kalerkantho


মোনায়েম খাঁকে হত্যা করে এক কিশোর যোদ্ধা

শরীফুল আলম সুমন   

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মোনায়েম খাঁকে হত্যা করে এক কিশোর যোদ্ধা

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কিছুদিন আগেই পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদ থেকে অবসরে যান মোনায়েম খাঁ। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি থাকতেন রাজধানী ঢাকার বনানীতে।

একাত্তরে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর অন্যতম দোসর ছিলেন এই ব্যক্তি। সাবেক গভর্নর ও দখলদার পাকিস্তানিদের দোসর হওয়ায়

 স্বাভাবিকভাবেই তাঁর বাড়িতে নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল না। রাতদিন কড়া পাহারায় থাকত পুলিশ-মিলিটারি। বাড়িতে ব্যক্তিগত চাকর-বাকরেরও অভাব ছিল না। এত নিরাপত্তার মধ্যেও গেরিলা বাহিনী ‘ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপে’র সর্বকনিষ্ঠ সদস্য মোজাম্মেল হক বীরপ্রতীক হত্যা করেন মোনায়েম খাঁকে। ১৯৭১ সালের ১৩ অক্টোবর এক দুর্ধর্ষ গেরিলা অপারেশনে এ সফলতা আসে। ওই দিন মোজাম্মেল হকের স্টেনগানের গুলিতে নিজ বাসায়ই লুটিয়ে পড়েন মোনায়েম খাঁ। রচিত হয় এক উজ্জ্বল ইতিহাস।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মোজাম্মেল হক বীরপ্রতীকের বয়স ছিল ১৪ বছর।

রাজধানীর ছোলমাইদে তাঁর বেড়ে ওঠা। পড়তেন পুরাতন এয়ারপোর্ট এলাকার স্টাফ ওয়েলফেয়ার হাই স্কুলে নবম শ্রেণিতে। ওই বয়সেই মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য পান বীরপ্রতীক উপাধি। পরে ঢাকা মহানগরীর ভাটারা ও সাঁতারকুল ইউনিয়ন পরিষদে ১৩ বছর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এ বীরপ্রতীক মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানাতে ভাটারার ফাজিলারটেকে নির্মাণ করেছেন সৌধ ‘বীরের প্রত্যাবর্তন’। তাঁর হাতেই ছোলমাইদে গড়ে উঠেছে ‘মুক্তিযোদ্ধা জামে মসজিদ’। বর্তমানে সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়ে তিনি দিন পার করছেন।

মোজাম্মেল হক বীরপ্রতীক মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনা তুলে ধরেন কালের কণ্ঠ’র কাছে। জানান ‘ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপে’র বিভিন্ন অপারেশনের তথ্য, বিশেষ করে মোনায়েম খাঁকে হত্যার কাহিনী তুলে ধরেন বিষদভাবে। তিনি বলেন, ‘এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে চাচাতো ভাই গিয়াসউদ্দিন, রহিমউদ্দিন, আনোয়ার হোসেন বীরপ্রতীক, ইস্রাফিল খন্দকারসহ আরো কয়েকজনের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু তখন পরিবারের বাধায় যাওয়াটা আটকে যায়। এর কিছুদিন পরই ট্রেনিং শেষ করে কমান্ডার ইঞ্জিনিয়ার সিরাজের নেতৃত্বে একটি গেরিলাদল সর্বপ্রথম ঢাকায় প্রবেশ করে। কিন্তু বয়স কম হওয়ায় তারাও আমাকে প্রথমে দলে নিতে অপারগতা জানায়। অনেক কাকুতি-মিনতির পর আমাকে গুলশানে এক অবাঙালির দোকান ও একজন বিদেশির বাড়িতে গ্রেনেড ছোড়ার অপারেশনে পাঠানো হয়। সেখানে সফল হলে জুন মাসের মাঝামাঝি ভারতের মেঘালয়ে ট্রেনিংয়ে পাঠানো হয়। ’

মোজাম্মেল হক বলেন, ‘ট্রেনিং ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন মেজর হায়দার। তাঁর অধীনে শুরু হলো গেরিলা ট্রেনিং। এক্সপ্লোসিভ, মাইন, এলএমজি, তিন ও দুই ইঞ্চি মর্টার, এসএলআর, থ্রি নট থ্রি চালানো শিখলাম। মাসখানেক পর আমাদের ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। আমাদের ১৩ জনের দলটির নাম দেওয়া হয় ‘ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপ’। এ দলে ছিলেন এম এ লতিফ (গ্রুপ কমান্ডার), রহিমউদ্দিন (ডেপুটি কমান্ডার), আনোয়ার হোসেন, ফেরদৌস, গিয়াসউদ্দিন, জয়নালসহ আরো কয়েকজন। আমরা কুমিল্লার সিঅ্যান্ডবি রোডে মিলিটারি অ্যামবুশে পড়ি। কোনো রকম প্রাণে বেঁচে আবার ভারত ফিরে যাই। এবার বলা হলো, এদের দিয়ে যুদ্ধ হবে না, আর্মস বহনে কাজে লাগাও। এবার আমি মেজর হায়দারের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করলাম। তাঁর আশপাশে ঘোরাঘুরি করি। তখন তিনি একদিন ডেকে বললেন, ‘কী চাস?’ বললাম, ‘আমাদের গেরিলা যুদ্ধে পাঠান। ’ প্রশ্ন করলেন, ‘মোনায়েম খাঁকে মারতে পারবি। ’ আমিও উল্টো প্রশ্ন ছুড়লাম, ‘মারতে পারলে কী দেবেন?’ ‘কী চাস?’ বললাম, ‘আপনার কোমরের পিস্তলটি। ’ এবার তিনি ক্যাম্পে গিয়ে গ্রুপ নিয়ে তৈরি হতে বললেন। জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে একদিন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সন্ধ্যায় রওনা হলাম। বিভিন্ন স্থান ঘুরে অবশেষে রূপগঞ্জের ক্যাম্পে পৌঁছলাম। ’

এ মুক্তিযোদ্ধা বলতে থাকেন, ‘ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গ্রুপের সঙ্গে বিভিন্ন অপারেশনের সঙ্গে আলাদাভাবে মোনায়েম খাঁকে হত্যার পরিকল্পনা শুরু করলাম। আমার চাচার মোনায়েম খাঁর বাড়িতে আসা-যাওয়া ছিল। তিনিই সে বাড়ির কাজের লোকদের চিনিয়ে দিলেন। আমার ভাই সার্জেন্ট আবদুর রশীদ ও ইস্রাফিল খন্দকারকে সঙ্গে নিয়ে মোনায়েমের বনানীর বাড়িতে গেলাম। তখন রাখাল সাজাহান ও কেয়ারটেকার মোখলেছুর রহমান মাঠে গরু চরাচ্ছিলেন। তাঁরাও মোনায়েম খাঁর ওপর ক্ষিপ্ত। বললেন, চারদিকে এত লোক মরছে; কিন্তু মোনায়েম খাঁকে কেউ মারতে আসে না কেন। এভাবে এগোতে এগোতে প্রায় অক্টোবর মাস চলে এসেছে। মোনায়েম খাঁর বাড়ির কাজের লোকদের সহযোগিতার আশ্বাসে একদিন আমি ব্যাগে করে একটি স্টেনগান, থার্টি সিক্স এবং ফসফরাস নিয়ে বনানী কবরস্থানে যাই। আমাকে তাঁরা মোনায়েম খাঁর বাড়ির কলাবাগানে বসান। কিছুক্ষণ পর জানান, মোনায়েম শুতে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁকে মারতে হলে তাঁর ড্রইংরুমে থাকা চাই। তখন বাড়িটিতে এক প্লাটুন পুলিশ পাহারায় ছিল। সেদিন সুযোগ না পেয়ে পাশের খ্রিস্টান বাড়িতে অস্ত্র লুকিয়ে ফিরে গেলাম। পরদিন আবার গেলাম। ওই দিনও ফিরে যেতে বাধ্য হই। এর পরদিন ১৩ অক্টোবর আনোয়ার হোসেন বীরপ্রতীককে নিয়ে অপারেশনে গেলাম। কলাবাগানে লুকিয়ে পড়লাম। জানলাম, আজ ড্রইংরুমেই আছেন মোনায়েম খাঁ। আড়াল থেকে দেখলাম মোনায়েম খাঁর এক পাশে তাঁর মেয়ের জামাই জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল ও অন্য পাশে শিক্ষামন্ত্রী আমজাদ হোসেন। এবার সরাসরি ঢুকে পড়লাম। স্টেনগানটি অটোমেটিকে দেওয়া ছিল। ট্রিগারে চাপ দিতেই গুলি বেরিয়ে গেল। মোনায়েম খাঁ সোফা থেকে লুটিয়ে পড়লেন। অন্য দুজন মাটিতে শুয়ে চিত্কার করতে লাগলেন। আমি আবার ট্রিগার চাপলাম; কিন্তু গুলি বের হলো না। ম্যাগাজিন বদলেও কাজ হলো না। পিন খুলে গ্রেনেড ছুড়লাম, ফুটল না সেটিও। পেছন ফিরে দেখি সঙ্গী বেরিয়ে গেছে। আমিও দৌড় দিলাম। দেয়াল টপকে বেরিয়ে গেলাম। বাড়ির বেলুচ রেজিমেন্টের পুলিশ বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ছে। রেললাইনে অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গান থেকেও গুলি চলছে। মিলিটারিরা গুলি চালাচ্ছে বিভিন্ন ভবনের ওপর থেকে। মিলিটারি জিপ মোনায়েম খাঁর বাড়ির চারদিক ঘিরে ফেলেছে। আমি কিছুটা হেঁটে এসে গুলশান লেকে একটি ভাঙা নৌকা বেয়ে এগোতে লাগলাম। বারিধারা ও লেকের ঢালাই ব্রিজে মিলিটারিদের পাহারা ছিল। তাই ব্রিজের নিচ দিয়ে নদী পার হয়ে ওপারে চলে গেলাম। এলাকায় ফিরে ইস্রাফিল খন্দকারকে বললাম পানি খাওয়াও, অপারেশন সফল। এরপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে দেখি মোনায়েমের সেই কাজের লোক আনোয়ার হোসেন ও পরিবারের অন্যান্য সদস্য আমাকে ঘিরে বসে আছে। তখন সবাই আমাকে রূপগঞ্জের ক্যাম্পে যেতে বলল; কিন্তু আমি বাড়িতেই থেকে গেলাম। পরদিন সকালে চাচা খবর দিলেন, রেডিওর খবরে বলেছে মোনায়েম খাঁ মারা গেছে। তখন এলাকায়ও প্রচার হয়ে গেছে যে আমিই মোনায়েম খাঁকে মেরেছি। এরপর ক্যাম্পে চলে গেলাম। ’


মন্তব্য