kalerkantho

সোমবার । ১৬ জানুয়ারি ২০১৭ । ৩ মাঘ ১৪২৩। ১৭ রবিউস সানি ১৪৩৮।


হারার আগে লড়াই বাংলাদেশের

বাংলাদেশ : ২০ ওভারে ১৫৬/৫
অস্ট্রেলিয়া : ১৮.৩ ওভারে ১৫৭/৭
ফল : অস্ট্রেলিয়া ৩ উইকেটে জয়ী

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



হারার আগে লড়াই বাংলাদেশের

আবারও ঝড় উঠল মাহমুদ উল্লাহর ব্যাটে। তাঁর ২৯ বলে হার না মানা ৪৯ রানের ঝোড়ো ইনিংসে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ১৫৬। ছবি : মীর ফরিদ

টস হারেন টানা সপ্তম ম্যাচে। তা কালকের ম্যাচের টস জেতা-হারায় আর কী যায়-আসে! তবে এরপর মাঠের মধ্যখান থেকে যেভাবে হেঁটে বাউন্ডারি দড়ির দিকে এলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা, বোঝা যায় বাংলাদেশ ম্যাচটা হেরে গেছে ব্যাট-বলের লড়াই শুরুর আগেই। অধিনায়কের ওই কাঁধ ঝুলে যাওয়া শরীরী ভাষায় ফুটে ওঠে যা।

তবু যে ১৫৬ রান করতে পারে বাংলাদেশ, সে-ই ঢের। তা-ও যে প্রতিপক্ষের সাত উইকেট তুলে নিতে পারে, সেটি কম বাহাদুরি নয়। তিন উইকেটে হারলেও লড়াইটা ঠিকই করে মাশরাফির দল। আর তাদের সেই লড়াইয়ে মিশে থাকে সংশপ্তকের বীরত্ব।

ঠিক কোন অবস্থায় কাল খেলতে নামে বাংলাদেশ, ভাবুন তো! বোলিং অ্যাকশন অবৈধ ঘোষিত হওয়ায় নিষেধাজ্ঞার শেকলবন্দি তাসকিন আহমেদ ও আরাফাত সানি। এঁদেও মধ্যে প্রথমজনেরটি মানতেই পারছে না বাংলাদেশ। যে কারণে আরাফাতকে আজ দেশে ফেরার উড়ালে তুলে দিলেও রেখে দিচ্ছে তাসকিনকে। এই বিশ্বকাপেই আবার খেলানোর আশায়। সেটি হবে কি হবে না, পরের ব্যাপার। কিন্তু পুরো দলের মানসিকতার ওপর এই নিষেধাজ্ঞা ঠিকই প্রভাব ফেলে আয়নাঘরে ঢিল ছোড়ার মতো। অধিনায়কের ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনের বোবা কান্নায় যার প্রতিচ্ছবি।

এখানেই কি শেষ! ম্যাচের দিন সকালে দুঃসময়ের আকাশ চিড়ে আরেক বজ্রপাত। তামিম ইকবালও খেলতে পারবেন না অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে! বদহজমের প্রভাবে জ্বর হয়েছে। শারীরিক দুর্বলতা এতই যে মাঠে এসে ওয়ার্মআপ করেও হোটেলে ফিরে যেতে হয় এই ওপেনারকে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেরা পারফরমারকে হারিয়ে দলের আত্মবিশ্বাস দুমড়েমুচড়ে যায় আরো।

তবু কী লড়াইটাই না করে কাল বাংলাদেশ!

লক্ষ্য ১৫৭ রান, ওপেনিং জুটিতেই ৬১ রান তুলে ফেলে অস্ট্রেলিয়া। শেন ওয়াটসনের রান আউটে সেই জুটি ভাঙলেও ম্যাচে তা ছড়ায় না অনিশ্চয়তার রং। ১১ ওভারে এক উইকেটে ৯৪ রান তুলে ফেলে স্টিভেন স্মিথের দল। হাতে ৯ উইকেট নিয়ে শেষ ৫৪ বলে দরকার ৬৩ রান। টি-টোয়েন্টির এই ধুন্ধুমার ব্যাটিংয়ের যুগে, বেঙ্গালুরুর ব্যাটিং সহায়ক উইকেট ও ছোট বাউন্ডারির মাঠে এ আর এমন কী!

দ্বাদশ ওভারে মুস্তাফিজ আউট করেন স্মিথকে (১৪)। এক ওভার বাদে আরেক সেট ব্যাটসম্যান উসমান খাজার (৫৮) স্টাম্প উপড়ে ফেলেন আল-আমিন হোসেন। পরের ওভারে ডেভিড ওয়ার্নারকে অবিশ্বাস্য রিফ্লেক্সে কট অ্যান্ড বোল্ড করেন সাকিব আল হাসান। একটু যেন নড়েচড়ে বসে চিন্নাসোয়ামী স্টেডিয়ামের দর্শকরা। একটু যেন রোমাঞ্চের সৌরভ ছড়ায় বাতাসে। সম্ভাবনার পাল্লা অনেকাংশে হেলে তখনো অস্ট্রেলিয়ার দিকে। শেষ পাঁচ ওভারে ৩৬ রান চাই যে!

ওই ১৬তম ওভারে সাকলাইন সজীব দিয়ে বসেন ১৪ রান। ২৪ বলে ২২ রানের আরো সহজ সমীকরণের সামনে এসে যায় স্মিথের দল। ম্যাচের চিত্রনাট্যে এরপর আবার আশা-নিরাশার দোলাচল। মুস্তাফিজ ফিরিয়ে দেন মিচেল মার্শকে; মনে হয় অলৌকিক কিছু হলেও হতে পারে। গ্লেন ম্যাক্সওয়েল পরের তিন বলে দুই ছক্কা মেরে আবার বাস্তবতার জমিনে নামিয়ে আনে বাংলাদেশকে। পরের ওভারে সাকিব আউট করেন ম্যাক্সওয়েলকে (২৬)। এক বল পর আল-আমিনের ক্যাচ মিস। আবার ওভারের শেষ বলে ঠিকই হেস্টিংসকে শিকার বাঁহাতি স্পিনারের। চিন্নাসোয়ামী স্টেডিয়ামে তখন মুঠোয় মুঠোয় ছড়ানো বাংলাদেশের দীর্ঘশ্বাস। ইস্্, রানটা আরেকটু বেশি হতো! যদি এই শেষের বোলিং ঝড় তোলা যেত শুরুতে! যদি ওয়াটসনের ক্যাচটি মোহাম্মদ মিঠুন না ছাড়তেন!

এই দীর্ঘশ্বাসগুলোকে প্রাপ্তি করে ১৮.৩ ওভারের মাথায় ম্যাচটিতে হেরে যায় বাংলাদেশ। প্রবল লড়াইয়ের পর সংশপ্তকের বীরত্বে।

ব্যাটিংয়ে অবশ্য আরেকটি বেশি বীরত্ব প্রত্যাশিত ছিল। বেঙ্গালুরুতে আসার পর থেকে বাংলাদেশের অধিনায়ক-কোচ বলে আসছেন, এটি ১৮০-১৯০ রানের উইকেট। অথচ সেখানে মোটে ১৫৬ রানে থেমে যায় দল। সৌম্য সরকার (১) বেরোতে পারেন না বাজে ফর্মের অতল গহ্বর থেকে। অফ স্টাম্পের অনেক বাইরের বলে ব্যাট চালিয়ে ক্যাচ দেন পয়েন্টে। সাব্বির রহমান লং অফ, লং অন দিয়ে দুটো চমৎকার বাউন্ডারি মারেন। একটু পরে মিড অনে ক্যাচ দিয়ে আউট। তামিমের আকস্মিক ছিটকে পড়ায় স্বচ্ছন্দের জায়গা ওপেনিংয়ে ফেরা মিঠুনের শুরু মন্দ না। লং অনের ওপর দিয়ে দারুণ এক ছক্কাও তো মারেন। সাকিবও এসে হাত খুলে খেলতে শুরু করলে বড় রানের স্বপ্নটা বড় হয় আরো।

কিন্তু কতক্ষণ আর! ২২ বলে ২৩ করে মিড উইকেট ক্যাচ দেন তিনি। মাহমুদ উল্লাহ, মুশফিকুর রহিমের আগে ব্যাটিংয়ে আসাটা যৌক্তিক প্রমাণ করতে পারেন না শুভাগত হোম (১৩)। সাকিব (৩৩) কেবল চেষ্টা করেন কিছুটা আর মাহমুদ উল্লাহ অনেকটা। ২৯ বলে সাতটি চার ও এক ছক্কায় অপরাজিত ৪৯ রান তাঁর। তাতেই পাঁচ উইকেটে ১৫৬ রানে পৌঁছতে পারে বাংলাদেশ।

কিন্তু এই স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই রান নিয়ে জেতা যায় না। শেষ দিকের উইকেট পতনের মিছিলে বাংলাদেশের হাহাকারের স্লোগানটাই বাড়ে কেবল।   আলগোছে সেখানে মিশে থাকে তাসকিন, তামিম ও আরাফাতের জন্য আক্ষেপও!


মন্তব্য