kalerkantho


বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ ছাপিয়ে ‘তাসকিন’

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ ছাপিয়ে ‘তাসকিন’

সংবাদ সম্মেলনের পুরোটা সময়ই চোখ ছলছল করছিল মাশরাফি বিন মর্তুজার। একটু পর তো কেঁদেই ওঠেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে গতকাল বেঙ্গালুরুতে। —সংগৃহীত

জোয়ারের জল আর থাকে কতক্ষণ! মাশরাফি বিন মর্তুজার চোখের  শুধু ফুরোবার নয়। কাল সংবাদ সম্মেলন শেষে গাড়িতে উঠেও তাই ফোঁপান তিনি। পাথুরে মুখ, লালচে চোখ নিয়ে। ‘এর চেয়েও কত কঠিন সময় তো এসেছে আপনার জীবনে’—স্টেডিয়ামের ঠিক বাইরে লাল বাতিতে দাঁড়ানো গাড়ির জানালার পাশে গিয়ে সান্ত্বনার এই কথাটুকুই কেবল বলা। ব্যস, আবারও বাঁধ ভেঙে যায় মাশরাফির অশ্রুনদীর।

আবারও ২০১১ সালের ১৯ জানুয়ারির শেরেবাংলা স্টেডিয়াম উড়ে এসে জাপটে ধরে ২০১৬ সালের ২০ মার্চের চিন্নাসোয়ামী স্টেডিয়ামকে।

পাঁচ বছরের বেশি সময় পাড়ি দিয়েছে পঞ্জিকার পাতা। কিন্তু ২০১১ সালের একাডেমি মাঠের ওই শীতদুপুর এখনো সবার স্মৃতিতে সজীব। ঘরের মাঠের যে বিশ্বকাপে অধিনায়ক হওয়ার কথা, তাতে কিনা ইনজুরির অজুহাতে স্কোয়াডেই নেই মাশরাফি! একাডেমি মাঠের অনুশীলন শেষে বেরোনোর সময় তাই তাঁর সে কী কান্না!

ওই কান্না ছিল একান্তই নিজের। কালকেরটি একজন অধিনায়কের। একজন সতীর্থের। একজন বড় ভাইয়ের। বোলিং অ্যাকশন অবৈধ ঘোষিত হওয়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শেষ তাসকিন আহমেদ ও আরাফাত সানির। এর মধ্যে অগ্রজের স্নেহ দিয়ে অনুক্ষণ আগলে রাখেন যাঁকে, সেই তাসকিনের চলে যাওয়াটা মানতেই পারছেন না মাশরাফি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে তাই রাগ-ক্ষোভ-অভিমান-প্রতিবাদের শব্দে আর দমকে ওঠা কান্নার ছবিতে বারবার মনে করিয়ে দেন তা।

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচ অফিশিয়ালদের সন্দেহের আতশিকাচে পড়ে তাসকিন-সানির অ্যাকশন। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচে বাংলাদেশ খেলতে নামে ওই দুজনের জন্য। খেলা শেষের সংবাদ সম্মেলনে সেটি ঘোষণা আকারে জানিয়ে দেন মাশরাফি। আর এবার যখন ওই দুজনকে বিশ্বকাপ থেকে চলেই যেতে হচ্ছে, তখন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে যে দুই সতীর্থের জন্য লড়বে বাংলাদেশ, সেটি না বললেও চলছে। ভেতরে সবার যতই ভাঙচুর থাকুক, অসিদের বিপক্ষে আজ ভালো খেলার প্রত্যয় জানিয়ে যান অধিনায়ক, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই এটা আমাদের জন্য বড় ধাক্কা। আমাদের সেরা দুজন খেলোয়াড় দলের বাইরে চলে গেছে। এ বাস্তবতা মেনে মাঠে নামতে হবে। এই মুহূর্তে এতটুকু বলতে পারি, সর্বোচ্চ চেষ্টা আমরা করব। ’

নিজেকে সামলাতেই বারবার কষ্ট হয় কাল বাংলাদেশ অধিনায়কের। পেশাদারিত্বের মুখোশ খসে ক্ষণে ক্ষণে বেরিয়ে যায় আবেগের মুখ। তাহলে ওই দুই বোলারের ওপর দিয়ে কী ঝড় যাচ্ছে, বুঝুন। পরশু সন্ধ্যায় খবর পেয়েই কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁরা। আরাফাত তো তাও তা সামলে কাল আসতে পারেন অনুশীলনে। তাসকিনের পক্ষে হোটেল থেকে বেরোনোই সম্ভব হয় না। দুজনের মানসিক অবস্থার একটু ধারণা দিয়ে প্রার্থনার ডালি ছড়িয়ে দেন মাশরাফি, ‘অবশ্যই তাসকিন আর সানি খুবই হতাশ। এ অবস্থায় আমরা পুরো দল ওদের সঙ্গে আছি। যদিও এই মুহূর্তে ওদের বোঝানো কঠিন যে, সব ঠিক আছে। তবে কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে সিনিয়র খেলোয়াড়—সবাই যতটা সম্ভব সহায়তার চেষ্টা করছে। এই সময়ে আমরা কেবল ওদের জন্য প্রার্থনা করতে পারি, শুভ কামনা জানাতে পারি। লড়াই করে ওরা নিশ্চয়ই বাংলাদেশ দলে ফিরবে এবং দেশের জন্য খেলবে। ’ এই দুজনকে কী মিস করবেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় আলো ফেলেন না অধিনায়ক, ‘ওদের কী মিস করব? পুরোটাই। এই দুই বোলার আমাদের জন্য খুব ভালো বোলিং করে এসেছে। তাসকিন শেষ আট ম্যাচে ছিল অসাধারণ। বাছাই পর্বের শেষ যে ম্যাচে সানি খেলেছে, তাতে খুব ভালো বল করেছে। এটা আমাদের জন্য তাই অনেক অনেক অনেক বড় ধাক্কা। ’

তাসকিন যে অবিচারের শিকার, সে কথা সংবাদ সম্মেলনে বারবার বলে যান মাশরাফি। বিশ্বক্রিকেটের পরিচালনা নিয়ে তাঁর বিদ্রোহ মিশে থাকে সেই উচ্চারণে। এর প্রতিকারের জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বরাবর আবেদন তো জানিয়েছেনই। আর প্রতিবাদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ব্যাট-বলকে অস্ত্র হিসেবে রূপান্তরের প্রতিজ্ঞাও যেন করেন অধিনায়ক, ‘সবচেয়ে ভালো হয় মাঠে প্রতিবাদটা জানাতে পারলে। চাই যেন সামনের ম্যাচে ভালো ক্রিকেট খেলতে পারি। আর অবশ্যই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের জন্য মাঠে নামব। ’ প্রতিপক্ষ হিসেবে পরাক্রমশালী দলও প্রত্যয় থেকে টলাতে পারে না মাশরাফিকে। বরং সাম্প্রতিক সময়ের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স থেকে অনুপ্রেরণা নেন তিনি, ‘গত এক-দেড় বছর ধরে আমরা ভালো ক্রিকেট খেলছি। এশিয়া কাপে ভালো করেছি টি-টোয়েন্টিতেও। এখানে পাকিস্তানের বিপক্ষে হয়তো ততটা ভালো খেলতে পারিনি। তবে অস্ট্রেলিয়া এই ফরম্যাটের অন্যতম শক্তিশালী দল হলেও আমরা সবাই সেই ম্যাচের দিকে তাকিয়ে আছি। ’

তাসকিন-আরাফাতের বিকল্প হিসেবে এরই মধ্যে দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন শুভাগত হোম ও সাকলাইন সজীব। কাল সকালে অনুশীলনের ছিলেন তাঁরা। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অগ্নিপরীক্ষায় তাঁদের নামিয়ে দেওয়া হবে কি না, সে নিশ্চয়তা নেই মাশরাফির কথায়, ‘ওরা আগের সারা রাত নির্ঘুম ছিল। আজ সারা দিন হয়তো ঘুমাতে হবে। এখনো সময় আছে, দেখি কী হয়। আমি এখনই বলতে পারছি না। ’ তবে মুস্তাফিজুর রহমানের ব্যাপারে চূড়ান্ত কথা বলে দেন তিনি। দিন দুয়েক আগে বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক বলেছিলেন, ৭০ শতাংশ ফিট থাকলেও এই পেসারকে খেলানো হবে না; শতভাগ ফিট হতে হবে। কিন্তু পরিস্থিতি এখন এতটাই নাজুক যে, ফিটনেসের দিকে তাকানোর সময় নেই অধিনায়কের ‘মুস্তাফিজ এখন যদি ২০ শতাংশও ফিট থাকে, তবু খেলাতে হবে। কারণ আমাদের হাতে কোনো বিকল্প নেই। ’ আর শুধু মুস্তাফিজ না, দায়িত্বটা সবার মধ্যেই ভাগ করে নেওয়ার তাগির মাশরাফির কণ্ঠে, ‘তাসকিন-আরাফাত চলে যাওয়ায় আমাদের বোলিং দুর্বল হয়ে গেছে বলে ভাবছি না। এটি বড় রানের উইকেট। এখানে এখন ব্যাটসম্যানদের বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা দলীয়ভাবে চেষ্টা করব। আশা করব, বোলাররা আবারও ভালো করবে। ব্যাটসম্যানরা তাদের দায়িত্ব পালন করবে। ’

বলতে বলতে মেঘের ভারে থমথমে আকাশের মতো শোনায় মাশরাফির কণ্ঠ। আবার প্রচ্ছন্নে বজ্রের হুঙ্কারও পাওয়া যায় যেন! হলোই-বা অস্ট্রেলিয়া প্রবল প্রতিপক্ষ। কিন্তু আজ তো আর লাল-সবুজ জার্সিতে ১১ ক্রিকেটার নামবেন না! নামবেন ১১ আহত যোদ্ধা। অবিচারের বিপক্ষে, সতীর্থদের পক্ষে ক্রিকেট গালিচায় লড়াই যাঁদের।

সে লড়াইয়ে হারলেও সংশপ্তকের রাজতিলক ঠিকই উঠবে মাশরাফি ব্রিগেডের কপালে!


মন্তব্য