kalerkantho


তাসকিন নিয়ে আইসিসির মুখোমুখি বিসিবি

ক্রীড়া প্রতিবেদক   

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তাসকিন নিয়ে আইসিসির মুখোমুখি বিসিবি

তাসকিন আহমেদের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বেঙ্গালুরুতে যতক্ষণে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার মুখ থেকে ‘অবিচার’ শব্দটি বারবার বেরিয়েই চলেছে, ততক্ষণে ঢাকায় বসে সেটি ঠেকানোর তৎপরতাও শুরু করে দিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান। গতকাল দুপুরে সেই তৎপরতার খবরই সংবাদমাধ্যমকে জানাতে যখন গুলশানে নিজের বাসার গ্যারেজে নেমে এলেন তিনি, তখন অবশ্য সেখানে শোকাতুর পরিবেশই বিরাজ করছিল।

নাজমুলের বাবা বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে মিলাদ শুরুর প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু এমন দিনেও নাজমুলের জন্য পিতৃশোক ভুলে থাকার মতো যথেষ্ট ব্যস্ততা নিয়েই যেন হাজির হয়ে গেলেন ‘তাসকিন’। এই ফাস্ট বোলারের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে পুরো দেশের ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রশমনে নানামুখী যোগাযোগেও ডুবে যেতে হলো আগের রাতেই দেশের বাইরে থেকে ফেরা নাজমুলকে।

সকালেই নিজের বাসায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন বিসিবির প্রধান নির্বাহীসহ বেশ কয়েকজন পরিচালককে। তাঁরাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন তাসকিনের বোলিং অ্যাকশনের পরীক্ষার প্রতিবেদনটি। সেটিতে চোখ বুলিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষকে অমূলক বলে মনে করার কোনো কারণও খুঁজে পাননি তিনি, ‘আমাদের দুজন বোলারের একজনের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আমরা এখনো পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই। সে হলো তাসকিন। ওকে নিয়ে যে প্রতিবেদনটি আমাদের হাতে এসেছে, সেটি পড়ে সন্তুষ্ট হওয়ার কোনো কারণও নেই। সে জন্যই এটিকে আমরা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা বলে মনে করছি।

সেই দুঃখে চরম ব্যথিত বাংলাদেশ দলের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি পূরণেও বিলম্ব করেননি নাজমুল। তৎক্ষণাৎ আইসিসির চেয়ারম্যান শশাঙ্ক মনোহর এবং প্রধান নির্বাহী ডেবিড রিচার্ডসনের সঙ্গে টেলিফোনে কথাই বলেননি শুধু, তাসকিনের নিষেধাজ্ঞায় স্থগিতাদেশও চেয়েছেন, ‘কতগুলো যুক্তি দিয়ে আমরা বলেছি, তাসকিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার নিষেধাজ্ঞাটি স্থগিত করা হোক। আর এ ক্ষেত্রে যা কিছু করার, একমাত্র কর্তৃপক্ষ কিন্তু আইসিসিই। তারাই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং প্রত্যাহার করে নিতে হলেও তাদেরই করতে হবে। ’ ঠিক সেরকম সিদ্ধান্তই আসুক বা না আসুক, তা খুব দ্রুতই আসবে বলেও আশ্বস্ত হয়েছেন নাজমুল, ‘সকালেই আমি আইসিসি চেয়ারম্যান এবং সিইওর সঙ্গে কথা বলেছি। আমার জানা মতে ওনারা ইতিমধ্যেই তাঁদের আইনবিদদের নিয়ে আমাদের ইস্যুটি নিয়ে আলোচনায় বসে গেছেন। আমরা অনুরোধ করেছি, দ্রুতই যেন আমাদের জবাবটা দেওয়া হয়। ওনারাও যথাসম্ভব দ্রুত আমাকে জানাবেন বলেছেন। ’

সেই থেকে অপেক্ষায়ই কাটছে বিসিবি সভাপতির সময়। সেই সিদ্ধান্ত জানার জন্য এমনকি বেঙ্গালুরুতে গিয়ে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ দেখার পরিকল্পনাও বাদ দিয়েছেন, ‘আমি এখন এক দিন পরে যাব (ভারতে)। কারণ দু-এক দিনের মধ্যে সিদ্ধান্তটি জেনে তবেই যেতে চাই। ’ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতায় না গিয়ে ‘শর্টকাট’ বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যায় বললেন, ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সাত দিনের মধ্যে আবেদন করতে হয়। সেই বিকল্প আমাদের হাতে এখনো আছেও। কিন্তু সেভাবে এগোতে গেলে অদূর ভবিষ্যতের ব্যাপারটির সমাধান হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সেজন্যই প্রক্রিয়াটি শর্টকাট করা যায় কি না, সে চেষ্টাই করেছি আমরা। ’ এই প্রক্রিয়ায় কাজ কতটা হবে, তা জানেন না। তবে আশাও ছাড়েননি বিসিবি সভাপতি, ‘এভাবে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিজেদের পক্ষে পাওয়া বেশ কঠিন। কিন্তু আমি একেবারে আশা ছাড়িনি। আমি মনে করি, তাসকিনকে ফিরে পাওয়ার ক্ষীণ একটি সম্ভাবনা আছে। ’

এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেই তরুণ ফাস্ট বোলারকে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবেও আশাবাদী শুনিয়েছে নাজমুলের কণ্ঠ, ‘সত্যি কথা বললে সিদ্ধান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার তা পাল্টে যাওয়া, এর আগে আমরা কিন্তু কখনো এমনটা শুনিনি। তবে আমরা যে সমস্ত পয়েন্টের ওপর জোর দিয়েছি, তাতে তাসকিনের ক্ষেত্রে সেরকম কিছু হলে আমি অবাক হব না। ’

অতীতে যে কারো কারো ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত বদলায়নি, তা নয়। সন্দেহজনক বোলিং অ্যাকশনের জন্য ১৯৯৯ সালের শেষ দিকে নিষিদ্ধ হওয়া পাকিস্তানি ফাস্ট বোলার শোয়েব আখতারকে নিজ ক্ষমতাবলে ওয়ানডে ক্রিকেটে বোলিং করার ছাড়পত্র দিয়েছিলেন তখনকার আইসিসি সভাপতি প্রয়াত জগমোহন ডালমিয়া। এর ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, ‘ওর বাউন্সারে সমস্যা, যেটি ওয়ানডে ক্রিকেটে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আছে। তাই ওর ওয়ানডে খেলতে কোনো সমস্যা নেই। ’ কাকতালীয়ভাবে আইসিসির প্রতিবেদনেও তাসকিনের বাউন্সারে সমস্যার কথা বলা হয়েছে। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে এখন নির্দিষ্টসংখ্যক বাউন্সার দেওয়ার নিয়মও আছে। তবে সমস্যা সেটি নয়। সমস্যা হলো ৯ মার্চ ধর্মশালায় যে নেদারল্যান্ডস ম্যাচের পর অভিযুক্ত হয়েছিলেন তাসকিন, সেই ম্যাচে তিনি কোনো বাউন্সারই দেননি। এতেই সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন আরো। অনেকের কাছেই এটিকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলেও মনে হচ্ছে।

এ বিষয়ে নাজমুলের ভাষ্য, ‘অনেকেই বলছেন বাংলাদেশকে টার্গেট করা হয়েছে। কে করবে এ রকম? সেটি খুঁজে পাওয়া কঠিন। আমাদের উন্নতিতে তো আইসিসিরও খুশি হওয়া উচিত। ’ তবে আরো আগে থেকেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে আসা দুই বোলারের ওপর নিষেধাজ্ঞার খড়গ নেমে আসা নিয়ে প্রশ্ন আছে তাঁরও, ‘বলতে পারেন আমাদের মূল শক্তির ওপর হাত দেওয়া হয়েছে। টি-টোয়েন্টিতে চার-ছক্কা মারার মতো ব্যাটসম্যান তো আমাদের অত নেই। তাই এই ফরম্যাটে মূল শক্তি আমাদের বোলিংই। তো সেখান থেকে দুই বোলার চলে গেলে বিশ্বকাপ কী খেলব? এখন তো প্রায় না খেলার মতোই অবস্থা। আমরা যখন ভালো খেলছিলাম, তখন এটি আমাদের জন্য বিরাট ধাক্কা। আর সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো এই দুটো ছেলে নিয়মিত খেলে যাচ্ছে। এমন নয় যে আমরা নতুন ওদের বিশ্বকাপে নামালাম। সারা বছর ধরে খেলল যখন, তখন তো আইসিসির আম্পায়াররাই ছিল। তখন তো কোনো অভিযোগ ছিল না। সে জন্য এ সিদ্ধান্তটি আমাদের কাছে বিস্ময় হয়েই এসেছে। এবং এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকরও। ’ সেই ক্ষতি রুখতে সচেষ্ট হওয়া বিসিবি সভাপতির আশায় বসতি, ‘হয়তো কিছুই হবে না। তবু আশা করতে তো দোষ নেই। অন্তত বলতে তো পারব যে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টাই করেছি। ’ সেই চেষ্টা তাসকিনকে ফিরিয়ে আনতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার। সেই সঙ্গে এটিও দেখার বিষয় যে ‘অবিচার’ হওয়ার পরে ‘সুবিচার’ এবার কেমন পাওয়া যায়!


মন্তব্য