kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ । ৪ মাঘ ১৪২৩। ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বিবিএসে সরকারি অর্থ অপচয়ের মচ্ছব

আরিফুর রহমান   

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিবিএসে সরকারি অর্থ অপচয়ের মচ্ছব

সরকারি টাকা অপচয়ের মচ্ছব চলছে ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রধান কার্যালয়ে। কোনো স্বচ্ছতা, জবাবদিহির বালাই নেই, জনগণের করের টাকা কর্মকর্তারা যেভাবে পারছেন খরচ করছেন। সরকারি টাকা তসরুপ করে কেনা হয়েছে নিম্নমানের বেশ কিছু যন্ত্রপাতি, অল্প দিনেই সেগুলোর আয়ু ফুরিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিবিএসের কিছু কর্মকর্তা ঠিকাদারের সঙ্গে যোগশাজশ করে এসব যন্ত্রপাতি কিনেছেন। এমনকি বিবিএসের ভেতরে সরকারি প্রেস ব্যবহার করে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সাধারণ সদস্য (মেম্বার) পদের একজন প্রার্থীর পোস্টারও ছাপানো হয়েছে। একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিজেদের কাজের প্রচার চালাতে পঞ্চম আদমশুমারি প্রকল্পের টাকা দিয়ে ২০১৪ সালে ১০টি কিয়স্ক (মনিটর) মেশিন কিনেছিল বিবিএস। একেকটির দাম পড়েছে দুই লাখ থেকে চার লাখ টাকা। উদ্দেশ্য ছিল, প্রতিটি ফ্লোরে কর্মকর্তারা আসা-যাওয়ার সময় মনিটরে বিবিএসের কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি দেশের খবরও জানতে পারবেন। কিন্তু বছর না ঘুরতেই সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। মনিটরে জমেছে ধুলোর আস্তর। এখন সেগুলো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, কিয়স্ক মেশিনগুলো নিম্নমানের ছিল। তাই দ্রুতই সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এতে কেবল টাকারই অপচয় হয়েছে।

বিবিএসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কখন অফিসে ঢোকেন, কখন বের হন, তা নজরদারি করতে গত বছর আগস্টে ২২ লাখ টাকা দিয়ে কেনা হয়েছিল দুটি যন্ত্র (ফ্ল্যাট ব্যারিয়ার)। কিন্তু তিন মাসের ব্যবধানেই সেগুলো অকেজো হয়ে গেছে। ফলে ২২ লাখ টাকাই গচ্চা গেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখন আগের মতো (ম্যানুয়ালি) অফিসে আসা-যাওয়া করেন। এ ছাড়া বিবিএসের পুরনো ২৩টি জেলা অফিসে ঢোকার জন্য কেনা ‘অ্যাটেনডেন্স সিস্টেম’ সফটওয়্যার নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।

জাতীয় গ্রিড থেকে বিবিএস বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে না, এমন শর্ত দিয়ে ২০১৩ সালে দেশের সবচেয়ে বড় সোলার সিস্টেম বসানো হয়েছিল পরিসংখ্যান ব্যুরোর নিজস্ব ১০ তলা ভবনের ছাদে। ব্যয় হয়েছিল প্রায় তিন কোটি টাকা। কিন্তু সে সোলার সিস্টেমও এখন প্রায় অকেজো। জাতীয় গ্রিড থেকেই এখন বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে বিবিএস। আর এই সোলার সিস্টেমে যেটুকু উৎপাদিত বিদ্যুৎ হয় তার পুরোটাই চলে যায় জাতীয় গ্রিডে। বিবিএসের একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, নিম্নমানের উপকরণ কেনায় এই অবস্থা হয়েছে।

আবার ইউপি নির্বাচনে কিশোরগঞ্জের এক মেম্বার প্রার্থীর পোস্টার বিবিএসের ঢাকা কার্যালয়ে অবস্থিত সরকারি প্রেসে ছাপানোর মতো কাজও করেছেন বিবিএসের আরপিডি শাখার টেকনিক্যাল অপারেটর মোশাররফ হোসেন তালুকদার। তাঁকে সহযোগিতা করে আরো পাঁচজন। ওই প্রার্থীর ৫০০টি পোস্টার ছাপানো শেষ হয়েছে। যদিও ধরা পড়ায় পর ওই অপারেটরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বাকিদের কারণ দর্শাও নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ রকম অনিয়মের মধ্য দিয়েই চলছে বিবিএসের ঢাকা কার্যালয়। বিবিএসের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, ঠিকাদারের সঙ্গে যোগযাজশ করে বিবিএসের কিছু কর্মকর্তা লাভবান হয়েছেন। বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে যেসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছিল সেগুলো তো এত কম সময়ে নষ্ট হওয়ার কথা নয়। নিম্নমানের যন্ত্রপাতি কেনার কারণেই সেগুলো অকেজো হয়ে গেছে। একজন অপারেটরের কত বড় সাহস হতে পারে যে সরকারি প্রেস ব্যবহার করে একজন মেম্বার প্রার্থীর পোস্টার ছাপানো হয়।

বিবিএসের মহাপরিচালক আবদুল ওয়াজেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি প্রেসে নির্বাচনী পোস্টার ছাপানোর অপরাধে একজন টেকনিক্যাল অপারেটরকে ইতিমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। আরো পাঁচজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রচারের জন্য ১০টি কিয়স্ক মেশিন না কিনলেই চলত। এতে বরং সরকারের কিছু টাকা বেঁচে যেত। তবে সেগুলো আমি আসার আগেই কেনা হয়েছে। আর সোলার সিস্টেম থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, সেটি বিবিএস কার্যালয়ে ব্যবহার হয় না, তা চলে যায় জাতীয় গ্রিডে। এ বিষয়ে কী করণীয় তা আমরা দেখছি। ’

২২ লাখ টাকায় কেনা ফ্ল্যাট ব্যারিয়ার যন্ত্র দুটি তিন মাস না যেতেই অকেজো হয়ে গেছে। তবে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক যতন কুমার শাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিবিএস কার্যালয়ে দৈনিক দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ আসা-যাওয়া করে। এত মানুষের লোড নিতে পারে না যন্ত্র দুটি। সে জন্য বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ’ বিবিএসে যতজন কর্মকর্তা আছেন সে আলোকে কেন যন্ত্রের লোড নির্ণয় করা হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের অভিজ্ঞতার অভাব। তা ছাড়া ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বায়োমেট্রিকস লিমিটেড কারিগরি বিষয়টি আমাদের জানায়নি। জানালে আমরা এই যন্ত্র নিতাম না। তবে এখন ওই দুটি যন্ত্রের পরিবর্তে নতুন করে টার্ন স্টাইল নামে আরো দুটি যন্ত্র কেনা হচ্ছে। ’ তবে কিয়স্ক মেশিনগুলো ভালো আছে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে বিবিএসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, তাদের হাতে এত সময় নেই যে বাইরে গিয়ে মনিটরে বিবিএসের কর্মকাণ্ড দেখতে হবে। নিজের কম্পিউটারে বসেই বিবিএসের খবরের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের খবর জানা যায়। আসলে এত কিয়স্ক মেশিন কেনার দরকারই ছিল না।


মন্তব্য