kalerkantho


আদালতে তোপের মুখে দুই মন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আদালতে তোপের মুখে দুই মন্ত্রী

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা দুই মন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘সংবিধান রক্ষার জন্য আপনারা শপথ নিয়েছেন। আপনারা দোষ স্বীকার করেছেন।

অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছেন। আপনাদের অপরাধ আর একজন সাধারণ নাগরিকের অপরাধ এক না। আপনারা সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। আপনারা যদি শপথ ভঙ্গ করেন তাহলে আপনাদের কী হবে বলুন?’ তিনি বলেন, ‘যিনি যত বড় ক্ষমতাধর ব্যক্তিই হন না কেন সংবিধান রক্ষায় আদালত যেকোনো আদেশ দিতে কুণ্ঠাবোধ করবে না। ’ তিনি বলেন, দেশ চলতে হলে সংবিধান রক্ষা করতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী দেশ চলবে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিষয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এ বিচার থেকে আমি সরে গেলে গোটা যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচাল হয়ে যেত। ’

আদালত অবমাননার অভিযোগে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে জারি করা রুলের ওপর শুনানিকালে গতকাল রবিবার প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন। প্রধান বিচারপতি ও বিচারাধীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করায় দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ওই রুল জারি করা হয়েছিল।

এদিকে ওই অভিযোগে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের দাখিল করা আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। তাঁকে পুনরায় ব্যাখ্যা দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর দাখিল করা আংশিক ব্যাখ্যা মঞ্জুর করেছেন আদালত। এ ছাড়া দুই মন্ত্রীকে আগামী ২৭ মার্চ আবারও আদালতে সশরীরে হাজির থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই দিন পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করা হয়েছে।

প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ৯ বিচারপতির মধ্যে সাতজন গতকাল এজলাসে বসেন। প্রধান বিচারপতি ছাড়া এজলাসে বসা অন্য বিচারকরা হলেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মো. নিজামুল হক। বিচারপতি মো. ইমান আলী ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান এদিন উপস্থিত ছিলেন না।

গতকাল আদালত বসার আগেই দুই মন্ত্রী উপস্থিত হন আদালত কক্ষে। সকাল ৮টা ৪৩ মিনিটে খাদ্যমন্ত্রী এবং ৮টা ৪৭ মিনিটে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী উপস্থিত হন। ওই সময় তাঁদের আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, অ্যাডভোকেট আবদুল বাসেত মজুমদার, আবুল হোসেন ও সৈয়দ মামুন মাহবুব উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এ ছাড়া সিনিয়র আইনজীবী, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের আইন কর্মকর্তারা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বেশ কয়েকজন প্রসিকিউটর, ঢাকার জজ আদালতে দায়িত্বরত সরকারি আইন কর্মকর্তারা (পিপি, জিপি, এপিপি) উপস্থিত ছিলেন।

গত ৫ মার্চ ধানমণ্ডিতে বিলিয়া মিলনায়তনে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের সমালোচনা করেন। তাঁরা প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে মীর কাসেম আলীর মামলা পুনরায় আপিল বিভাগে শুনানির দাবি জানান। ওই সময় প্রধান বিচারপতি নেপাল সফরে ছিলেন। তিনি ৭ মার্চ দেশে ফেরেন। এরপর ৮ মার্চ দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন। তাঁদের ১৪ মার্চের মধ্যে রুলের জবাব দাখিল করতে এবং ১৫ মার্চ আদালত হাজির থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উভয় মন্ত্রী আইনজীবীর মাধ্যমে তাঁদের ব্যাখ্যা দাখিল করেন। ১৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আদালতে হাজির হলেও খাদ্যমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সফরে দেশের বাইরে থাকায় আইনজীবীর মাধ্যমে সময়ের আবেদন জানান। আদালত ২০ মার্চ পরবর্তী দিন ধার্য করেন। এ অবস্থায় গতকাল খাদ্যমন্ত্রী ক্ষমা চেয়ে সম্পূরক ব্যাখ্যা দাখিল করেন।

গতকাল শুনানির শুরুতে আইনজীবীর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বসার অনুমতি চান তাঁর আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। আদালত তাঁকে বসার অনুমতি দেন। অনুমতি পেয়ে আইনজীবীদের বেঞ্চে বসেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী। অন্যদিকে খাদ্যমন্ত্রী কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর তাঁর আইনজীবী বসার অনুমতি চাইলে আদালত তা দেন। ওই অবস্থায় খাদ্যমন্ত্রীর আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার কথা বলতে গেলে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনার কাছ থেকে কোনো জবাব পাইনি। ’ জবাবে আবদুল বাসেত মজুমদার সম্পূরক আবেদন উপস্থাপন করে বলেন, ‘এ আবেদনটি আজই দিয়েছি। ’ তিনি বলেন, ‘নিঃশর্ত ক্ষমা চাচ্ছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো মন্তব্য করব না বলে অঙ্গীকার করছি ও নিশ্চয়তা দিচ্ছি। প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের সকল বিচারপতির প্রতি আমার সম্মান আছে। ভুল হওয়ার জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। ’ অ্যাডভোকেট আবদুল বাসেত মজুমদার আরো বলেন, আবেদনকারী একজন মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে আলবদর, আলশামস, রাজাকারদের এ দেশের অসংখ্য নারী ও পুরুষকে হত্যা করতে দেখেছেন। এটা তাঁর স্মৃতিতে আসার কারণে গভীর আবেগপ্রবণ হয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি তাঁর আবেগ সামাল দিতে পারেননি। তিনি এসব বক্তব্য দেওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।

ওই সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আদালতে শুনানির সময় আমাদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন আপনারা রাজনীতিবিদরা। আমাদের শুনানি নিয়ে সংসদে ও টক শোতে নানা মন্তব্য করা হয়। দুজন মন্ত্রী যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন সে ব্যাপারে আমি নেপালে থাকা অবস্থায় একজন মন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়েছে। আমি মন্ত্রীকে বলেছি, মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি অবহিত করতে এবং আমি দেশে ফেরার আগেই দুই মন্ত্রীকে প্রেস কনফারেন্স করে ক্ষমা চাইতে বলেছি। শুনেছি, প্রধানমন্ত্রী দুই মন্ত্রীকে বকাঝকা করেছেন। আমি তাঁকে (মন্ত্রী) বলেছি, এ বকাঝকায় কাজ হবে না। প্রেস কনফারেন্স করে ক্ষমা না চাইলে পরিণতি সাংঘাতিক খারাপ হবে। ’

‘এই কোর্ট সংবিধানের অঙ্গ, সরকারের নয়’ : প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘নেপাল থেকে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে আমি বাসায় না গিয়ে সরাসরি কোর্টে আসি। পরের দিন গুরুত্বপূর্ণ রায় দেব। আমি তাঁকে (মন্ত্রী) বলি, এর আগে যদি নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে প্রেস কনফারেন্স করেন তবে চুল পরিমাণ বরখেলাপ হবে না। ক্ষমা না চাইলে এর ফলাফল সাংঘাতিক খারাপ হবে। অন্য বিচারকদের সঙ্গে বৈঠক করি। মন্ত্রী সব বিচারপতির সঙ্গে কথা বলতে আসলেন। অন্য বিচারকরা উনার (মন্ত্রী) সঙ্গে কথা বললেন না। এটা বুঝে রাখেন, এই কোর্ট সংবিধানের অঙ্গ, সরকারের অঙ্গ নয়। আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকে। যে সিনিয়র জজ যিনি দায়িত্বে থাকেন, তিনি প্রধান বিচারপতিই হোক আর যেই হোক, তাঁর প্রতি আমাদের প্রত্যেকেরই সম্মান থাকে। ’

‘গোটা বিচার বিভাগকে পিষ্ট করেছেন’ : আইনজীবীকে উদ্দেশ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনার মন্ত্রী প্রধান বিচারপতিকেই ছোট করেননি, গোটা বিচার বিভাগকে পায়ের নিচে পিষ্ট করেছেন। উনি জানেন না, উনি কী বলেছেন। প্রধান বিচারপতিকে এক হাজার কোটি টাকা ঘুষ দিলেও আরো মাননীয় চারজন বিচারপতি আছেন, তাঁদের কেনা সম্ভব নয়। আপনাদের জানতে হবে, এখানে প্রধান বিচারপতি একা কোনো রায় দেন না। প্রধান বিচারপতি চাইলেও তাঁর পক্ষে একা রায় দেওয়া সম্ভব নয়। রায় দেওয়ার আগে প্রধান বিচারপতিও জানেন না যে কী রায় হবে। ’

ওই সময় আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা বলেন, প্রধান বিচারপতি চাইলেও তাঁর একার পক্ষে কোনো রায় দেওয়া সম্ভব নয়।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা জনকণ্ঠের রায়ে পরিষ্কার করে দিয়েছি। এখন মন্ত্রীকে প্রশ্ন করি, উনারা কাসেম আলী ও জনকণ্ঠের রায় পড়েছেন কি না? কাসেম আলীর রায়কে প্রভাবিত করার জন্য এই মন্তব্য করেননি—এটা আমরা বুঝব কেমনে? প্রধান বিচারপতি ও বিচার বিভাগ সম্পর্কে কুত্সা রটনা করেছেন কি না? আমরা জনকণ্ঠের রায়ে বলে দিয়েছি, প্রধান বিচারপতি যদি আদালত অবমাননার মামলা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন তাহলে বিচারাধীন লাখ লাখ মামলার কী হবে?’

‘ব্যাখ্যা হয়নি, পড়ালেখা করে আসবেন’ : খাদ্যমন্ত্রীর আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদারকে উদ্দেশ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনার ব্যাখ্যা হয়নি। এটা আমরা খারিজ করলাম। পড়ালেখা করে আসবেন। ’ খাদ্যমন্ত্রীর দেওয়া সম্পূরক ব্যাখ্যা থেকে উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনার বক্তব্যের প্যারা ৫ সাংঘাতিক ঔদ্ধত্যপূর্ণ। ’

ব্যারিস্টার রফিক-উল হককে উদ্দেশ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনি তো জনকণ্ঠের রায় পড়েছেন। সর্বোচ্চ আদালতের রায় মানতে কোনো বাধ্যবাধকতা আছে কি না। ’ জবাবে রফিক-উল হক বলেন, এটা মানতে সবাই বাধ্য।

‘এগুলো ক্রিমিনাল কনটেম্পট’ : তখন আদালত বলেন, ‘এটাই যদি হয় আদালতের বিরুদ্ধে কুত্সা রটনা করা এবং বিচার প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করা—এগুলো ক্রিমিনাল কনটেম্পট (ফৌজদারি অবমাননা)। ’ আদালত আরো বলেন, ‘ডাকাতি মামলায় যে রকম সাজা দেওয়া হয়, কনটেম্পট করলেও একই রকমের সাজা দেওয়া হয়। এটা জনকণ্ঠের মামলায় বলে দিয়েছি। এটা জেনেও....। ’

‘টক শোতে যাবেন আর বাড়াবাড়ি করবেন, এটা দেখতে চাই না’ : প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনি তো স্বীকার করেছেন যে অপরাধ করেছেন। আমরা এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চাই না। এই চ্যাপ্টারটা আমরা এখানেই শেষ করতে চাই। এখন বলুন, আমরা কী করব?’ আদালত বলেন, ‘প্রতিটি টক শোতে যাবেন আর বাড়াবাড়ি করবেন, এটা আর দেখতে চাই না। ’

‘মেসেজ দিয়েছিলাম, সেটা বুঝেছেন কি না’ : এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি সংবিধানের তৃতীয় তফসিলের ১৪৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের শপথের অংশ পড়ার জন্য ব্যারিস্টার রফিক-উল হককে আহ্বান জানান। এরপর ব্যারিস্টার রফিক-উল হক সংবিধান থেকে শপথের অংশ পড়ে শোনান। তখন আদালত বলেন, ‘এখন বলেন, আপনি শপথ নিয়েছেন সংবিধান রক্ষার। আপনি যদি এই শপথ ভঙ্গ করেন আপনার কী হবে? আপনি স্বীকার করেছেন, অন্যায় করেছেন; এর পরিণতি কী হবে? আমরা ইচ্ছা করেই রাত ১০টা পর্যন্ত সেদিন মিটিং করেছি। কারণ সেদিন মন্ত্রী সাহেব বলে গেলেন। তখন পর্যন্ত আমরা মামলার সিদ্ধান্ত নিইনি। পরের দিন নিয়েছি। আপনি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন—সেটা জুডিশিয়াল নোটিশে নেওয়ার আগেই আমরা একটা মেসেজ দিয়েছিলাম। সেটা আপনার মক্কেল বুঝেছেন কি না?’

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমি দেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নেপালের বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে মোবাইল ফোনে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তখন মন্ত্রিসভা চলছিল। এ ছাড়া সব বিচারপতির উপস্থিতিতে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। এরপরও যদি না হয়, তাহলে আপনাদের সরকারের মন্ত্রিসভা কী রকম চলছে সেটা আপনারাই বোঝেন। ’

‘সুপ্রিম কোর্টকে কোথায় নিয়ে গেছেন’ : প্রধান বিচারপতি বলেন, দেশ চলতে হলে সংবিধান রক্ষা করতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী দেশ চলবে। তাঁরা কত ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। এমনকি ওখানে (৫ মার্চের আলোচনাসভা) একজন প্রসিকিউটর ছিলেন, তিনি নাকি রায় নিয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যানকে দেখিয়েছেন। উনি (আইন কমিশনের চেয়ারম্যান) বলেছেন, রায় ঠিক আছে। আপনারা সুপ্রিম কোর্টকে কোথায় নিয়ে গেছেন? কোন লেভেলে নিয়ে গেছেন? এটা দেশের সর্বোচ্চ আদালত। কোর্ট অব রেকর্ডের বাইরে আমরা রায় দিতে পারি না। আমরা সংবিধানের চুল পরিমাণ ব্যত্যয় করতে পারি না। আপনি সংবিধানের অধীনে শপথ নিয়েছেন। আপনার অপরাধ স্বীকার করা আর জনকণ্ঠের সাংবাদিক বা কোনো একজন সাধারণ ব্যক্তির স্বীকার করা—এর মধ্যে কমবেশি আছে। আপনার অপরাধ আর একজন সাধারণ নাগরিকের অপরাধ এক না। দোষ স্বীকার করার পর কী হতে পারে? একজন অপরাধীকে যখন ডকে আনা হয়, বলা হয় তুমি দোষী না নির্দোষ? তখন ওই অপরাধী বলে, দোষ স্বীকার করছি, ক্ষমা করেন। তখন আদালত কী করেন? আদালত কি তাকে খালাস দেবেন, না কী করবেন?

‘অন্যায় করেছি, নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছি’ : ওই সময় ব্যারিস্টার রফিক-উল হল বলেন, ‘আমি তো অন্যায় করেছি, নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছি। ’ আদালত বলেন, ‘একজন অপরাধীকে যখন ডকে আনা হলো, দোষ স্বীকার করল, তখন আদালত কী করবে?’ জবাবে রফিক-উল হক আবারও বলেন, ‘অন্যায় করেছি, ক্ষমা চেয়েছি। এখন যেভাবেই হোক, আমি বলব যে লঘু সাজা দিতে পারেন। ’

অ্যাডভোকেট আবদুল বাসেত মজুমদার বলেন, ‘ক্ষমা যখন চাই, তখন দোষ স্বীকার করেই চাই। আমরা নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছি। পুরো বিষয়টি আদালতের হাতে। ’

‘ক্ষমা দুই লাইনে চাইতে হয়’ : তখন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা বলেন, ‘এই আদালতের প্রথা হচ্ছে ক্ষমা দুই লাইনে চাইতে হয়। কিন্তু আপনারা কী দিয়েছেন? আপনারা বিশাল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ’

‘জানেন না কী কথা বলেছেন আপনারা’ : প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা জানি, বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা কারা। আমরা জানি, মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা কী। মি. মজুমদার (আবদুল বাসেত মজুমদার), প্রধান বিচারপতি যদি ওই মামলা থেকে নিজেকে তুলে নিতেন, তাহলে দেশে দাঙ্গা (রায়ট) লেগে যেত। জানেন না কী কথা বলেছেন আপনারা। পুরো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল হয়ে যেত। যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে আমরা অনেক সিদ্ধান্ত দিয়েছি। ’

জবাবে বাসেত মজুমদার বলেন, ‘আমরা যথাযথভাবে আবেদন দেব। এ জন্য সময় চাই। ’

‘অনেক সহ্য করেছি’ : তখন আদালত বলেন, ‘আপনার মক্কেলকে সুরক্ষা দিতে না পারলে আদালতে আসবেন না। মনে রাখবেন, আপনারা যতই ক্ষমতাধর হন না  কেন আইন কিন্তু সোজা পথে চলে। আঁকাবাঁকা পথে চলে না। আমরা অনেক সহ্য করেছি। সংবিধান রক্ষায় যেকোনো আদেশ দিতে আমরা কুণ্ঠাবোধ করব না। আপনি যেই হোন। ’ এ পর্যায়ে আদালত ২৭ মার্চ পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেন।


মন্তব্য