kalerkantho


ডিসেম্বরেই সরে যেতে চেয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী

কর্মসূচি বাতিল করে বাসায় ছিলেন কাল

আবুল কাশেম ও তৈমুর ফারুক তুষার   

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ডিসেম্বরেই সরে যেতে চেয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী

ফাইল ফটো

আড়াই মাস আগেই অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যেতে চেয়েছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। পদত্যাগপত্র লিখে তাতে সইও করেছিলেন তিনি।

মন্ত্রিপরিষদসচিবকে নিজের দপ্তরে ডেকে নিয়ে তিনি সই করা পদত্যাগপত্রটি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। এর পরই মন্ত্রী চলে গিয়েছিলেন দপ্তর থেকে। পরের তিন দিন আর দপ্তরে যাননি মুহিত। বিষয়টি জানার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডেকে নিয়ে মুহিতকে পদত্যাগ না করার অনুরোধ করেন। এরপর আবারও কাজে ফেরেন তিনি। অর্থমন্ত্রীর একাধিক ঘনিষ্ঠজন ও তাঁর দপ্তরের একাধিক সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় গভর্নরের পদত্যাগ ও একটি পত্রিকায় মুহিতের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হওয়ার পর নতুন করে চাপে থাকা অর্থমন্ত্রী গতকাল রবিবার পূর্বনির্ধারিত সব অনুষ্ঠানসূচি বাতিল করে বাসায় সময় কাটান। বিকেলে অল্প সময়ের জন্য শিল্পকলা একাডেমিতে যান তিনি। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ অর্থমন্ত্রীর বাসভবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে অনির্ধারিত সাক্ষাৎ করেছেন।

ওই সময় অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নবনিযুক্ত সচিব মো. ইউনুসুর রহমানও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তাঁর বাসভবনে যান। অর্থমন্ত্রীকে মান-অভিমান ভুলে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে স্বাভাবিক কাজকর্মে যোগ দিতে অনুরোধ করেন তাঁরা।

গতকাল সকালে অর্থমন্ত্রীর একান্ত সহকারী এস এম জাকারিয়া হক তাঁর বাসায় গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান ও সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের সঙ্গে বিকেল ৫টায় মন্ত্রীর দপ্তরে একটি সাক্ষাৎ কর্মসূচি ছিল। সেটি মন্ত্রীর বাসভবনে হয়েছে।

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মুহিত অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকছেন কি না বা প্রধানমন্ত্রী তাঁকে মন্ত্রিসভায় রাখবেন কি না, তা নিয়ে নানা ধরনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ছে। এই গুঞ্জনের অবসানের জন্য আগামী ২৫ মার্চের দিকে তাকিয়ে আছেন অনেকে। সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক বলছেন, ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পদক জয়ী আবুল মাল আবদুল মুহিত ওই দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে পদক গ্রহণ করবেন। পদ থেকে সরে যাওয়ার চাপ থাকলে কিংবা নিজেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে চাইলে সেটি ঘটতে পারে পদক গ্রহণের পর।

এদিকে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক সূত্রে জানা যায়, সরকারে ও দলে ক্ষোভ থাকলেও শিগগিরই মন্ত্রিত্ব হারানোর আশঙ্কা নেই মুহিতের। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ না থাকা এবং বিশ্বমন্দা ও প্রতিকূল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে ভূমিকা রাখায় তাঁকে সরিয়ে দিতে চান না প্রধানমন্ত্রী। মুহিতের অতিকথনকে বয়সের ভার মনে করে হালকাভাবেই দেখছেন শেখ হাসিনা। তবে বয়স হলেও মন্ত্রণালয়ের কাজে মুহিতের সক্রিয়তা প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য ও মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চলমান ইস্যুতে মুহিতকে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিত্ব ছাড়তে বলবেন—এমনটা মনে হয় না। চাইলে কালকেই একজন অর্থমন্ত্রী নিয়োগ দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু মুহিতের সততা আর সফলতাকে ছাড়িয়ে যাবেন এমন লোক পাওয়া কষ্টকর হবে। আমি ড. আতিউর রহমানকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে দেখলে অবাক হব না। তবে তা এখনই নয়। ’

জানা যায়, অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার সরকারের অনেকেই ভালোভাবে নেননি। তবে ব্যক্তিগত জীবনে সততার সুনাম রয়েছে অর্থমন্ত্রীর। তা ছাড়া বিশ্বমন্দা মোকাবিলা, পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে দর কষাকষিতে সফলতাসহ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশে তাঁর গত সাত বছরের উদ্যোগের সুনাম রয়েছে। এসব কৃতিত্ব ছাপিয়ে গেছে হলমার্ক, বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতি ও শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনার দায়কে। তাই মুহিত বারবার পদত্যাগ করতে গেলেও প্রধানমন্ত্রী তা চাননি।

নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে কোনো তদবির নিয়ে এসে সুবিধা করতে পারেন না অন্য মন্ত্রী ও এমপিরা। কোনো কোনো এমপি তদবির নিয়ে কখনো কখনো অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়েও পাননি। এ কারণে সেই মন্ত্রী ও এমপিদের ক্ষোভ রয়েছে অর্থমন্ত্রীর ওপর। গত ডিসেম্বর মাসে ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি দলবেঁধে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অর্থমন্ত্রীর বিপক্ষে নালিশ করেছিলেন। এতে তখন ক্ষুব্ধ হন অর্থমন্ত্রী। তিনি তাঁর দপ্তরে এসে এক কর্মকর্তাকে কক্ষে ডেকে নিয়ে তাঁকে দিয়ে পদত্যাগপত্র কম্পিউটারে টাইপ করিয়ে প্রিন্ট নেন। এরপর তাতে সই করে মন্ত্রিপরিষদসচিব মো. শফিউল আলমকে ডেকে নেন নিজের কক্ষে। রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্রটি পাঠিয়ে দিতে মন্ত্রিপরিষদসচিবকে অনুরোধ করে ওই দিনই দপ্তর থেকে চলে যান মুহিত। পরে প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে সেবার মান ভাঙে তাঁর।

গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীর নির্ধারিত কর্মসূচির মধ্যে ছিল ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে একটি অনুষ্ঠানে যোগদান এবং সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ও অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক। ওই দুটি বৈঠকে সভাপতিত্ব করার কথা ছিল অর্থমন্ত্রীর। এসব কর্মসূচি বাতিল করেন অর্থমন্ত্রী। দুটি কমিটির সভাপতি পদাধিকারবলে অর্থমন্ত্রী। তাঁর অনুপস্থিতিতে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে বৈঠক দুটি হয়েছে। তবে আজ সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে অর্থমন্ত্রী যোগ দেবেন বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মো. শাহেদুর রহমান।

অর্থমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এস এম জাকারিয়া হক গতকাল দুপুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্যার আজ (রবিবার) অফিসে আসবেন না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক রশিদ উদ্দিন শনিবার মারা গেছেন। উনি স্যারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। স্যার সকালে সেখানে গিয়েছিলেন। আজকে আর অফিসে আসবেন না। সারা দিনের সব কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। তবে বিকেল ৫টায় ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন মন্ত্রীর বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করবেন। ’

জানা যায়, অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে প্রায় ২০ মিনিটের সাক্ষাৎ হয় ফরাসউদ্দিনের। তবে অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে সাংবাদিকদের কিছু বলেননি।

এর আগে সকালে অর্থমন্ত্রীর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘স্যার আজকে আসবেন না। স্যারের দাঁতে ব্যথা। ’ পরে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থমন্ত্রীর অসুস্থতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শুনেছি স্যার অসুস্থ। আজ অফিসে আসবেন না। ’ অসুস্থ হলে অর্থমন্ত্রী সাধারণত রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিত্সা নেন। অর্থমন্ত্রী সেখানে যাবেন কি না, জানতে চাইলে শাহেদুর রহমান বলেন, ‘সকালের দিকে হয়তো গিয়েছিলেন। ’

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার রিজার্ভ চুরির ঘটনায় তখনকার গভর্নর ড. আতিউর রহমানের পদত্যাগের পর সরকারের ভেতরে ও বাইরে আবার সমালোচনার মুখে পড়েছেন অর্থমন্ত্রীও। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা ও মন্ত্রী তাঁর বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখছেন। বিএনপির পক্ষ থেকেও অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। এ অবস্থায় একটি পত্রিকায় তাঁর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হওয়ার পর দলে ও সরকারে আরো চাপে পড়েন মুহিত। গত শুক্রবার মন্ত্রিসভার একজন প্রভাবশালী সদস্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নালিশ করেন।

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় গত ১৫ মার্চ আতিউর রহমান গভর্নর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। আগের দিন রাতে অর্থমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে দেখা করেন আতিউর। ওই সময় অর্থমন্ত্রী তাঁকে সাফ জানিয়ে দেন, গভর্নর পদ থেকে সরে না দাঁড়ালে মুহিত নিজেই পদত্যাগ করবেন। আতিউর পদত্যাগ না করলে নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার জন্যই ১৫ মার্চ সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন মুহিত। তবে গভর্নর সরে দাঁড়ানোয় তাঁকে আর সে পথে হাঁটতে হয়নি।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার গণভবনে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার/ইউনিয়ন পরিষদ মনোনয়ন বোর্ডের সভায় মন্ত্রিসভার একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, সরকারের অপছন্দের তালিকায় থাকা একটি দৈনিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য পদত্যাগ করা গভর্নর ড. আতিউর রহমান ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানকে নিয়ে অর্থমন্ত্রীর নানা মন্তব্য বাড়াবাড়ি ও অপ্রয়োজনীয়। ওই সময়ে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা অর্থমন্ত্রীর এসব কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন বলে মত দেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা চুরির বিষয়ে অর্থমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলছেন না। টাকা ছাড়ের ক্ষেত্রে ফেডারেল ব্যাংক যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি বলে জানি। কিন্তু অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশ ব্যাংকের দায় নিয়ে বারবার গণমাধ্যমে বক্তব্য দিচ্ছেন। এটি তাঁর দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। ’

একজন মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর কথাবার্তা ও কাজকর্মে মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যই মহাবিরক্ত। উনি যখন তখন যাকে তাকে রাবিশ-খবিশ বলেন, যা অশোভন। বিভিন্ন সময়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর সঙ্গেও তিনি বিরোধে জড়িয়েছেন। পদ্মা সেতুর কাজ আমরা আরো এক-দেড় বছর আগে শুরু করতে পারতাম। উনি বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কথা বলে বারবার প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছেন। ওনার কারণে সরকারের এমন আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের গতি কমে গেছে। ’


মন্তব্য