kalerkantho


ক্ষমতাসীনদের দাবি

ভিশন ২০৩০ আওয়ামী লীগের অনুকরণেই

বিশ্লেষকদের মত, খালেদার বক্তব্য সার্বিক বিবেচনায় ভালো তবে পূর্ণাঙ্গ নয়

তৈমুর ফারুক তুষার   

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ভিশন ২০৩০ আওয়ামী লীগের অনুকরণেই

বিএনপির ভিশন ২০৩০ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনুকরণে ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সামনে রেখে যে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্পের খসড়া তৈরি হচ্ছে সেখান থেকেও কপি করা হয়েছে।

এমনটাই মনে করেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা। তাঁদের মতে, বিএনপি যে পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে তাতে আওয়ামী লীগ ঘোষিত রূপকল্পের বাইরে নতুন তেমন কিছুই নেই।

বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করলে তা দেশের জন্য ভালো হবে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শান্তনু মজুমদার বলেন, কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিএনপি তার অবস্থান স্পষ্ট করেনি।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন সামনে রেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার খসড়া তৈরির কাজ চলছে। সেই খসড়ায় যেসব উন্নয়ন পরিকল্পনা রাখা হয়েছে তার বেশ কয়েকটি বিএনপি ঘোষিত ভিশন-২০৩০-এ আছে। এটা কাকতালীয় নয়, বিএনপি নেতারা আওয়ামী লীগের পরিকল্পনার তথ্য যেকোনোভাবেই হোক সংগ্রহ করে তা তাঁদের পরিকল্পনায় যুক্ত করেছেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, কথায় বলে, যার হয় না ৯-এ তার হয় না ৯৯-এ। খালেদা জিয়া ১৯৯১-৯৬ ও ২০০১-০৬ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন।

এ দুই মেয়াদে তিনি দেশের কোনো উন্নয়ন করতে পারেননি। এখন আওয়ামী লীগের অনুসরণে ভিশন-২০৩০ দিচ্ছেন। কিন্তু দেশের মানুষ তাতে সাড়া দেবে না। কারণ জনগণ তাদের অতীত দেখেছে, বর্তমানও দেখছে। তারা আন্দোলনের নামে রাষ্ট্রের সম্পদ ধ্বংস করছে, তারা রাষ্ট্রের আয় বাড়াবে কিভাবে?

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘আমরা রূপকল্প-২০২১ দিয়েছি। আগামী কাউন্সিলে আরেকটি রূপকল্প ঘোষণার কথা আছে। এর খসড়াও তৈরি হয়েছে। বিএনপি যে ভিশন-২০৩০-এর কথা বলছে সেটির মূল বিষয় সেখানে আছে। আমার মনে হয়, বিএনপি নেতারা আমাদের রূপকল্পের একটা কপি সংগ্রহ করে সেখান থেকে তাঁদের ভিশন-২০৩০ নির্ধারণ করেছেন। আমার মনে হয়, সে জন্যই তাঁরা তড়িঘড়ি করে আমাদের আগে তাঁদের সম্মেলনের দিন নির্ধারণ করেছেন। ’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন বলেন, ‘বিএনপি আওয়ামী লীগকে অনুসরণ করে ভিশন-২০৩০ ঘোষণা দিয়েছে। আমাদের রূপকল্প ছিল বাস্তবতা থেকে উদ্ভূত ও বাস্তবায়নযোগ্য। কিন্তু বিএনপি ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করেছে মানুষকে প্রতারিত করতে। ২০২১ সালের আগেই আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছি। সে ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সালে আমরা উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হব। এর জন্য বিএনপির ভিশনের দরকার পড়বে না। ’

লেনিন বলেন, ‘তাঁরা ডাবল ডিজিটের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির কথা বলেছেন। অর্থনীতি বোঝেন না বলেই খালেদা জিয়া এ কথা বলেছেন। কারণ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৮-এর ওপরে ধারাবাহিকভাবে থাকলেই আমরা সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হব। এর জন্য ডাবল ডিজিট দরকার পড়বে না। ’ 

লেনিন আরো বলেন, তাঁদের কাউন্সিলে ভিশন-২০৩০ ঘোষণার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁরা অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন কি না, যুদ্ধাপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতাদান, শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক তোলা, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে না আসা, এসব সিদ্ধান্তকে ভুল বলে স্বীকার করে নিয়ে বিএনপি নেতারা নতুনভাবে পথ চলার ঘোষণা দিয়েছেন কি না।

গতকাল বিকেলে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, তিনি কিসের ভিশন দেন। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তো তিনি দুর্নীতি ও সন্ত্রাস লালন করেছেন। ক্ষমতার বাইরে থেকে ২০০৯-১৪ পর্যন্ত অবরোধের নামে আগুন-সন্ত্রাস করেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করেছেন, পাকিস্তানের ভাবধারায় পরিচালিত হয়েছেন। এগুলোর জন্য তো তিনি জাতির কাছে ক্ষমা চাননি। তিনি অনুতপ্ত হননি। এই অবস্থায় তিনি ভিশন-২০৩০ কিংবা ৪০ দিন, এটা অর্থহীন।

খালেদা জিয়ার ভাষণ সম্পর্কে মতামত জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, সার্বিক বিবেচনায় ভাষণটি ভালো হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে যদি এসব ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে পারে তাহলে তা দেশের জন্য ভালো হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শান্তনু মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশেষ প্রেক্ষাপটে, বিশেষ বিশেষ বিষয়ে একটি রাজনৈতিক দলের সুস্পষ্ট অবস্থান থাকা দরকার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেসব বিষয়ের মধ্যে অন্যতম এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জঙ্গিবাদ, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুতা। খালেদা জিয়ার বক্তব্যে এ বিষয়ে বিএনপির সুস্পষ্ট অবস্থান প্রকাশ পায়নি।

তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার ভাষণ ভালো কি মন্দ তা আমি বলব না। তবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের মতো যেসব বিষয় নিয়ে আমাদের সমাজ বিভাজিত সেসব বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য আসেনি। আমার কাছে তাঁর ভাষণকে একটি নির্বাচনী ইশতেহার অথবা কর্মসূচি মনে হয়েছে, যেটি তিনি দীর্ঘদিন পরে অনুষ্ঠিত দলের কাউন্সিলে দিলেন। ’

বিএনপি ঘোষিত ‘ভিশন-২০৩০’ শান্তনু মজুমদারের কাছে নতুন মনে হয়নি। নতুন ধারার রাজনীতি ও সরকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা আসলে কিছু বোঝায়নি। দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু সংযোজন হবে। দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদের মাধ্যমে সমাজের অভিজাত শ্রেণিকে হয়তো আইনসভায় নিয়ে আসা যাবে, কিন্তু এটা হলে কী লাভ হবে, না হলে কী ক্ষতি হচ্ছে—এসব আমার কাছে স্পষ্ট নয়। তবে পৃথিবীতে এ ব্যবস্থার সফলতা ও বিফলতার নজির প্রায় সমান সমান। ’

শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘তার মানে এই নয় যে বিএনপি নেত্রী ১০-এ শূন্য পাবেন। তিনি অনেক ভালো কথাও বলেছেন। তবে তাঁর ভাষণের মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি। পাশাপাশি একটি দলকে আধুনিক রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত করতে চাইলে কিছু বিষয় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বিএনপির ক্ষেত্রে সেসব বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে বলে আমার মনে হয়নি। ’ 

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপি ও তার কাউন্সিলরদের উদ্দেশে পত্রিকায় একটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন। কাউন্সিলে তাঁর প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হলো, ‘জানতে চাইলে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া আমার বক্তব্যের দু-চারটা জিনিস বলেছেন। এটা ভালো মনে হয়েছে। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের নাম বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে জিঘাংসা না থাকার কথা বলেছেন, মানুষের কল্যাণের জন্য স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো বলেছেন—এসব ভালো দিক। তবে আমার প্রত্যাশা ছিল, তিনি প্রবাসী সরকারের সবার কথা বলবেন, সেক্টর কমান্ডারদের কথা বলবেন, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা আরো বেশি বলবেন। তিনি শুধু বড়দের কথা বলেছেন। ’

তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার ভাষণের চেয়ে তারেক রহমানের ভাষণ অনেক ভালো হয়েছে। বয়সে তরুণ হলে মানুষ যে ভালো চিন্তা করতে পারে, তারেকের বক্তব্যে সেটাই প্রমাণ হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার খালেদার বক্তব্যে আসেনি—এ বিষয়ে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, তিনি এ বিষয়ে আগে অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তবে এবার যেহেতু অনেক দিন পরে কাউন্সিল হলো সেহেতু ওই প্রসঙ্গে আবার বলার প্রয়োজন ছিল। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে বলার পাশাপাশি বিদেশি আইনজীবী আনার সুযোগ দেওয়া ও প্রসিকিউটরদের অদক্ষতা নিয়েও বলতে পারবেন। জাফরুল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, বিএনপি আবার জেগে উঠতে পারবে। তবে সে জন্য দলে তরুণ ও নারীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।  


মন্তব্য