kalerkantho


ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রই বেশি

♦ প্রথম ধাপে ৭১৯ ইউনিয়ন পরিষদে ভোট আজ
♦ রাতে ভোট লুট ঠেকাতে বিশেষ নির্দেশ
♦ সবার সহযোগিতা মিলছে না, অনিয়ম ঠেকাতে ব্যর্থ হলে দায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর : সিইসি

কাজী হাফিজ   

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রই বেশি

উৎসাহ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে প্রথম ধাপে আজ মঙ্গলবার ৭১৯টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে ৫৪টিতে চেয়ারম্যান পদে ভোটই হবে না। এসব ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। দেশে প্রথমবারের মতো চেয়ারম্যান পদে দলভিত্তিক এ নির্বাচনে এ ধাপে শতাধিক ইউনিয়নে বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই। যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে দুজন গতকাল ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। এ অবস্থায় অনেক ইউপিতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ গতকাল বলেছেন, রাতেই যাতে ভোট লুট শুরু না হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো অনিয়ম হলে পুলিশকে তার দায় নিতে হবে।

আজ সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। ভোটার প্রায় সোয়া কোটি। ভোটকেন্দ্র সাত হাজার ৮৭টি। আগামীকাল টাঙ্গাইল জেলায় এই ধাপের আরো ১১টি এবং ২৭ মার্চ কক্সবাজারের দুটি ইউপিতে ভোট নেওয়া হবে। ইসির ঘোষণা অনুযায়ী দ্বিতীয় ধাপে ৩১ মার্চ, তৃতীয় ধাপে ২৩ এপ্রিল, চতুর্থ ধাপে ৭ মে, পঞ্চম ধাপে ২৮ মে ও ষষ্ঠ ধাপে ৪ জুন ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।

ইসির কর্মকর্তারা জানান, আজ ৭২১টি ইউপিতে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি থাকলেও আদালতের নির্দেশে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়া ও বগুড়া সারিয়াকান্দির কাজলা ইউপির নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। অন্য ৭১৯ ইউপির বেশির ভাগ কেন্দ্রে ঝুঁকি রয়েছে। এই ভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে উৎসাহের পাশাপাশি উৎকণ্ঠাও রয়েছে। প্রচার-প্রচারণাজনিত সহিংসতায় এরই মধ্যে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ভোটের দিনে সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষের আশঙ্কা করা হচ্ছে সাতক্ষীরার কলারোয়া, পাবনার বেড়া, ঝালকাঠির নলছিটি, পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ ও বাউফল, নোয়াখালীর হাতিয়া এবং খুলনার কয়রা, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়া উপজেলার ইউপিগুলোয়। এসব এলাকা থেকে অনেক অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে জমা পড়েছে। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী এবং বিএনপি ও জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন, গতকাল থেকে তাঁদের

 সমর্থকদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার করছে পুলিশ। আর বহিরাগত সন্ত্রাসীরা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।

ইসি সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, অভিযোগ এত বেশি আসছে যে নির্বাচন কমিশন সেসব আমলে নিতে দ্বিধান্বিত। পৌর নির্বাচনের সময় বেশির ভাগ অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে এলেও এবার তাতে যোগ হয়েছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও। এর পরিপ্রেক্ষিতে খুলনার পাইকগাছার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), বাগেরহাটের দুই ওসি ও ঝালকাঠির নলছিটি থানার ওসিকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সিইসি যা বললেন : প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ গতকাল বিকেলে ইসির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানান, নির্ভয়ে ভোটারদের ভোট দেওয়ার সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক লাখ ৮০ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। প্রয়োজনে আরো বাড়ানো হবে। তারা চার দিন মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া প্রতি উপজেলায় চারজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং একজন করে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট থাকছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনী অনিয়ম ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে এরই মধ্যে সাতজনকে এক মাস করে জেল এবং ৬০ জনকে মোট দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আরেকজন সংসদ সদস্যকে কারণ দংশানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এক প্রার্থীর বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। কয়েকজন ওসি ও ইউএনওকে বদলি করা হয়েছে।

সিইসি বলেন, এসব ব্যবস্থা নেওয়ার পরও অনিয়ম ঠেকাতে ব্যর্থ হলে এর দায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিতে হবে। রাতে নিবিড় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর পরও অনিয়ম হলে তার দায় সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে নিতে হবে। বহিরাগত এবং অবৈধ অস্ত্রধারীরা যাতে এলাকায় না থাকতে পারে তার জন্য এবং ভোটার ও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, কিছু ঘটনার জন্য সার্বিক পরিস্থিতিকেই খারাপ মনে হয়। এবার একসঙ্গে অনেক ইউপিতে নির্বাচনের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমাদের অন্য ডিপার্টমেন্টের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এদের সংখ্যা অনেক। এদের ওপর ইসির সে ধরনের কর্তৃত্ব নেই। এ ছাড়া এখন নির্বাচন অর্থকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এই কালচার পাল্টানো দরকার।

নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে আপনি কতটুকু সন্তুষ্ট—‘এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে সিইসি বলেন, সবার পারফরম্যান্স ইমপ্রুভ হওয়া দরকার। আমরা চেষ্টায় আছি। ’

সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ, জাবেদ আলী, মো. শাহ নেওয়াজ ও ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

মোট প্রার্থী ৩৬ হাজার ৪৫৬ জন : ইসির তথ্যানুযায়ী প্রথম ধাপের ৭৩৪টি ইউপির তিন ধরনের পদে মোট প্রার্থী ৩৬ হাজার ৪৫৬ জন। ৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ীসহ মোট চেয়ারম্যান প্রার্থী তিন হাজার ৩৪ জন; সংরক্ষিত (নারী) সদস্য পদে সাত হাজার ৫৭৫ জন এবং সাধারণ সদস্য পদে ২৫ হাজার ৮৪৭ জন। সংরক্ষিত সদস্য পদে ৫৪ জন এবং সাধারণ সদস্য পদে ১৭৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছেন।

প্রথম ধাপের নির্বাচনে ১৪টি রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ৭৩৩ জন, বিএনপির ৬১৩ জন এবং স্বতন্ত্র এক হাজার ২৪৬ জন।

যে ৫৪ ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে ভোট হচ্ছে না : প্রথম ধাপের ৫৪টি ইউপির চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী থাকায় এসব পদে কাল ভোট হচ্ছে না। এসব পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। ইউপিগুলো হচ্ছে—খুলনার তেরখাদা, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার বর্ণি, কুশলী ও পাটগাতী, ঝালকাঠির নলছিটির সিদ্ধকাঠি, বাগেরহাটের মংলার সোনাইলতলা, রামপালের মালিকেরবেড়, চরবানিয়ারী, বড়বাড়িয়া, চিতলমারী, হিজলা, সন্তোষপুর, কলাতলা ও শিবপুর; ফকিরহাটের ফকিরহাট, মোল্লারহাটের আটজুরী, চুনখোলা, গাওলা, কোদালীয়া, কুলীয়া ও উদয়পুর, বাগেরহাট সদরের বারুইপাড়া, বেমরতা, বিষ্ণুপুর, ডেমা, গোটাপাড়া, যাত্রাপুর, কাড়াপাড়া, খানপুর ও রাখালগাছি, কচুয়া উপজেলার বাধাল, কচুয়া, ধোপাখালী ও গজালিয়া, মোরেলগঞ্জের চিংড়াখালী, পঞ্চকরণ, তেলিগাতি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের পাহাড়িয়াকান্দি ও ছয়ফুল্লারকান্দি, বরিশালের বানারিপাড়ার উদয়কাঠি, ভোলা সদরের দক্ষিণ দিঘলদী, দৌলতখানের চর খলিফা, মাদারীপুরের শিবচরের বন্দরখোলা, উত্তর বহেরাতলা, দক্ষিণ বহেরাতলা, ভাণ্ডারিকান্দি, দত্তপাড়া, কাদিরপুর, কুতুবপুর, মাদবরের চর, নিলখী, শিরুয়াইল, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের জৈনসার এবং সাতক্ষীরার কলারোয়ার সোনাবাড়িয়া।

ইসিতে অভিযোগের স্তূপ : সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, নির্বাচনী নানা অনিয়ম ও হুমকি এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রভাব সৃষ্টির বিষয়ে স্থানীয়ভাবে প্রতিকার না পেয়ে গত রবিবার ও গতকাল সোমবার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) কার্যালয়ে প্রার্থীদের পক্ষে অভিযোগ দাখিল করা হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাতক্ষীরার কলারোয়ার দেয়াড়া ১১ নম্বর ইউপির চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. ইব্রাহিম হোসেন, একই উপজেলার ১০ নম্বর কুশোডাঙ্গা ইউপির স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এম এম জাহাঙ্গীর হোসেন, ১২ নম্বর যুগিখালী ইউপির বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এবং বর্তমান চেয়ারম্যান মো. রবিউল ইসলাম, পাবনার বেড়া উপজেলার ৬ নম্বর জাতসাখিনী ইউপির চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মো. আ. গণি ফকির, ৯ নম্বর ঢালারচর ইউপির আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মো. কোরবান আলী সরদার, ৮ নম্বর মাশুমদি ইউপির চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মো. সামসুর রহমান, ৭ নম্বর রূপরপুর ইউপির চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মো. নূরুল ইসলাম মোল্লা, জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার ৪ নম্বর নাংলা ইউপির স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন।

জাতীয় পার্টির অভিযোগ : গত রবিবার জাতীয় পার্টির একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে তাদের প্রার্থীদের ওপর হামলা, বাড়ি, অফিস ও সভা-সমাবেশে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ দাখিল করে। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্রে এসব ঘটনার জন্য ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের দায়ী করা হয়।

বিএনপি প্রার্থীর ভোট বর্জন : আমাদের স্থানীয় প্রতিনিধিরা জানান, গতকাল ভোলা সদর উপজেলার উত্তর দিঘলদী ইউপির বিএনপি চেয়ারম্যান প্রার্থী রাইসুল আলম ও নরসিংদীর পলাশ উপজেলার গজারিয়া ইউপির বিএনপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান লাল মিয়া ভোট ডাকাতির ষড়যন্ত্র ও ভোট সুষ্ঠু হওয়ার পরিবেশ না থাকার অভিযোগে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।


মন্তব্য