kalerkantho


আশা আর আশঙ্কার মুস্তাফিজ

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আশা আর আশঙ্কার মুস্তাফিজ

তাঁর মন খুব খারাপ। ছোট্ট রাজকন্যার পঞ্চম জন্মদিন ছিল কাল।

যদিও ঘটা করে কেক কেটে জন্মদিন পালনের রীতিতে বিশ্বাসী না, তবু এমন দিনে মেয়ের কাছে থাকতে না পারলে মন তো কেমন কেমন করবেই! মাশরাফি বিন মর্তুজা যে শুধু বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক নন, একজন বাবাও!

গুরুত্বপূর্ণ খুব। কলকাতার ইডেন গার্ডেনস থেকে বেঙ্গালুরুর চিন্নাসোয়ামী স্টেডিয়ামে আসা বাংলাদেশ দলের ভাগ্য এবার পালটাবে বলে আশাবাদী অধিনায়ক। আর সেই আশায় তাঁর বাজির ঘোড়া ব্যাটসম্যানরা, ‘আমি ব্যাটসম্যানদের বলে দিয়েছি, যদি ১৭০ রানও বোলাররা দিয়ে দিই, তোরা ম্যাচটি হারিস না। এখানকার ব্যাটিং উইকেটে, ছোট মাঠে আমাদের সম্ভাবনা তখনো থাকবে। ’

মাশরাফি কথা বলছিলেন টিম হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে। সঙ্গে শুধু তাসকিন আহমেদ। জুমার নামাজ পড়ার জন্য বেরিয়েছেন দুজন। দল অবশ্য নিরাপত্তাবেষ্টিত অবস্থায় দলেবলে বাসে করে বেরিয়ে গেছেন একটু আগে। জিম করতে দুই পেসারের একটু দেরি হয় বলে তাঁদের অপেক্ষা হোটেলের ট্যাক্সির জন্য।

ওদিকে আরেক পেসারের অপেক্ষা একাদশে ফেরার। দিন দুয়েক ধরে বেঙ্গালুরুতে এলেও স্কোয়াডে আর কেউ স্টেডিয়ামমুখী হননি। মুস্তাফিজুর রহমান শুধু কাল সকালে চিন্নাসোয়ামীর নেটে ঘাম ঝরালেন একা। সঙ্গে বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক, ফিল্ডিং কোচ রিচার্ড হালসাল ও ফিজিও বায়েজিদুল ইসলাম। এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ইনজুরিতে পড়ার পর থেকে একাদশে ফেরার অপেক্ষা তাঁর শেষ হচ্ছে না। কাল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শেষ হবে কি না, তা নিয়েও নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি হিথ স্ট্রিকের পক্ষ থেকে।

তাতে দলে চাপা অস্বস্তি বাড়ছে ক্রমশ। না হয় মুস্তাফিজ বিশেষ প্রতিভা, কিন্তু তাঁর প্রতি এই বিশেষ ব্যবহার কেন? বাংলাদেশ ক্রিকেট সংসারে এখন যে সবাইকে এক চোখে দেখার রীতি! সেখানে ইনজুরিতে থাকার পরও মুস্তাফিজকে দিনের পর দিন বয়ে নেওয়ায় প্রশ্ন উঠছে ঠারেঠোরে। অনেকের মনে তো এই প্রশ্নও দেখা দিয়েছে, ‘আমার যদি ওর অবস্থা হতো, তাহলে কি দল এভাবে টেনে নিত?’

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ থেকেই মুস্তাফিজের ফিটনেস নিয়ে এই লুকোচুরি। প্রতিটি ম্যাচের আগে খেলানো, না খেলানোর দোলাচল। এবং শেষ পর্যন্ত গিয়ে সেই না খেলানোর সিদ্ধান্ত। বাছাই পর্বের তিন ম্যাচের পর মূল পর্বে পাকিস্তানের বিপক্ষেও একই ঘটনা। অথচ এই পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলাকেই ‘পাখির চোখ’ করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহের অনুমোদন না পাওয়ায় একাদশে রাখা হয়নি মুস্তাফিজকে। কোচ এই পেসারকে আলাদা চোখে দেখছেন বলে খানিক অস্বস্তি দলের ভেতর। যে কারণে অনেকের মনে উঠেছে অমন প্রশ্ন।

বোলিং কোচ স্ট্রিক কাল শকুনদৃষ্টিতে দেখেছেন মুস্তাফিজের বোলিং। এরপর গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপচারিতায় তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয় প্রশ্নটি—মুস্তাফিজের অবস্থায় স্কোয়াডের সবাই কি একই মর্যাদা পেত টিম ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকে? ‘ও আমাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ওদেরকে একইভাবে দেখা হতো’—স্ট্রিকের এই উত্তরের সম্পূরকে প্রশ্ন, তাহলে কি শুধু গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের জন্য এই ব্যবস্থা? ‘আমাদের দলে সবাই গুরুত্বপূর্ণ। সবাইকে একভাবে দেখা হবে’—বলে যেন নিজেকে কিছুটা শুধরে নেন বোলিং কোচ। কিন্তু একজন মোহাম্মদ মিঠুন কিংবা একজন আরাফাত সানিকে এভাবে ম্যাচের পর ম্যাচ টেনে নিত টিম ম্যানেজমেন্ট—এমনটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। হাতুরাসিংহের সুদৃষ্টিতে যেটি পাচ্ছেন মুস্তাফিজ। দলের ভেতরকার অস্বস্তি সে কারণেই।

আর এই পেসার খেলবেন কী খেলবেন না—এ নিয়ে দোলাচলে ম্যাচের পরিকল্পনাও তো হয় ক্ষতিগ্রস্ত। স্ট্রিক অবশ্য সে আলোচনায় না গিয়ে মুস্তাফিজকে পরের ম্যাচগুলোয় পাওয়ার আশা রাখলেন, ‘মুস্তাফিজ আমাদের জন্য এমন গুরুত্বপূর্ণ একজন, যাকে পরের তিন ম্যাচের জন্য পেলে দারুণ হবে। ’ যদি ৭০ শতাংশ ফিট থাকেন তিনি, তবে কি অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলানো হবে? ‘না, শতভাগ ফিট হলেই খেলানো হবে’— বোলিং কোচের উত্তরেই ছড়িয়ে থাকে কাল মুস্তাফিজের মাঠে নামার আশঙ্কা।

এর আগে চিন্নাসোয়ামীর নেটে যেমন বোলিং করেছেন মুস্তাফিজ, তাতে অবশ্য আশঙ্কার মেঘ সরিয়ে সম্ভাবনার সূর্যই আলো ছড়ায় বেশি করে। চার ওভার বোলিং করেছেন পুরো রানআপে। আর সেটি কোনো ব্যথা ছাড়াই। তবু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলানোর বিষয়টি সময়ের হাতে ছেড়ে দিতে চান স্ট্রিক, ‘ও আজ চার ওভার বোলিং করেছে। কোনো ব্যথা অনুভব করেনি। করেছে সব ধরনের বল। আর সেটি পুরো গতির কাছাকাছিতে। এই মুহূর্তে সবই ভালো। তবে আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব ম্যাচের দিন। ’ তাঁর ফেরা যে বাংলাদেশ দলের জন্য খুব ইতিবাচক হবে, জানা সেই কথাটিই বললেন বোলিং কোচ, ‘এশিয়া কাপের ফাইনালে মুস্তাফিজকে পেলে হয়তো ওই রানেও আমরা ভারতকে আটকাতে পারতাম। পাকিস্তানের বিপক্ষে আগে ওর সাফল্য আছে বলে আগের ম্যাচে পেলেও দারুণ হতো। কিন্তু পেসারদের ইনজুরি হবেই, এটা  কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। মুস্তাফিজ ফিট হয়ে পরের ম্যাচের বিবেচনায় ফিরলে আমাদের জন্য তা হবে দারুণ ইতিবাচক। ’

পাকিস্তানের বিপক্ষে আগের খেলায় হারলেও পুরো দলের মানসিকতায় তা নেতিবাচক প্রভাব নাকি ফেলতে পারেনি। দুই দিনের বিশ্রামে ক্রিকেটাররা চনমনে হয়ে উঠেছেন বলে দাবি ম্যানেজার খালেদ মাহমুদের, ‘ছেলেরা সত্যি খুব ক্লান্ত ছিল। টানা অনেক ম্যাচ খেলেছে। এক শহর থেকে অন্য শহরে ছুটতে হয়েছে। এখন দুই দিনের বিশ্রামে ওরা ঝেড়ে ফেলছে ক্লান্তি। কাল থেকে অনুশীলনে নেমে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের প্রস্তুতি আমরা নেব। ’ সেই প্রস্তুতির পথে অস্বস্তির ছোট্ট আরেক কাঁটা হয়ে আছেন তাসকিন ও আরাফাত। বোলিং অ্যাকশন সন্দেহজনক হওয়ায় এরই মধ্যে চেন্নাইতে পরীক্ষা দিয়ে এসেছেন তাঁরা। আজই সেই টেস্টের ফল জানা যাবে। তাতে যদি উতরে যেতে পারেন দুজন, তাহলে তো ভালোই। কিন্তু যদি তা না হয়, মুস্তাফিজকে ঘিরে প্রশ্নটি উঠবে আরো বড় করে।

তাসকিন-আরাফাতের মধ্যে কেউ যদি পরীক্ষায় ফেল করেন, আর মুস্তাফিজ আগের ম্যাচগুলোর মতো ফেল করেন ফিটনেস টেস্টে—তাহলে? কোন বোলিং লাইন নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলতে নামবে বাংলাদেশ?


মন্তব্য