kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


রৌমারীর আফতাব বাহিনী

আজিজুল পারভেজ ও কুদ্দুস বিশ্বাস   

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রৌমারীর আফতাব বাহিনী

পাকিস্তানি বাহিনী আর তাদের এদেশীয় দোসরদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে একের পর এক অভিযান চালিয়ে তিনি হানাদার বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে  তোলেন। দুই পায়ে চারটি গুলি লেগে গুরুতর আহত হয়েছেন। চিকিৎসায় সুস্থ হয়েই আবার ঝাঁপিয়ে পড়েছেন শত্রুদের ওপর। দুঃসাহসী এই মুক্তিযোদ্ধার নাম আফতাব আলী। যুদ্ধের ময়দানে তাঁর নামে গড়ে ওঠে ‘আফতাব বাহিনী’। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস গাইবান্ধার রৌমারী অঞ্চল মুক্ত রেখে তিনি কিংবদন্তি যোদ্ধা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন জীবিত মুক্তিযোদ্ধার সর্বোচ্চ খেতাব ‘বীর-উত্তম’।

১৯৭১ সালে আফতাব আলী সেনাবাহিনীর সুবেদার হিসেবে সৈয়দপুর সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। ২৫ মার্চের কাল রাতের ঘটনার সময় তাঁর কম্পানি ছিল গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ীতে। এপ্রিল মাসের প্রথমার্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ডেলটা কম্পানির ১২ জন বিদ্রোহী জওয়ান নিয়ে সুবেদার আফতাব পলাশবাড়ী থেকে রৌমারীর যাদুরচর সীমান্তে এসে পৌঁছান। স্থানীয় তরুণ-যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি গড়ে তোলেন শক্তিশালী বাহিনী, যা আফতাব বাহিনী নামে পরিচিতি পায়। এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন করা হয় কর্ত্তিমারী বাজারসংলগ্ন শিক্ষক ও রাজনীতিক মতিউর রহমানের বাড়িতে।

মুক্তিযোদ্ধাদের বিশাল প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গড়ে তোলা হয় রৌমারী সিজি জামান উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরে টাপুরচর উচ্চ বিদ্যালয়, যাদুরচর উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়। মুক্তাঞ্চলে স্থাপিত এই প্রশিক্ষণ শিবির থেকে বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

আফতাব আলী সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থান করলেও ভারতে যাননি। ভারতীয় বাহিনী থেকে কোনো রকম সাহায্য-সহায়তাও নেননি। দেশের ভেতরে অবস্থান করেই লড়েছেন শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে।

মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় সংগঠক এস কে মজিদ মুকুল বলেন, ‘এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে সুবেদার আফতাব আলীর নেতত্বে এক দল সৈনিক সৈয়দপুর থেকে পালিয়ে এসে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে। যুদ্ধ করতে করতে তারা প্রথমে গাইবান্ধায় আসে। সুন্দরগঞ্জে বেশ কয়েকটি সফল অপারেশনের পর আফতাব তাঁর বাহিনী নিয়ে চলে আসেন মানকারচর সীমান্তে। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের পর স্থানীয় তরুণ-যুবকরাও যোগ দিতে থাকে ওই বাহিনীতে। অবশ্য এর আগে এপ্রিলের ১৪ বা ১৫ তারিখে রৌমারী থানা দখল করে অস্ত্র সংগ্রহ করে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং শুরু করেছিলাম। আফতাব আলী এসে প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নেন। এভাবে আফতাব বাহিনী নামে একটা বাহিনী গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে আফতাব কম্পানি নামেও পরিচিত হয়ে ওঠে। এভাবে এই বাহিনীর সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় সাড়ে চার শর মতো। আমরা শপথ নিই যে পাকিস্তানি বাহিনীকে রৌমারীতে ঢুকতে দেব না। আফতাব আলীর সাহসী নেতৃত্বের কারণে সেটি সম্ভব হয়েছিল। ’

আফতাব বাহিনীর অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মজিদ জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্বতীরজুড়ে ছালিপাড়া থেকে রাজীবপুরের মোহনগঞ্জ পর্যন্ত আফতাব বাহিনীর সদস্যরা ক্যাম্প করে অবস্থান নেন। বাহিনীপ্রধানের অদম্য সাহসের কারণে অন্যদের মনোবলও ছিল চাঙ্গা।

আফতাব বাহিনীর সঙ্গে ছালিপাড়া, শংকর মাদবপুর, চড়াইহাটি ও মোহনগঞ্জে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুুখোমুখি যুদ্ধ হয়েছে। শংকর মাদবপুরে টানা ছয় দিন মুখোমুখি যুদ্ধ হয়। আফতাব বাহিনীর তীব্র প্রতিরোধের মুখে হানাদার বাহিনী একপর্যায়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এরপর থেকে হানাদাররা আর নদী পাড়ি দেওয়ার সাহস পায়নি।

আফতাব তাঁর বাহিনীকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করেন। হাবিলদার মনসুরের নেতৃত্বাধীন প্রথম দলটি রাজিবপুরে অবস্থান নেয়। উদ্দেশ্য, পাকিস্তানি সেনারা যেন বাহাদুরাবাদ ঘাট, দেওয়ানগঞ্জ কিংবা জামালপুর থেকে অগ্রসর হতে না পারে। হাবিলদার রেজাউলের নেতৃত্বে কোদালকাঠিতে অবস্থান নেয় দ্বিতীয় দল। তৃতীয় দলটি অবস্থান নেয় ছালিপাড়ায়। এটির নেতৃত্ব দেন নায়েক মনসুর। চিলমারী রুটে শত্রু প্রতিহত করতে চতুর্থ দলটি মোজাহিদ কমান্ডার মফিজের নেতৃত্বে ঠাকুরেরচরে অবস্থান নেয়। সুবেদার আফতাব নিজের নেতৃত্বাধীন পঞ্চম দলটি রৌমারী হেড কোয়ার্টারে রাখেন।

রৌমারী দখলের উদ্দেশ্যে ৪ আগস্ট পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরাট একটি দল কোদালকাঠিতে আক্রমণ চালায়। ব্যাপক আর্টিলারি গোলাবর্ষণে মুক্তিযোদ্ধারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এই সুযোগে পাকিস্তানিরা কোদালকাঠি দখল করে। আফতাব পাল্টা আক্রমণ না করে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির অপেক্ষায় থাকেন। কয়েক দিনের মধ্যেই মুক্তিবাহিনীর আরো কয়েকটি দল এসে শক্তি বৃদ্ধি করে। দুই-তিন দিন পর পর সেখানে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আর এসব যুদ্ধে আফতাব প্রবল সাহস, বুদ্ধিমত্তা ও বীরত্ব দেখান। শেষ দুই দিন তুমুল যুদ্ধের পর পাকিস্তানি সেনারা কোদালকাঠি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এরপর রৌমারী এলাকা পুরোপুরি মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয়।

গাইবান্ধা অঞ্চল ছিল মেজর জিয়াউর রহমানের জেড ফোর্সের অধীন। সেপ্টেম্বরে মুক্তিবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওসমানীর নির্দেশে জেড ফোর্স সিলেট অঞ্চলে চলে গেলে এই অঞ্চলে মেজর তাহেরের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ১১ নম্বর সেক্টর। অবশ্য কুড়িগ্রামের সদর থানা, লালমনিরহাট, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী ও উলিপুরের দুর্গাপুর ছিল ৬ নম্বর সেক্টরের সাহেবগঞ্জ সাব-সেক্টরের অধীন। আর উলিপুর থানার অন্যান্য অংশ, চিলমারী ও রৌমারী ছিল ১১ নম্বর সেক্টরের মানকারচর সাব-সেক্টরের আওতাধীন। কর্নেল তাহের কোর্ট মার্শালের জবানবন্দিতে সুবেদার আফতাব আলীর বীরত্বের কথা গর্বভরে উচ্চারণ করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধে আফতাব বাহিনীর ৩৩ জন যোদ্ধা শহীদ হন বলে জানা যায়। স্বাধীনতার পর এই বাহিনীর অনেকেই বীরত্বপূর্ণ খেতাব পেয়েছেন।

আফতাব আলীর জন্ম সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর দক্ষিণভাগ গ্রামে। ইদ্রিস আলী ও জোবেদা খানমের চার ছেলের মধ্যে তিনি সবার বড়। ৯৬ বছর বয়সে এসে অসুস্থতার কারণে কথা বলতেও কষ্ট হয় তাঁর। বর্তমানে সিলেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই কিংবদন্তি যোদ্ধা।


মন্তব্য