kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ জানুয়ারি ২০১৭ । ১১ মাঘ ১৪২৩। ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বিএনপিতে এক নেতার এক পদ

শফিক সাফি   

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিএনপিতে এক নেতার এক পদ

এখন থেকে বিএনপি নেতারা সংগঠনে একটি মাত্র পদে থাকতে পারবেন। কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে থাকলে অন্য কোনো কমিটির পদে থাকতে পারবেন না।

এ ছাড়া স্থায়ী ও নির্বাহী কমিটির বাকি পদে নির্বাচনে একক ক্ষমতা খালেদার হাতেই দিয়েছেন কাউন্সিলররা। এসব প্রস্তাবসহ আরো কিছু বিষয় গঠনতন্ত্রে যুক্ত করার পক্ষেই মত দিলেন কাউন্সিলররা।

গতকাল শনিবার বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলের দ্বিতীয় অধিবেশনে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো কাউন্সিলরদের কণ্ঠভোটে পাস হয়। এ অধিবেশনেও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া উপস্থিত ছিলেন। শেষে কাউন্সিলরদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন বিএনপিপ্রধান।

প্রস্তাব উত্থাপনের আগে অন্তত ১৪ জন কাউন্সিলর বক্তব্য দেন। এতে কয়েকজন কাউন্সিলর জেনে-শুনে-বুঝে সময় নিয়ে কমিটি দিতে দলীয় প্রধানের কাছে অনুরোধ জানান। কেউ কেউ দলের সংস্কারপন্থীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তাঁরা বলেন, সংস্কারপন্থীরা বেঈমান, কুলাঙার—এদের দলে নেওয়া যাবে না। কারণ সুযোগ পেলে তাঁরা আবার বেঈমানি করবেন।

এর জবাবে খালেদা জিয়া তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘আপনারা তৃণমূলের কমিটি থেকে বেঈমানদের বের করে দেন। আমি কমিটি গঠনের সময় মুনাফেকদের রাখব না। ’

খালেদা জিয়া বলেন, গতবার ঢাকায় আন্দোলন হয়েছে, আমি স্বীকার করছি। কিন্তু কিছু বেঈমান ও মুনাফেক আন্দোলন তুঙ্গে উঠলে তা বন্ধ করে দেয়, যার কারণে আন্দোলন সফল হয় না। আগামী দিনে কর্মসূচি গ্রহণের আগে তৃণমূলের মতামত নেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, ‘আমি আপনাদের তৃণমূলের কমিটি করতে বলেছি। আপনারা তা করতে পারেননি। অনেকে পকেট কমিটি গঠন করেছেন। লেনদেন ও ভাইয়ের কমিটি এ দলে হবে না। আপনারা দায়িত্ব দিয়েছেন আমি যোগ্যদের দিয়ে কমিটি করব। ’

দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি নেতাকর্মীদের চাওয়া ছিল, এক ব্যক্তি যেন একাধিক পদে না থাকেন। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা থেকে শুরু করে অনেকেই একাধিক পদে আছেন। এ নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। অবশেষে এক ব্যক্তির এক পদ নিশ্চিত করল দলটি।

এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কাউন্সিলে বলা হয়, থানা ও জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অন্য কমিটিতে থাকতে পারবেন না। আবার স্থায়ী কমিটি ও উপদেষ্টাতে যাঁরা থাকবেন, তাঁরাও অন্য কোনো পদ পাবেন না। তবে প্রয়োজনবোধে চেয়ারপারসন কাউকে একাধিক পদ দিতে পারেন।

ক্ষুদ্র মিলনায়তনে তিন হাজার কাউন্সিলরের জায়গা না হওয়ায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণেও তা সম্প্রসারণ করা হয়। সেখানে বড় পর্দার মাধ্যমে মিলনায়তের ভেতরের অনুষ্ঠান দেখানো হয়। দলের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র সংশোধন উপকমিটির আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম সংশোধনী প্রস্তাবগুলো সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়ার পর তা উপস্থাপন করেন নজরুল ইসলাম খান।

তিনি বলেন, বিষয়ভিত্তিক ২৫টি উপকমিটি গঠন করা হবে বলে জানানো হয় কাউন্সিলে। এদের সদস্যসংখ্যা হবে ১২ জন করে। দলের সদস্য ফি পাঁচ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা করা হয়েছে। কেউ মাসিক চাঁদা ছয় মাস না দিলে তার পদ স্থগিত করা হবে, আর এক বছর না দিলে পদ বাতিল করা হবে। আর টানা দুই বছর চাঁদা না দিলে তার প্রাথমিক সদস্যপদ স্থগিত করা হবে। তিন বছর না দিলে প্রাথমিক সদস্য পদ বাতিল করা হবে।

তিনি জানান, এ ছাড়া নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ১৭ থেকে ৩৫ জন করা হয়েছে। চেয়ারপারসন যত খুশি তত উপদেষ্টা দিতে পারবেন। কারণ এটি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। বিএনপির উপদেষ্টা কমিটি থাকবে। যুগ্ম সম্পাদক সাতজনই থাকবেন। সাংগঠনিক সম্পাদক প্রতি বিভাগে একজন করে। সহসাংগঠনিক সম্পাদক থাকবেন প্রতি বিভাগে দুজন।

এর বাইরে ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক তিনজনের পরিবর্তে চারজন করা হয়েছে। পরিবার ও কল্যাণে একজন সম্পাদক ও দুজন সহসম্পাদক থাকবেন। ক্ষুদ্র ঋণবিষয়ক নতুন সম্পাদকীয় পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রশিক্ষণসহ সম্পাদক একজনের জায়গায় দুজন, গণশিক্ষা, স্বনির্ভর বন, জলবায়ুসহ যেসব সম্পাদকীয় পদে সহসম্পাদক নেই প্রতিটিতে একজন করে সহসম্পাদক থাকবে। সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক থাকবেন সাতজন।

এখন থেকে কাউকে বহিষ্কার করতে চেয়ারপারসন বা স্থায়ী কমিটির অনুমোদন লাগবে। গুরুত্বপূর্ণ প্রচারপত্র বিলি করতেও অনুমোদন লাগবে। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে তদারকির জন্য উপকমিটি থাকবে। গুলশান কার্যালয়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও মিডিয়া সেল থাকবে।  

জানা যায়, অধিবেশন শুরু হয় বিকেল ৫টার দিকে। প্রায় তিন হাজার কাউন্সিলর এতে অংশ নেন। শুরুতেই শোক প্রস্তাব পেশ করেন যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ। শোক প্রস্তাবে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান, আওয়ামী লীগের প্রথম মেয়াদের অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার স্ত্রী আসমা কিবরিয়া, আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল, মানবতাবিরোধী অপরাধী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের মৃত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য শোক জানানো হয়।

এরপর বিএনপির সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বেগম জিয়াকে বিএনপি চেয়ারপারসন ও তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন কাউন্সিল উপলক্ষে গঠিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। এ সময় নেতারা করতালি দিয়ে শীর্ষ এই দুই নেতাকে অভিনন্দন জানান।

বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও নির্বাহী কমিটির বাকি পদগুলো নির্বাচনে একক ক্ষমতা ও সর্বময় কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে। কাউন্সিল অধিবেশনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে কাউন্সিলররা এই প্রস্তাব অনুমোদন করেন।

এ ছাড়া সংশোধনী তুলে ধরতে গিয়ে নজরুল আরো বলেন, বিষয়ভিত্তিক উপকমিটি গঠন করা হবে।   উপকমিটিগুলো হচ্ছে অর্থ ও পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি, আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, গবেষণা, শিল্প ও বাণিজ্য, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, নারী ও শিশু, যুব উন্নয়ন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণ, যোগাযোগ ও গণপরিবহন, এনার্জি ও খনিজ সম্পদ, মানবাধিকার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ,  মুক্তিযুদ্ধ, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মুক্তিযুদ্ধ, ক্ষুদ্রঋণ, সুশাসন ও জনপ্রশাসন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, জাতীয় সংহতি ও এথনিক মাইনরিটি।

আন্তর্জাতিক বিষয়ক সাতজনসহ সম্পাদক, ধর্মবিষয়ক তিনটির স্থলে চারটি সহসম্পাদক এবং প্রশিক্ষণ, পরিবারকল্যাণ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক দুটি করে সহসম্পাদক পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া অর্থনীতি, জলবায়ু, প্রশিক্ষণ, গণশিক্ষা, বন ও পরিবেশ, স্বনির্ভর, তাঁতিবিষয়ক, তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক, প্রবাসীকল্যাণ, বিজ্ঞান প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্প ও বাণিজ্য, মানবাধিকার, উপজাতিবিষয়ক একটি করে সহসম্পাদক পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।

ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক একটি সম্পাদকীয় ও একটি সহসম্পাদক পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া গঠনতন্ত্র সংশোধনীতে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণে বিশেষ ধারা সংযোগ করা হয়েছে। ‘এক ব্যক্তির এক পদ’-এর ধারাসংবলিত বিধান গঠনতন্ত্রে সংশোধন করা হয়। এতে স্থায়ী কমিটি ও নির্বাহী কমিটির কর্মকর্তারা অন্য কোনো পদে থাকতে পারবেন না। একইভাবে কেউ জেলা, উপজেলা, থানা, পৌরসভায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে থাকলে তাঁরা অন্য কোনো পদে অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না।

দলের ঘোষণাপত্রে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির প্রতিষ্ঠার তারিখ সংযোগ করা হবে। একই সঙ্গে শহীদ জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি সংযুক্ত করা হবে।

রুদ্ধদ্বার অধিবেশনের কাউন্সিলের সমাপনী বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া। এর আগে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে বক্তব্য দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বক্তব্যে খালেদা জিয়া আরো বলেন, বিএনপি জনগণের দল, তাই জনগণকে সঙ্গে নিয়েই সব কিছু করবে। বিএনপি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তাই হাসিনা মার্কা কোনো নির্বাচনে কখনো কোনো দিন অংশ নেবে না। বরং হাসিনাকে বাদ দিয়েই নির্বাচন করা হবে, যে নির্বাচন হবে জনগণের নির্বাচন।

নিজ দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমাদের দলে কিছু বেইমান ও মীরজাফর আছে যারা আন্দোলনকে সফল হতে দিচ্ছে না। কাজেই এদের দল থেকে বাদ দিতে হবে। বিএনপিতে লোকের অভাব হবে না। অনেক ভালো ভালো লোক বিএনপিতে যোগ দিতে চাচ্ছে। ’

খালেদা জিয়া বলেন, ‘ভুল হতেই পারে। আপনারা দোষারোপ করছেন কিন্তু আপনারাও তো ঠিকমতো কাজ করতে পারেননি। আপনাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল কমিটি করার জন্য, তখন আপনারও তো অমুক ভাই তমুক ভাইয়ের অজুহাতে, টাকার বিনিময়ে কমিটি গঠন করেছেন বলে প্রমাণ রয়েছে। কাজেই একে অপরের দোষ না খুঁজে ঐক্যবদ্ধ হই—তাহলেই জাতীয় ঐক্য সম্ভব হবে। ’

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের কঠোর সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, এরশাদ বেইমান, কখন কী করে ঠিক নেই। সে পাগল নয়, জাতে মাতাল তালে ঠিক।

কাউন্সিলের কর্ম অধিবেশন পরিচালনা করেন রুহুল কবীর রিজভী। পরে খালেদা জিয়াসহ কাউন্সিলররা মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।


মন্তব্য