kalerkantho


আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী

বঙ্গবন্ধু হত্যাশক্তিধরদের ষড়যন্ত্রেই

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বঙ্গবন্ধু হত্যাশক্তিধরদের ষড়যন্ত্রেই

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানকে সমর্থনকারী প্রভাবশালী শক্তির ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জীবন দিতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, তখনকার দিনে বিশ্বে দুটি ভাগ ছিল।

যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করেনি, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সমর্থন করেছিল, তাদেরও তো ষড়যন্ত্র ছিল। কিন্তু তাদের কথা কেউ শুনল না। দেশ স্বাধীন হয়ে গেল। পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধে পরাজয় বরণ করল। বিশ্বে অনেক শক্তিধর শক্তি সঙ্গে থেকেও তাদের জেতাতে পারল না। এই পরাজয় অনেকে সহজভাবে মেনে নেয়নি। তাই তাদের ষড়যন্ত্র চলছিল। আর সেই ষড়যন্ত্রের শিকার হলেন জাতির পিতা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার বিকেলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত আলোচনা সভায় শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এ সভার আয়োজন করে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মানুষের কাছে হাত পেতে চলতে চাই না। আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াব। মাথা উঁচু করে চলব। তাই আমাদের ওপর যখন অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, সেই অপবাদ আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। একটা কথা সব সময় মনে রাখবেন—সততাই শক্তি। সততা থাকলেই জোর গলায় কথা বলা যায়। যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যায়। যে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মধ্যে আমরা পড়তে গিয়েছিলাম, এই সততা ছিল বলেই তা মোকাবিলা করতে পেরেছি। আজ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল একটা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারছি শুধু এই একটা কারণে। বাঙালি জাতি হিসেবে এটা আমাদের গর্ব, আমাদের চ্যালেঞ্জ ছিল। ষড়যন্ত্র যে থেমে গেছে তা কিন্তু না। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই দেশ জাতির পিতা আমাদের দিয়ে গেছেন। তাঁর জীবনে সব থেকে বেশি ত্যাগ করেছেন এই দেশের জন্য। জীবনে আরাম-আয়েশ, সুখ সবকিছু তিনি বিসর্জন দিয়ে মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন। আর যখনই তিনি অধিকারের কথা বলেছেন তখনই তাঁর ওপর নির্যাতন হয়েছে, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁকে বন্দি করেছে। তিনি একটি লক্ষ্য স্থির করে সারাটা জীবন যে ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, সেই ত্যাগ স্বীকারের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। তাঁর স্বপ্ন ছিল দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবেন। আর সেই হাসি ফোটানোর দায়িত্ব আজ আমাদের ওপর। ’

বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর দেশ পরিচালনার প্রশংসা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্য নিয়েই তিনি কাজ করে গেছেন। আমাদের স্থল সীমানা আইন ও চুক্তি, সমুদ্র সীমানা আইন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—প্রতিটি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু অবদান রেখে গেছেন। স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছরে একটা মানুষ, একটা সরকার এত কাজ কিভাবে করতে পারে তা ভাবলেও অবাক লাগে। ’

বঙ্গবন্ধুর পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যিনি আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন তাঁর আদর্শ বুকে নিয়েই এ দেশকে আমাদের গড়ে তুলতে হবে। আজ আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। আমরা উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন করছি বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা থাকা অবস্থায়ও। আমরা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে এনেছি। যে চৈত্র মাসে হাহাকার থাকত এক সময়, আজ সেই হাহাকার নেই, মঙ্গাও নেই। ’

বিকেল সোয়া ৩টায় প্রধানমন্ত্রী আলোচনা সভায় উপস্থিত হন। আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার বক্তব্য শেষে তিনি বিকেল ৫টায় প্রধান অতিথির বক্তব্য শুরু করেন। ৩৭ মিনিটের ভাষণে তিনি বিভিন্ন সময় বঙ্গবন্ধুর দেওয়া বক্তব্য থেকে উদ্ধৃত করে শোনান। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, অর্জন এবং বিএনপির সময় নানা অপকর্মের কথাও তুলে ধরেন।

দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা কেউ যেন ব্যাহত করতে না পারে। আমরা রূপকল্প দিয়েছি, ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করব। ইতিমধ্যে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি অর্জন করেছি। অবশ্যই আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হব এবং তা ২০২১ সালের আগেই। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ বিশ্বে মর্যাদা নিয়ে চলছে, মর্যাদা নিয়ে চলবে, মাথা উঁচু করে চলবে। আমরা সেভাবেই এ দেশকে গড়ে তুলব। এ দেশকে বিশ্বের বুকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে আমরা জাতির পিতার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করব। জাতির পিতার জন্মদিনে এটাই আমাদের অঙ্গীকার। ’

১৯৭৫ সালে নিজের পরিবারের সদস্যদের নির্মম হত্যার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে আমরা দেখেছি এ দেশে হত্যা-ক্যুর রাজনীতি শুরু হলো। মুক্তিযোদ্ধা, বহু সামরিক অফিসার, সৈনিককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে ঠিক যেন ওই পাকিস্তানেরই একটা ডুপ্লিকেট সরকার। তারা একদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের যেমন হত্যা করেছে, অন্যদিকে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের। তাদের হাতেই জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছে। ’

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেই রাজাকারের দল—এক দিনে যারা প্রায় দুই শ মানুষকে হত্যা করেছে সেও জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছে। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে শুধু সংবিধান লঙ্ঘন নয়, ওই আর্মি অ্যাক্ট, আর্মি রুলসও সে লঙ্ঘন করেছিল এবং তার আমলে প্রায় ১৮টা ক্যু হয় বাংলাদেশে, যাতে অনেক নিরপরাধ সৈনিককে ফাঁসি দিয়ে অথবা ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর নামও সে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। ’

খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেই খুনি রশীদ আর হুদা, তাদের ১৫ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া যে ভোটারবিহীন নির্বাচন করেছিল, সেই নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে পার্লামেন্টে বিরোধী দলের নেতার চেয়ারে বসিয়েছিল। খুনিদের পুরস্কৃত করা, যুদ্ধাপরাধীদের পুরস্কৃত করা, তাদের হাতে পতাকা তুলে দেওয়া, তাদের পুনর্বাসিত করা এটাই ছিল যেন তাদের চরিত্র। ’

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া প্রমুখ। সভা পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ ও উপপ্রচার সম্পাদক অসীম কুমার উকিল।

আলোচনায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পেছনে কারা যুক্ত ছিলেন তা বের করতে একটি কমিশন গঠনের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু এর পেছনে কারা ছিলেন তা বের করতে একটি কমিশন গঠন করতে বলব। ড. আনিসুজ্জামান বা নেত্রীর (শেখ হাসিনা) কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে একটি কমিশন গঠন করতে বলব। যাতে ভবিষ্যতে এটি মানুষ ইতিহাস হিসেবে পড়তে পারে এবং পেছনে কারা ছিল তাদের চিহ্নিত করতে পারে। ’


মন্তব্য