kalerkantho


ময়মনসিংহের আফসার বাহিনী

আজিজুল পারভেজ ও নিয়ামুল কবীর সজল   

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ময়মনসিংহের আফসার বাহিনী

মুক্তিযুদ্ধের সময় ময়মনসিংহের ভালুকা এলাকায় বিশাল এক বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া বাঙালি সুবেদার মেজর (অব.) আফসার উদ্দিন আহমেদ। আফসার উদ্দিনের নামেই পরিচিত এ বাহিনী অস্ত্র সংগ্রহ, প্রশিক্ষণসহ সব কাজই সেরেছে দেশের ভেতর।

শত্রুদের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করে তারা। এ বাহিনী ভালুকা, ত্রিশাল, ফুলবাড়িয়া, গফরগাঁও, শ্রীপুর, জয়দেবপুর, মীর্জাপুর, কালিয়াকৈরসহ আশপাশের বেশ কিছু এলাকায় মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য এলাকার মানুষের কাছে কিংবদন্তিতে পরিণত হন আফসার উদ্দিন। মুক্তিযুদ্ধে নিজ সন্তানকেও হারিয়েছেন তিনি।

আফসার উদ্দিনের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৪৮ সালে রিলিজ হয়ে বাড়ি চলে আসেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিভিন্ন এলাকার মতো ভালুকায়ও প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ওই প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়েন আফসার উদ্দিন। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তিনি প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেন।

১৭ এপ্রিল মাত্র সাতজন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে মল্লিকবাড়ী গ্রামে আফসার উদ্দিন একটি ‘ব্যাটালিয়ন’ গঠন করেন, যা পরে আফসার বাহিনী নামে খ্যাতি লাভ করে। তাঁরা হলেন মো. আমজাদ হোসেন, আবদুল খালেক মিঞা, নারায়ণ চন্দ্র পাল, আ. বারেক মিঞা, আবদুল মান্নান, অনিল চন্দ্র সাংমা ও মো. ছমর উদ্দিন মিয়া। এঁদের মধ্যে আবদুল মান্নান ভাওয়ালিয়াবাজু যুদ্ধে এবং অনিল চন্দ্র সাংমা ডুমনিঘাট যুদ্ধে শহীদ হন।

শুরুর দিকে ভালুকা থানার রাজৈ গ্রামের আওয়ামী লীগের কর্মী মো. আবদুল হামিদ মিঞার কাছ থেকে একটি রাইফেল ও ৩১ রাউন্ড গুলি সংগ্রহ করেছিলেন আফসার উদ্দিন। বাহিনী গঠনে সাহায্য করেছিলেন মাওলানা আলী ফকির, ডা. হাফিজ উদ্দিন, মো. আবদুর রাজ্জাক মিয়া, আবদুল হাফিজ, মো. মোছলেম মিঞা ও বাবু প্রেমনাথ অধিকারী। একাত্তরের ২০ জুন চানপুর এলাকার ইপিআর সদস্যদের ফেলে যাওয়া সাতটি রাইফেল দখলে এলে আফসার বাহিনীর মনোবল আরো বেড়ে যায়।

আফসার উদ্দিন আহমেদের ভাষায়, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রশিক্ষণ শিবির গঠন করেছি এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর ইপিআর-আনসার-মোজাহিদদের ভেতর থেকে বাঙালিদের অনেকেই অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসে আমার সংগঠিত বাহিনীতে যোগ দিতে থাকেন। কয়েক দিনের মধ্যেই ৫০০ মুক্তিযোদ্ধার এক বাহিনী গড়ে তুললাম। ধীরে ধীরে দেশের ভেতরই অবস্থান নিয়ে বন্ধু দেশ ভারতের কোনো সাহায্য ছাড়াই চার হাজার ৫০০ অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধার এক বিরাট বাহিনী গড়ে তুলি। ’

আফসার বাহিনীতে স্থানীয় জনতা ও ছাত্ররাই সংখ্যায় বেশি ছিলেন। তবে কিছু আনসার, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর লোকও ছিলেন। ওই বাহিনী পরিচালিত হয় সেনাবাহিনীর কায়দায়। তাঁর বাহিনী ছিল ২৫টি কম্পানির সমন্বয়ে। প্রতিটি কম্পানিতে ছিল তিনটি প্লাটুন ও তিনটি সেকশন। আর প্রতি সেকশনে ছিলেন ১৫ জন করে মুক্তিযোদ্ধা।

আফসার ‘ব্যাটালিয়নে’র অধিনায়ক ছিলেন মেজর আফসার উদ্দিন আহমেদ। সহকারী অধিনায়ক ছিলেন পাঁচজন। তাঁদের মধ্যে দুজন শহীদ হয়েছেন। এ ছাড়া অ্যাডজুট্যান্ট, সিকিউরিটি অফিসার, সহ-সিকিউরিটি অফিসার, কোয়ার্টার মাস্টার, অফিস ইনচার্জ প্রভৃতি দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ১০ সদস্যবিশিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদ, বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ ছিল। জুন মাসের মাঝামাঝি নাগাদ ভালুকা সদর ও মল্লিকবাড়ী বাজারে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল এ বাহিনীর। দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালু ছিল রাজৈ ইউনিয়নের খুর্দ্দ গ্রামে।

আফসার বাহিনী ১৫০টি যুদ্ধে অংশ নেয়। ব্যক্তিগতভাবে আফসার ৭৫টি যুদ্ধে অংশ নেন বলে জানা যায়। ২১ মে ভালুকা থানা আক্রমণ করে ১৬টি রাইফেল, ৩০টি বেয়নেট ও এক হাজার ৬০০ রাউন্ড গুলি হস্তগত করে আফসার বাহিনী। ২৫ জুন ভাওয়ালিয়াবাজু সম্মুখযুদ্ধে ৯৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে খতম করে এ বাহিনী। এ যুদ্ধ সম্পর্কে জানা যায়, ১৫ শতাধিক পাকিস্তানি সেনার একটি দল তিন ভাগ হয়ে ভালুকা থানায় ঘাঁটি করার জন্য গফরগাঁও থেকে রওনা দেয়। তাদেরই একটি দলকে আফসার উদ্দিন ৪১ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে সকাল ৮টার দিকে ভাওয়ালিয়াবাজু বাজারের ঘাটে প্রতিরোধ করেন। মুক্তিসেনারা মাত্র দুটি এলএমজি ও ৩৭টি রাইফেল দিয়ে যুদ্ধ শুরু করেন। অবিরাম ৪৮ ঘণ্টা যুদ্ধ চলে। পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তা করতে যুদ্ধ চলাকালে সেখানে হেলিকপ্টার থেকেও সেনা নামানো হয়। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা আ. মান্নান শহীদ হন। ২৮ জুন ভালুকা থানায় গ্রেনেড হামলা করে ১৭ হানাদারকে খতম করে এ বাহিনী। ১৯ জুলাই সিডস্টোর যুদ্ধে ২৩ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। এ ছাড়া ডাকাতিয়া-আংগারগাড়া বাজার যুদ্ধ, ভায়াবহ ঘাটের যুদ্ধ, ভরাডোবা যুদ্ধ, ধামশুর গ্রামের যুদ্ধ, বাকশী নদীর ব্রিজের পাড় যুদ্ধ, বরাইদ যুদ্ধ, বান্দিয়া যুদ্ধ, তালার যুদ্ধ, চানপুর যুদ্ধসহ অনেক যুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের খতম করে এ বাহিনী। ৬ ডিসেম্বর ভালুকা সদরে সেনা ক্যাম্প আক্রমণ করে ২০ জন পাকিস্তানি সেনা ও অনেক রাজাকারকে খতম করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর পাড়াগাঁও জঙ্গলে যুদ্ধে আফসার উদ্দিনের তৃতীয় ছেলে নাজিম উদ্দিন আহত হলে তাঁকে শেষ পর্যন্ত কলকাতা নিয়ে গিয়েও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

ভালুকা ছাড়াও গফরগাঁও এবং ত্রিশালের একাধিক স্থানে যুদ্ধ করে আফসার বাহিনী। ১৭ জুলাই গফরগাঁওয়ে দেউলপাড়া টহল ট্রেন আক্রমণ করে আফসার বাহিনী। এ ছাড়া মশাখালী রেলওয়ে ফরচঙ্গী পুলের পাড় যুদ্ধ, শীলা নদী আক্রমণ, প্রসাদপুর যুদ্ধে অংশ নেয় এ বাহিনী। গফরগাঁও পাকিস্তানি বাহিনীর ঘাঁটিতে ৯ ডিসেম্বর আক্রমণ করে তা দখলে নিয়ে নেয় আফসার বাহিনী। ত্রিশালের কানিহারী গ্রাম, সাকুয়া গ্রাম, ধানীখলা কাঁঠাল, কালীবাজার গ্রামেও আগস্ট মাসে অপারেশন চালায় আফসার বাহিনী। ১৩ সেপ্টেম্বর রায়ের গ্রামে সাত ঘণ্টা স্থায়ী ভয়াবহ সম্মুখযুদ্ধে ১৬ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। খতম হয় পাঁচ রাজাকার। তবে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধাও এতে শহীদ হন। ২৬ অক্টোবর কাশিগঞ্জ-আমিরাবাড়ী যুদ্ধে ৬৫ জন রাজাকারকে খতম করা হয়। আটক করা হয় ১৭ জনকে। ১০ ডিসেম্বর ত্রিশাল সেনা ক্যাম্প আক্রমণ করে তা দখল করা হয়। উদ্ধার হয় প্রচুর অস্ত্র।

আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতালও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আফসার। এ হাসপাতালে যুক্ত ছিলেন ১৩ জন চিকিৎসক ও তিনজন নার্স। মানুষের চেতনা শাণিত করে রাখার জন্য যুদ্ধকালে ‘জাগ্রত বাংলা’ নামের সাইক্লোস্টাইল করে একটি পত্রিকা বের করতেন আফসার।

মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতা, কর্মদক্ষতা ও সাফল্যের জন্য আফসার উদ্দিনকে মেজর পদে অধিষ্ঠিত করেছিলেন মিত্রবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সানসিং বাবজি। আফসার বাহিনীকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে মেজর আফসার বাহিনী হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

আফসার বাহিনীর উপদেষ্টা পরিষদের অফিস ইন চার্জ হাফিজুর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধে আফসার বাহিনীর ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি জানান, যুদ্ধ শেষে তাঁদের ২৫টি কম্পানি ময়মনসিংহ শহরের তৎকালীন রাবেয়া মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুলে (বর্তমান গালর্স ক্যাডেট কলেজ) জমায়েত হয়। বাহাত্তরের ফেব্রুয়ারি মাসে সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছে আফসার বাহিনী প্রায় চার হাজার অস্ত্র সমর্পণ করে। হাফিজুর আরো জানান, যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য খেতাব প্রদানের জন্য ৪০ জনের তালিকা দেওয়া হয়েছিল সরকারের কাছে। কিন্তু আমলে নেওয়া হয়নি। তবে যে তিনটি বাহিনীকে সরকার ও মিত্রবাহিনী স্বীকৃতি দিয়েছিল তার মধ্যে কাদেরিয়া বাহিনী ও হেমায়েত বাহিনীর পাশাপাশি মেজর আফসার বাহিনী ছিল।

আফসার উদ্দিনের জন্ম ১৯২৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। পৈতৃক নিবাস ছিল ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার চাউলাদি গ্রামে। নানাবাড়ি ছিল ভালুকা উপজেলার ধামশুর গ্রামে। ১৯৯৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।

আফসার উদ্দিনের ছেলে ভালুকার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান কাজিম উদ্দিন আহমেদ ধনু বলেন, তাঁদের পরিবারে ১৮ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর এক ভাই শহীদ হন। মুক্তিযোদ্ধা আরো তিন ভাই জীবিত আছেন। তাঁরা হলেন কম্পানি কমান্ডার গাজী খলিলুর রহমান, প্লাটুন কমান্ডার গাজী খোরশেদ আলম ও শওকত আলী।

ভালুকা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রউফ বলেন, ‘আফসার উদ্দিন আমাদের দেশের গৌরব। একজন স্বনামধন্য মুক্তিযোদ্ধার পাশাপাশি তিনি মানুষ হিসেবেও এলাকায় ছিলেন ব্যাপক জনপ্রিয়। ’


মন্তব্য