kalerkantho

শনিবার । ২১ জানুয়ারি ২০১৭ । ৮ মাঘ ১৪২৩। ২২ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বোলিং অ্যাকশনে ত্রুটি

তাসকিন-আরাফাতের বিশ্বকাপ শেষ

ভারত গেছেন শুভাগত-সাকলাইন

নোমান মোহাম্মদ,বেঙ্গালুরু থেকে   

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তাসকিন-আরাফাতের বিশ্বকাপ শেষ

আরাফাত সানি যেন ভবিষ্যত্টা দেখে ফেলেন আগেই। তবু হৃদয়ের ভাঙচুরের শব্দ টের পেতে দেন না তিনি। ঘুণে ধরা আত্মবিশ্বাস আড়াল করে বরং আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা দেন, ‘অ্যাকশন ত্রুটিপূর্ণ হলেই-বা সমস্যা কী? এটাই তো শেষ না! আরো পরীক্ষা দিতে পারব। তখন পাস করব। ’

তাসকিন আহমেদ আবার অমন করে ভবিষ্যৎ দেখেন না। ভবিতব্যটা তিনি বরং ছেড়ে দেন সৃষ্টিকর্তার হাতে। তবু স্নায়ুর কাঁপন ঠিকই তিরতিরিয়ে ওঠে তাঁর কণ্ঠে, ‘পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের উত্তর দিয়ে এলেও ছাত্রের তো টেনশন হয়। আমারও হচ্ছে। তবু আমি এসব নিয়ে ভাবছি না। মাঝে এত খারাপ সময় গেছে যে, সব কিছু এখন ছেড়ে দিয়েছি আল্লাহর হাতে। ’

কাল মধ্যাহ্নে চিন্নাসোয়ামী স্টেডিয়ামে যখন এমনটা বলেন এই দুজন, তখনো আইসিসি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি কিছু। বাতাসে দিগ্বিদিক ভাসে কেবল নানা গুঞ্জন। তাতে আরাফাতের বোলিং অ্যাকশন অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পূর্বাভাস মিশে থাকে বর্ষার কালো মেঘের মতো; যার কেবলই বৃষ্টি হয়ে ঝরার অপেক্ষা। তাসকিনের ব্যাপার আবার তেমন নয়। তাঁর অ্যাকশন আইসিসির আতশিকাচের তলে পড়া অনেকটা যেন শরতের সাদা মেঘমালার মতো; আশঙ্কা ছড়িয়েও বৃষ্টি ঝরায় না যা। কিন্তু বেঙ্গালুরুর সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়তেই যুগল-দুঃসংবাদে স্তব্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশের ক্রিকেট। শুধু তো আরাফাত না, তাসকিনের অ্যাকশনেও লেগে গেছে ‘অবৈধ’ সিলমোহর!টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ তাই শেষ এই দুই বোলারের। আর সেটিও কোন সময়ে? অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ দ্বৈরথের আগে। এই যুগল-ধাক্কা সামলে বাংলাদেশের ক্রিকেট-ক্যারাভানকে কক্ষপথে রাখাই তো এখন দুঃসাধ্য কাণ্ডারি মাশরাফি বিন মর্তুজার জন্য!

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাই পর্বের প্রথম খেলায় নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচ অফিশিয়ালদের সন্দেহের দৃষ্টিতে বন্দি তাসকিন-আরাফাতের বোলিং অ্যাকশন। ৯ মার্চের সেই ম্যাচের পর ১২ মার্চ চেন্নাইতে আইসিসি অনুমোদিত পরীক্ষাগারে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসেন বাঁহাতি স্পিনার। ডানহাতি পেসার সেখানে যান আরো তিন দিন পর, ১৫ মার্চ। আরাফাত যে এই অগ্নিপরীক্ষায় উতরাতে পারবেন না, তা একরকম অনুমিত ছিল। আইসিসিও তাদের বার্তায় কাল জানায়, ‘বেশির ভাগ বল করার সময় আরাফাতের হাতের কনুই অনুমোদিত ১৫ ডিগ্রির চেয়ে বেশি বেঁকে যায়। ’ কিন্তু তাসকিনকে নিয়ে খুব একটা দুশ্চিন্তা ছিল না টিম ম্যানেজমেন্টের। চেন্নাইয়ের পরীক্ষায় তাঁর উতরে যাওয়াকে আনুষ্ঠানিকতা অপেক্ষা বলে ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা তো দিলেন ভিন্নমত! যদিও আরাফাতের মতো এই পেসারের বেশির ভাগ বলকে অবৈধ ঘোষণা করেনি তারা। ‘তাসকিনের সব ডেলিভারি বৈধ নয়’—ঘোষণা কেবল এটুকুই। তবে তাঁর বিশ্বকাপ শেষ করে দিতে সেটিই যথেষ্ট।

এই দুজনের বদলি চেয়ে বিশ্বকাপের টেকনিক্যাল কমিটির কাছে আবেদন করেছে বাংলাদেশ। সেটি অনুমোদিত হওয়ায় কাল রাতেই বাঁহাতি স্পিনার সাকলাইন সজীব ও অলরাউন্ডার শুভাগত হোম বেঙ্গালুরু রওনা হয়েছেন। আজ সকালে অনুশীলনের পর কালকের অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাঁচা-মরার বিপক্ষে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেবেন তাঁরা।

কিন্তু দলের আত্মবিশ্বাসে যে ঘুণ করেছে, সেটি কি সারবে এত দ্রুত!দলের সঙ্গে থাকা বিসিবি ক্রিকেট অপারেশন্সের চেয়ারম্যান আকরাম খান গুরুত্ব দিচ্ছেন সে জায়গাতেই, ‘ছেলেরা স্বাভাবিক কারণেই খুব আপসেট। ওদের সঙ্গে আমরা কথা বলছি। কেননা সামনেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ। এই ম্যাচের জন্য যেন মানসিকভাবে ওরা প্রস্তুত থাকে, সে চেষ্টা করছি। ’ দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ বেশি বিস্মিত তাসকিনের কারণে, ‘এভাবে দুজন খেলোয়াড়ের বোলিং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়াটা আমাদের জন্য বড় একটা ধাক্কা। এমন কিছু হবে আমরা আশা করিনি। বিশেষত তাসকিনেরটা তো অবশ্যই না। ’ এটি সামলে নিয়ে পরের ম্যাচের দিকে দৃষ্টি তাঁরও, ‘এখন কিছু করার নাই। আমরা পেশাদার দল। আগামীতে কিভাবে খেলতে পারব, সেটা নিয়েই আমাদের বেশি চিন্তা। সে অনুযায়ী কোচ-অধিনায়করা পরিকল্পনা করবেন। ’

আইসিসির সন্দেহের তালিকায় আরাফাত-তাসকিন পড়ার পর বাছাই পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ খেলতে নেমেছিল এই দুজনের জন্য। দলের সমর্থনটা বোঝা যায় তাতে। এবার বোলিং অ্যাকশন অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পরও সমর্থনের সেই ছায়া সরে যাচ্ছে না। বরং তাঁদের পাশে থাকার ঘোষণা কাল রাতে টিম হোটেল রিজ কার্লটনে দাঁড়িয়ে দেন ম্যানেজার মাহমুদ, ‘হঠাৎ করে যদি শুনি আমি আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলতে পারব না—খারাপ তো লাগবেই। ওদেরও খারাপ লাগছে হয়তো-বা। তবে আমরা ওদের সঙ্গে আছি। এর আগে আল-আমিন এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে, সে ফিরে এসেছে। এটা বড় কোনো ব্যাপার না। হয়তো এই মুহূর্তে খুব খারাপ লাগছে। আমরা আশা করি সবাই মিলে ওদের এটা বুঝিয়ে দিতে পারব। ’

তাসকিন-আরাফাতকে না হয় বোঝাবেন, কিন্তু নিজেদের মনকে বোঝাবেন কী করে! বিশেষত তাসকিনের অ্যাকশন অবৈধ ঘোষিত হওয়ায় বাতাসে যে ভেসে বেড়াচ্ছে অনেক ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব। এর জবাব এখন একভাবেই দিতে পারে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কালকের ম্যাচ জিতে! আর সেই জয় তাসকিন-আরাফাতকে উৎসর্গ করে! ঘোর দুঃসময়ে তখন হয়তো একটু সান্ত্বনা পাবেন ওই দুজন।


মন্তব্য