kalerkantho


কাউন্সিলে উজ্জীবিত বিএনপি

এনাম আবেদীন   

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কাউন্সিলে উজ্জীবিত বিএনপি

ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় চাঙ্গা হয়ে উঠছে বিএনপি। দলটির নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে হতাশা দূর হতেও শুরু করেছে।

কিন্তু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ‘ভারমুক্ত’ ঘোষণা না করায় অনেকে কিছুটা হতাশও হয়েছেন।

পর্যবেক্ষক মহল বলছে, অনেক দিন পরে হলেও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে খালেদা জিয়া তাঁর বক্তৃতার মধ্য দিয়ে দলটির অবস্থান স্পষ্ট করতে পেরেছেন। পাশাপাশি নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রতিবেশী দেশ ভারতকেও আশ্বস্ত করতে পেরেছেন।

এদিকে কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও মেরুকরণ ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, উগ্র বা প্রতিক্রিয়াশীল চক্রটি আস্তে আস্তে কোণঠাসা হয়ে পড়বে। কারণ খালেদা জিয়া বলেছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ হবে জাতীয় ঐক্য ও প্রেরণা সৃষ্টির উৎস। বিএনপির কাউন্সিলে বা বড় কোনো অনুষ্ঠানে এই প্রথমবারের মতো জামায়াতের কোনো নেতাকে মঞ্চে তোলা হয়নি। এ ছাড়া সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম ভাঙিয়ে চলা অংশটির প্রভাবও এখন থেকে বিএনপিতে কিছুটা কমে যাবে বলে অনেকে মনে করছেন। কারণ গঠনতন্ত্র সংশোধনী প্রশ্নে তারেকের নাম ভাঙিয়ে উত্থাপিত কোনো প্রস্তাবই গ্রহণ করা হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য করা ওই সব প্রস্তাবের কোনোটির বিষয়েই তারেক জানতেন না। অথচ তাঁর নাম ভাঙিয়ে কো-চেয়ারম্যান করা, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের জন্য পৃথক সচিবালয় ও উপদেষ্টা পরিষদ গঠন এবং তিনি চেয়ারম্যানকে পরামর্শ দেবেন এমন বিধান গঠনতন্ত্রে সংযোজনের প্রস্তাব দিয়েছেন তাঁর সমর্থক বলে পরিচিত কয়েকজন নেতা, যা সিনিয়র নেতারা গ্রহণ না করায় বাতিল হয়ে গেছে।

৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র পরে দুই দফা ব্যর্থ আন্দোলনের পর বিএনপি প্রায় ঝিমিয়ে পড়েছিল। আন্দোলন দূরে থাক; দলের পক্ষে রুটিন কাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো অবস্থাও গত কয়েক মাসে ছিল না। হাজার হাজার মামলা মাথায় নিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের বেশির ভাগই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। এ অবস্থায় শনিবার ষষ্ঠ কাউন্সিলে প্রায় লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয় এবং ‘ভিশন ২০৩০’ শিরোনামে খালেদা জিয়া দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়ে রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেন। দলটির শত শত নেতাকর্মী এখন পদ-পদবির জন্য সিনিয়র নেতাদের বাসায় তদবির করছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের মতে, সরকারি দলের প্রচারণায় মনে হয়েছিল, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি আর নেই। কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাউন্সিলে লক্ষাধিক লোকের উপস্থিতি প্রমাণ করে বিএনপি হারিয়ে যায়নি, বরং ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, কাউন্সিলে যে পরিমাণ লোকসমাগম হয়েছে তাতে বোঝা যায় বিএনপিতে এখন থেকে আর হতাশা বলতে কিছু থাকবে না। তিনি আরো বলেন, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রে বিএনপি চেয়ারপারসন তাঁর বক্তৃতার মাধ্যমে সন্তোষজনক বার্তা দিতে পেরেছেন বলে আমি মনে করি। কারণ তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করার পাশাপাশি জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করতে পেরেছেন। যে ভারতের সমর্থন নিয়ে সরকার টিকে আছে বলে মনে করা হয়, সেই ভারতও বিএনপির বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খানের মতে, বিএনপি চেয়ারপারসনের বক্তৃতায় বেশকিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। যেমন তিনি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, দ্বিকক্ষের সংসদ, রেফারেন্ডাম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেছেন। এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে ভালো। পাশাপাশি ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াতকে তিনি যদি মঞ্চে বসতে না দিয়ে থাকেন, সেটিও প্রশংসনীয়। তবে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করা হলে আরো ভালো হতো।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, কাউন্সিলের মাধ্যমে বিএনপির মনোবল চাঙ্গা হয়েছে। জাতীয়ভাবেও বোঝা গেল, আওয়ামী লীগের পাশাপাশি এ দেশে বিএনপিই সবচেয়ে বড় দল। ফলে সরকার চাইলেই যে বিএনপিকে ধ্বংস করতে পারবে না, এটি এবারের কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হলো।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিএনপি চেয়ারপারসন অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে দলের অবস্থান তুলে ধরেছেন। এখানে রাখঢাকের কিছু নেই। বিএনপি একটি উদার ও মধ্যপন্থী দল। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথাও তিনি এ জন্যই সামনে এনেছেন।

স্থায়ী কমিটির প্রবীণ আরেক সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মতে, বিএনপির কাউন্সিলে সফলতা অনেক। প্রথমত, এর মধ্য দিয়ে বিএনপি আরো সুসংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হলো। দ্বিতীয়ত, কাউন্সিলে রাষ্ট্রনায়কোচিত বক্তৃতার মাধ্যমে বিএনপির চেয়ারপারসনের রোডম্যাপ ঘোষণা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তৃতীয়ত, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট করাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

গয়েশ্বর সমাচার : কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও কিছু মেরুকরণ ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে দলটির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও উদারপন্থীরা কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। স্থায়ী কমিটির ১৬ নম্বর সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ‘বুদ্ধিজীবীরা নির্বোধের মতো প্রাণ দিয়েছেন’ বলে প্রকাশ্যে বক্তব্য রেখে দলকে বিতর্কের মধ্যে ঠেলে দেন। এ ছাড়া তাঁর নেতৃত্বেই সাম্প্রতিক সময়ে ডানপন্থীরা দলের মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বলে অনেকের ধারণা। মূলত বিএনপির মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা নেতা সাদেক হোসেন খোকা, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও আবদুস সালামের মতো নেতাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে ‘মাইনরিটি’ সম্প্রদায়ের ওই নেতা ডানপন্থী অবস্থান বেছে নেন। আবার মুক্তিযুদ্ধের এ অংশকে সমর্থন করায় মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই তৎপরতা চালান গয়েশ্বর। দলের মধ্যে নিজের সমর্থক সৃষ্টিরও চেষ্টা চালান শুরু থেকেই। কিন্তু এসব তৎপরতা এবং কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে দলের একাধিক নেতার সঙ্গে সম্প্রতি গয়েশ্বরের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।

আর এসব ঘটনায় দলের বিভিন্ন পর্যায় থেকে অভিযোগ গেছে খালেদা জিয়ার কাছে। ফলে গয়েশ্বরের ওপর তিনি প্রচণ্ড বিরক্ত। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে স্থায়ী কমিটির বৈঠকের আগে গুলশান কার্যালয়ে এবং শনিবার কাউন্সিলের দিন মঞ্চে বসে খালেদা জিয়া গয়েশ্বরের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। গুলশান কার্যালয়ে ‘সুভ্যেনির’ হিসেবে একটি প্লেটের ওপর ডিজাইন দেখিয়ে চেয়ারপারসনের সঙ্গে ছবি তুলতে গিয়েছিলেন গয়েশ্বর। কিন্তু ওই স্যুভেনিরের ডিজাইন দেখে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন খালেদা জিয়া। গয়েশ্বরকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, কী ধরনের রুচি তোমার। এটি কোন ডিজাইন হলো! কাউকে তো জিজ্ঞেসও করোনি। বিএনপির মতো একটি দলে একাই সব কাজ করা যায়?

সূত্র মতে, চেয়ারপারসনের কথায় গয়েশ্বর এমনই অপ্রস্তুত হন যে ওই দিন স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তিনি প্রায় চুপ হয়ে বসে ছিলেন। অথচ এর আগে ১০ ফেব্রুয়ারির বৈঠকে একাই ফ্লোর নিয়ে উপস্থিত সিনিয়র নেতাদের পরোক্ষভাবে একরকম অপমানই করেছিলেন তিনি। স্থায়ী কমিটির একজন নেতার মতে, আসলে চেয়ারপারসন সিনিয়র নেতাদের মনোভাব বুঝে সুযোগ পেয়ে আগেই গয়েশ্বরকে ‘ঠাণ্ডা’ করে দেন। উদ্দেশ্য ছিল, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তিনি যেন আর বেশি কথা না বলেন।

এদিকে কাউন্সিলের ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্বে থাকা গয়েশ্বরের পারফরম্যান্সেও খুশি হতে পারেননি খালেদা জিয়া। মঞ্চে তিনি গয়েশ্বরের কাছে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জানতে চান, কেন বাইরে মাইক লাগানো হয়নি? তা ছাড়া বেশ কয়েকটি ডিজিটাল স্ক্রিন বাইরে লাগিয়ে নেতাকর্মীর কাউন্সিল অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ তৈরির কথাও বলেছিলেন চেয়ারপারসন, যা শেষ পর্যন্ত না হওয়ায় গয়েশ্বরের কাছে তিনি কৈফিয়ত চান। অবশ্য আগের রাতে ঝড়ে সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেছে বলে যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন গয়েশ্বর; কিন্তু খালেদা জিয়া তা শোনেননি। জানা গেছে, বাইরে মাইক না থাকায় অনেক নেতাকর্মী রাগ করে চলে গেছে। বিএনপির সব কর্মসূচিই ‘তাহের মাইক’ কম্পানির ব্যবস্থাপনায় হতো। এবার নতুন একটি কম্পানিকে ওই দায়িত্ব দেওয়ায় বিপত্তি ঘটেছে।  

এদিকে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নীরবের সঙ্গে গয়েশ্বরের বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। শুক্রবার বিকেলে একদল নেতাকর্মী নিয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন এলাকায় ঢোকেন নীরব। এ সময় গয়েশ্বর তাঁকে বলেন, মঞ্চের দিকে যাওয়া যাবে না। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে কথাকাটাকাটি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী এক নেতার মতে, নীরবের হাতে লাঞ্ছিত হন গয়েশ্বর এবং রাগ করে তিনি দলীয় কার্যালয়ে চলে যান। একপর্যায়ে মির্জা ফখরুল বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ কয়েকজনকে বলেন। চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাসও গুলশান কার্যালয় থেকে দুই কর্মী সজল ও আশফাককে পাঠান নীরবের কাছে, যাতে গয়েশ্বরের কাছে তিনি ক্ষমা চান। কিন্তু নীরব বলেন, ওখানে গেলে আবারও মারামারি হতে পারে। পরে নীরব অবশ্য ক্ষমা চাইতে রাজি হলেও ওই দিন গয়েশ্বর রাজি হননি। একজন উপদেষ্টার মধ্যস্থতায় গতকাল দুপুরে নীরব অবশ্য গয়েশ্বরের কাছে ঘটনার জন্য ‘দুঃখ প্রকাশ’ করেছেন বলে জানা গেছে।


মন্তব্য