kalerkantho


শতাধিকের সাক্ষাৎকার চলছে আলামত যাচাই

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শতাধিকের সাক্ষাৎকার চলছে আলামত যাচাই

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) কাছে আনুষ্ঠানিক সহায়তা চেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল রবিবার দুপুরে এফবিআইয়ের বাংলাদেশ প্রতিনিধি সিআইডি কার্যালয়ে তদন্তকারী দলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ সময় সিআইডির পক্ষ থেকে দুটি বিষয়ে সহায়তা চাওয়া হয়। প্রথমত, টাকা স্থানান্তরের জন্য কোন কম্পিউটার বা কোড থেকে কমান্ড দেওয়া হয়েছিল; দ্বিতীয়ত, টাকাগুলো কিভাবে, কোথায় গেছে? সিআইডিকে এসব তথ্য জানানোসহ সার্বিক তদন্তে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন এফবিআইয়ের প্রতিনিধি। রিজার্ভ চুরির ঘটনা তদন্তে এফবিআই আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা করতে আগ্রহী বলেও জানিয়েছেন তিনি। বৈঠক-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

আর রিজার্ভ চুরির ঘটনা তদন্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির প্রধান সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেছেন, তিনি আগামী ৩০ দিন কোনো কথা বলবেন না। তবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে তাঁরা জানিয়েছেন, যে কাজ দেওয়া হয়েছে তা তাঁরা করতে পারবেন। গতকাল অর্থমন্ত্রীর বাসায় বৈঠক শেষে ফরাসউদ্দিন সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

গতকালও সিআইডির তদন্তকারী দল বাংলাদেশ বাংকে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করেছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের শতাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তদন্তকারীরা। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের কাছ থেকে রিজার্ভ স্থানান্তরের ব্যাপারে তথ্য নেওয়া হয়েছে। কয়েকজনকে কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জেরাও করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি কম্পিউটারের ডকুমেন্ট জব্দ করা হয়েছে। এসব ডকুমেন্ট বা তথ্য যাচাই করে দেখছেন সিআইডির সাইবার ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা।

গতকাল দুপুর ২টার দিকে এফবিআইয়ের বাংলাদেশ প্রতিনিধি সিআইডি কার্যালয়ে যান। সেখানে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত অবস্থান করেন তিনি। এ সময় তিনি জানতে চান, এ ঘটনায় বাংলাদেশে কী ধরনের তদন্ত চলছে। তদন্তকারীরা তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য দেন এবং সহযোগিতা চান।

বৈঠক শেষে সিআইডির অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অ্যাডিশনাল ডিআইজি) শাহ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ঘটনা তদন্তে সিআইডি ও এফবিআইয়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা চাইলে তারা সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলেও জানিয়েছে। এফবিআইয়ের যে কর্মকর্তা এসেছিলেন তিনি মূলত আলোচনার জন্য এসেছিলেন। অর্থ চুরির ঘটনায় আমরা প্রধানত দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দিচ্ছি। টাকা স্থানান্তরের জন্য কোন কম্পিউটার থেকে কমান্ড দেওয়া হয়েছিল ও কোন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে এবং টাকাগুলো কিভাবে, কোথায় গেছে, এর সুবিধাভোগী কারা। এ বিষয়ে এফবিআইয়ের কাছে সহায়তা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য তাদের সহযোগিতা নেওয়া হবে। ’

জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপারে অ্যাডিশনাল ডিআইজি শাহ আলম বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে সুইফটসহ যাঁরা এ বিষয়ে কনসার্ন আছেন তাঁদের সবার সঙ্গেই নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। এটা বিদেশেও করা হবে। প্রয়োজনে ইন্টারপোলেরও সহযোগিতা নেওয়া হবে। ’

বৈঠকের ব্যাপারে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজড ক্রাইম) মীর্জা আবদুল্লাহেল বাকী বলেন, ‘এটা বিশেষ কোনো বৈঠক নয়, নিয়মিত বৈঠকেরই অংশ। বিশ্বব্যাপী যে অর্গানাইজড ক্রাইমগুলো হয়, এসব ওয়ার্ল্ডওয়াইড অর্গানাইজড ক্রাইমের ক্ষেত্রে তদন্তে আমরা যত সহযোগিতা চাইব, তারা সহযোগিতা করবে। ’

সূত্র জানায়, গতকালও সিআইডির দল বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ শাখা, বিএফআইইউ শাখা, পেমেন্ট শাখা, অ্যাকাউন্টস ও বাজেটিং শাখাসহ গুরুত্বপূর্ণ শাখার কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করেছে। তদন্তকারী দল বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ সার্ভারের শত শত স্ক্রিন শট (ইমেজ) সংগ্রহ করেছে। তারা অন্তত ৬০টি কম্পিউটারের ডেটা ক্লোন করেছে। ব্যাংকের ভেতরে বিভিন্ন শাখায় স্থাপন করা ২০০ সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ জব্দ করেছে সিআইডি। অর্থ চুরির ঘটনার সময় ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ শাখায় দুটি সিসি ক্যামেরা বন্ধ ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আলামত সংগ্রহ করতে আরো দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ব্যাংকের ২২ জন আইটি বিশেষজ্ঞ পালাক্রমে সিআইডিকে সহায়তা করছেন। সিআইডির দুই ডজন আইটি বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা এই তদন্তে কাজ করছেন। গতকাল পর্যন্ত তাঁরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শতাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের কয়েকজনকে অসংগতির ব্যাপারে জেরাও করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল, কিভাবে সার্ভার হ্যাক করা গেছে, এর উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী দল।

চুপ থাকতে সহায়তা চাইলেন ফরাসউদ্দিন : সংবাদকর্মীদের অনুরোধে কথা বলার জন্য গাড়ি থেকে নামলেন। নেমে যা বললেন তাতে সংবাদকর্মীদের অপেক্ষা মোটামুটি বৃথাই গেল। প্রশ্নের জবাবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের উত্তর ছিল, কমিটির কার্যপরিধিতে (টার্মস অব রেফারেন্স) সব বলা আছে।

রিজার্ভ চুরির তদন্তে কমিটি গঠিত হওয়ার পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে এটাই ছিল কমিটির প্রথম বৈঠক। গতকাল বিকেলে মিন্টো রোডে অর্থমন্ত্রীর বাসায় অনুষ্ঠিত সেই বৈঠকে কী কী আলোচনা হলো, অর্থমন্ত্রী কী নির্দেশনা দিলেন—এসব প্রশ্ন এসেছিল সাংবাদিকদের কাছ থেকে। ফরাসউদ্দিন প্রায় সব প্রশ্নই এড়িয়ে গিয়ে বললেন, ‘তদন্তের স্বার্থে আগামী এক মাস আপনাদের সঙ্গে কোনো কথা বলব না। বললেই তদন্ত ব্যাহত হবে। তদন্তের কাজ ভিন্ন পথে চলে যাবে। আপনারা সহযোগিতা করবেন। ’


মন্তব্য