kalerkantho


সুপেয় পানির সংকট ভোগাচ্ছে আর্সেনিক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সুপেয় পানির সংকট ভোগাচ্ছে আর্সেনিক

পানিতে পৃথিবীর তিন ভাগ পরিবেষ্টিত থাকলেও সুপেয় পানির সংকট আছে কোথাও কোথাও। একসময় মানুষের মধ্যে সুপেয় পানির জন্য হাহাকার দেখা দেবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততা যেভাবে বাড়ছে, তাতে একসময় এটি কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করবে। বাংলাদেশে সুপেয় পানি কিনতে হবে—নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত এমন চিন্তা কেউ করেনি। অথচ দেশের মানুষকে এখন টাকা গুনে পানি কিনে খেতে হচ্ছে।

প্রতিবছরই বাড়ছে নদীতে লবণাক্ততার পরিমাণ। সাগর থেকে গোপালগগঞ্জ-নড়াইল অংশে মধুমতী নদীর দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। এ নদীর পানি এলাকাবাসীর কাছে ‘মিঠা’ হিসেবেই পরিচিত। নদীর পানি সেচকাজসহ দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার হয়। এ নদীতে আগে কখনো লবণাক্ত পানির অস্তিত্ব মেলেনি। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক বছরে মিঠা পানির নদী হিসেবে পরিচিত মধুমতীর গোপালগঞ্জ-নড়াইল অংশেও লবণাক্ত পানি পৌঁছে গেছে। ফলে মধুমতী সন্নিবেশিত এলাকার মানুষ পড়েছে বিপাকে।

শুধু মধুমতীই নয়, লবণাক্ত পানির প্রকোপ বেড়েছে বলেশ্বর, কচা, আড়িয়াল খাঁ, শিবসা, পশুর নদীসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে।

শুধু লবণই নয়—নানাভাবে নদী, খাল, বিলের পানি দূষিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তা ব্যবহারেরও অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ফলে এসব এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যই শুধু ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে না, পাশাপাশি নদ-নদী-হাওর-বাঁওড়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকাও হুমকির মধ্যে পড়ছে। এবারের বিশ্ব পানি দিবসের প্রতিপাদ্যও এমনটি করা হয়েছে—‘জল ও জীবিকা’।

সরকারের পক্ষ থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সুপেয় পানি নিশ্চিত করার জন্য বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার দ্বিতীয় ইউনিট উদ্বোধন করেছেন। এ ছাড়া মেঘনা নদীর পানি শোধন করে তা পাইপের মাধ্যমে রাজধানীতে আনার জন্য একটি প্রকল্প এরই মধ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসাও সুপেয় পানি নিশ্চিত করার জন্য বেশ কয়েকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

আজ মঙ্গলবার বিশ্ব পানি দিবস পালিত হবে জাতিসংঘের সব সদস্য দেশে। বাংলাদেশেও পানি দিবস সরকারি ও বেসরকারিভাবে পালিত হবে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, ঢাকা ওয়াসা, পলিসি সাপোর্ট ইউনিট, ইউনিক, ইউনিসেফ, বিশ্বব্যাংক, ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন কোলাবরেটিভ কাউন্সিল (ডাব্লিউএসএসসিসি), বাংলাদেশ ওয়াশ অ্যালায়েন্স এবং এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ যৌথ উদ্যোগে বিশ্ব পানি দিবস ২০১৬-এর প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।

দিবসটি উদ্যাপনের অংশ হিসেবে সকাল ৯টায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অডিটরিয়ামে ‘জল-জীবিকার স্বীকৃতি’ শিরোনামে জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ড. আনোয়ার জাহিদ, ডেপুটি ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড। অনুষ্ঠানটির ওয়ার্কিং সেশনের সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত, প্রফেসর ইমেরিটাস, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নিয়ে দেশের সব জেলায় সিম্পোজিয়াম ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।

এর পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের সাধারণ সভায় প্রতিবছর ২২ মার্চ দিনটিকে আন্তর্জাতিক পানি দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় ১৯৯৩ সালে। সেই থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দিনটি গুরুত্বের সঙ্গে উদ্যাপন করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে মিঠা পানির সংকটের সঙ্গে আছে আর্সেনিক সংকট। দেশের অনেক স্থানেই গভীর বা অগভীর নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের উপস্থিতি রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের ২০ শতাংশ টিউবওয়েলে আর্সেনিকের উপস্থিতি রয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার ৭৮ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি পান করে, বাকি ২২ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত। প্রতিবছরই পানিবাহিত রোগের কারণে বহু মানুষ আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে অনেকে মারাও যায়।

এদিকে বেসরকারি সংস্থা পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) পানি দিবস উপলক্ষে গতকাল সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদ দখল ও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নদী দখল, ভরাট ও দূষণরোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে বলে সংবাদ সম্মেলন থেকে জানানো হয়।

কালের কণ্ঠ’র খুলনার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক গৌরাঙ্গ নন্দী জানিয়েছেন, দেশের পশ্চিম উপকূলজুড়েই পানি সমস্যা প্রকট। এখানে এখনো অনেক নদী। তবে নদীর পানি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পান ও ব্যবহারের অযোগ্য। কিছু জায়গায় নলকূপে পানযোগ্য পানি পাওয়া যায়, কিছু জায়গায় নলকূপেও খাবার ও ব্যবহারযোগ্য নিরাপদ পানি পাওয়া যায় না। উপকূলভাগের পশ্চিম প্রান্ত সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে শুরু করে পূর্ব দিকের বরগুনার কলাপাড়া পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়েই পান ও ব্যবহারযোগ্য পানির আকাল বেড়েই চলেছে।

পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম উপকূলীয় ১৩টি জেলার ছয়টির সুপেয় পানির সংকট সব থেকে তীব্র। এগুলো হলো খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও বরগুনা।

প্রকৌশলী কামালউদ্দিন আহমেদ এ সম্পর্কে বলেন, এই এলাকাটি ব-দ্বীপের নিম্নভাগে হওয়ায় ভূগর্ভে জলাধারের জন্য উপযুক্ত মোটা দানার বালু বা পলিমাটির পরিবর্তে নদীবাহিত অতি সূক্ষ্ম দানার বালু ও পলি বেশি দেখা যায়। যে কারণে এসব অঞ্চলে ভূগর্ভেও পানযোগ্য পানি পাওয়া যায় না। কোনো কোনো অঞ্চলে ৯০০ থেকে এক হাজার ফুট গভীরে কখনো কখনো সুপেয় পানি পাওয়া যায়। খুলনার পাইকগাছা, কয়রা ও দাকোপ; সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর, কালীগঞ্জ ও দেবহাটা; বাগেরহাটের মংলা ও শরণখোলা; পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া, বরগুনার পাথরঘাটা এবং পটুয়াখালীর গলাচিপা ও কলাপাড়া উপজেলায় গভীর নলকূপ বসিয়েও মিষ্টি পানি পাওয়া যায় না।

মৃত্তিকা গবেষণা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের (এসআরডিআই) গবেষণা জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাগরবাহিত নদীগুলোর নোনার মাত্রা আগে থেকে অনেক বেড়েছে এবং বেশি সময় দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। বছর দশেক আগেও এই অঞ্চলের নদীগুলোয় নোনার মাত্রা বাড়ত এপ্রিল থেকে মে-জুন মাসে। এখন কপোতাক্ষ, শিবসা, পশুর, ভৈরব, রূপসা, বলেশ্বর, কচা, পায়রা, বিষখালী প্রভৃতি নদীতে নোনা আসে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাস থেকে। আর ভারি বৃষ্টি না হলে সেই নোনার মাত্রা কমে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বৃষ্টি আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে বেশি হওয়ায় নদীর নোনা কমে সহনশীল পর্যায়ে আসতে ওই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, ‘পশ্চিম উপকূলে পানি সংকটের অবস্থা আমরা শহরবাসী গরম কালে টের পাই। এ বছর এখনই খুলনা মহানগরীর অনেক গভীর নলকূপে পানি উঠছে না। এর কারণ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া। ’ তিনি বলেন, ‘ভূগর্ভের পানির ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে পুনর্ভরণের (রি-চার্জ) সমস্যা। যে পরিমাণ ভূগর্ভের পানি তোলা হচ্ছে, আনুপাতিক হারে সেই পরিমাণ পানি আবার ভূগর্ভে যাচ্ছে না। ’


মন্তব্য