখনো চোখের সামনে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় দালাল জালাল মিস্ত্রি ও তার ভাই রাজাকার হক আলীসহ কয়েকজন। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছে। জীবদ্দশায় ওদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখে যেতে চাই। ’

 


মন্তব্য