kalerkantho

শুক্রবার । ২০ জানুয়ারি ২০১৭ । ৭ মাঘ ১৪২৩। ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি

১০ বিশেষ কর্মকর্তা নজরদারিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



১০ বিশেষ কর্মকর্তা নজরদারিতে

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার ১০ কর্মকর্তার। রিজার্ভ স্থানান্তরসহ সুইফট শাখার সাইবার লাইনে তাঁরা কাজ করতে পারেন। গোপন পাসওয়ার্ডসহ নির্দিষ্ট নিরাপত্তার বিষয়গুলোও তাঁদের জানা। এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে তথ্য দিয়ে হ্যাকিংয়ে সহায়তা করা হয়েছে বলেও আলামত পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই ১০ কর্মকর্তাকে কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রিজার্ভ সংরক্ষণকাজে জড়িত আরো কয়েকজন কর্মকর্তার গতিবিধিতেও লক্ষ রাখা হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে এসব তথ্য জানান। তাঁরা বলছেন, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায় সেখানকার পুলিশের সহায়তায় একইভাবে তদন্তকাজ শুরু হতে যাচ্ছে। এ জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে বার্তা পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কারো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সেই সূত্রেই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের কাছেও তদন্তে সহায়তা চাওয়া হবে। আগামীকাল রবিবার এফবিআইয়ের বাংলাদেশ প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করবে সিআইডির তদন্তকারী দল।

ওদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে আট কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকের মাকাতি সিটির জুপিটার স্ট্রিট শাখার ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোসহ পাঁচজনকে তলব করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। গতকাল মুদ্রাপাচারের ঘটনা তদন্তে থাকা দেশটির অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) মামলায় ওই পাঁচজনের বিরুদ্ধে এ সমন জারি করা হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, তাঁদের আগামী ১২ ও ১৯ এপ্রিল প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে নির্ধারিত দিনে শুনানিতে হাজির হয়ে লিখিত জবানবন্দি ও তার সমর্থনে প্রমাণাদি জমা দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে তদন্ত : গতকাল ছুটির দিনও বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে তল্লাশি করেছে সিআইডির ফরেনসিক দল। সিআইডির তদন্ত তদারকি দলের প্রধান উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি-এইচআরএম) সাইফুল আলম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ইন্টারপোল ও এফবিআইয়ের সহায়তা চাইছি। রবিবার এখানকার এফবিআই প্রতিনিধির সঙ্গে বসে আলাপ করব। ইন্টারপোলের মাধ্যমে বার্তা দেওয়া হয়েছে। শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে লেনদেনের বিষয়গুলো একত্র করে আন্তর্দেশীয় তদন্ত শুরু করতে যাচ্ছি। ’

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তার আঙুলের ছাপ রয়েছে রিজার্ভ ব্যাংকে। ’ এ বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি না জানতে চাইলে সাইফুল আলম বলেন, ‘এ ব্যাপারে এখনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে রিজার্ভ ব্যাংকে ১০ জন কর্মকর্তার অ্যাকসেস আছে। আমরা এ বিষয়ে তদন্ত করছি। ফরেন এক্সচেঞ্জ, সিকিউরিটি সার্ভেইল্যান্স ইকুইপমেন্ট, পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্ট (পিএসডি) এবং অডিট বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। ’

ইতিমধ্যে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিলিং রুমের সিসি ক্যামেরাগুলো সঠিক জায়গায় বসানো হয়নি, সার্ভার ও কম্পিউটার থেকে তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে এবং ঘটনার আগে থেকে ফরেক্স রিজার্ভ ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের ডিলিং রুমের দুটি সিসি ক্যামেরা বিকল ছিল। রিজার্ভ থেকে ডলার চুরির সময় ব্যাংকের ডিলিং রুম বন্ধ ছিল। এতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে যে বার্তা এসেছিল, তা পরীক্ষা করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। সূত্র জানায়, এসব প্রক্রিয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা জোরদার না থাকার কারণে হয়েছে, নাকি পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ডিলিং রুম ও সুইফট কোড ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের কল রেকর্ডসহ ব্যক্তিগত যোগাযোগ খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তাঁদের স্বজনদের যোগাযোগও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মির্জা আবদুল্লাহ হেল বাকি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ লুটের ঘটনা একটি ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম। এ ঘটনায় বাংলাদেশসহ আরো তিনটি দেশের অপরাধীরা জড়িত। অন্য তিনটি দেশেও তদন্ত শুরু হবে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী যে ছয়জনের আঙুলের ছাপের কথা বলেছেন সেটা আমাদের এখনো জানা নেই। তবে রিজার্ভ লেনদেন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যাঁরা জড়িত তাঁদের তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। ’

ফিলিপাইনে সমন : দেগুইতোর সঙ্গে অভিযুক্ত অন্য চারজন হলেন—মাইকেল ফ্রান্সিসকো ক্রুজ, জেসি ক্রিস্টোফার লাগ্রোসাস, আলফ্রেড সান্তোস ভারজারা এবং এনরিকো তিয়োডোরো ভাসকুয়েজ। এর মধ্যে ক্রুস, লাগ্রোসাস, ভারজারা ও ভাসকুয়েজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সন্দেহজনক ওই অর্থ স্থানান্তরের প্রমাণ মিলেছে জানিয়ে এএমএলসি কর্তৃপক্ষ বলেছে, ওই চার অ্যাকাউন্ট খোলা ও লেনদেনে দেগুইতোর সরাসরি হাত ছিল।

মুদ্রাপাচারের অভিযোগের প্রাথমিক তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া দেশটির সহকারী প্রসিকিউটর গিলমারি ফে পাকমার অভিযুক্ত পাঁচজনের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের এই সুযোগ হাতছাড়া করলে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য জমা দিয়ে দেওয়া হবে।

এই মামলার বাদী এএমএলসি কর্তৃপক্ষকেও নির্ধারিত দিনে শুনানিতে হাজির থাকতে সমন জারি করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবারের সিনেট কমিটির শুনানিতে আরসিবিসির শাখা ব্যবস্থাপক দেগুইতো ব্যাংকটির দুই জ্যেষ্ঠ ব্যাংক কর্মকর্তার নাম ধরে বলেছেন, তাঁরাও ওই অর্থ লোপাটের ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন। সিনেটের ব্লু রিবন কমিটির চেয়ারম্যান তেওফিস্তো গুংগোনা এ তথ্য জানিয়েছেন বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে।

এ ছাড়া নিজের গাড়িতে করে দুই কোটি পেসো সরানোর ঘটনা প্রকাশ না করতে এক সহকর্মীকে পাঁচ মিলিয়ন পেসো ঘুষ সেধেছিলেন রিজাল ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক দেগুইতো। ওই শাখার কাস্টমার সার্ভিস বিভাগের প্রধান রোমাল্ডো অর্গাডো বৃহস্পতিবার সিনেট শুনানিতে এ দাবি করেন। তিনি বলেন, গত ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি কাগজের ব্যাগে ভরে দুই কোটি পেসো দেগুইতোর গাড়িতে তুলতে দেখেছেন। তখন বলা হয়েছিল, এই অর্থ চীনের ব্যবসায়ী উইলিয়াম গোর রেমিট্যান্সের। পরে ১২ ফেব্রুয়ারি অন্য এক সহকর্মীর ফোর্বস পার্ক এলাকার বাসায় তাঁকে এ ঘটনা প্রকাশ না করতে এই অর্থ ঘুষ সেধেছিলেন দেগুইতো।


মন্তব্য