kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ । ৪ মাঘ ১৪২৩। ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বাগেরহাটের রফিক বাহিনী

আজিজুল পারভেজ   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাগেরহাটের রফিক বাহিনী

মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ববাংলা সমন্বয় কমিটি’র অনুসারীদের উদ্যোগে বাগেরহাটের চিরুলিয়া-বিষ্ণুপুর অঞ্চলে এক দুর্ভেদ্য গেরিলা বাহিনী গড়ে উঠেছিল। যুদ্ধের পুরো সময় ১৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা শত্রুমুক্ত রাখতে সক্ষম হয় এই বাহিনী। তখনকার পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও সমন্বয় কমিটির আঞ্চলিক প্রধান রফিকুল ইসলাম খোকন ছিলেন এই স্বতন্ত্র বাহিনীর প্রধান। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে তিনি পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে হারিয়েছিলেন ডান পা। মুক্তিযুদ্ধে বীরোচিত ভূমিকার কারণে উত্তরকালে বাগেরহাটে তিনি পরিণত হয়েছিলেন জীবন্ত কিংবদন্তিতে।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুসারে ১৯৭১ সালের ৯ মার্চ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাগেরহাট মহকুমা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটির তত্ত্বাবধানে মহকুমার বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠতে থাকে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। সংগ্রাম কমিটি নিয়ন্ত্রিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের সমান্তরালে এপ্রিলের শেষের দিকে একটি ক্যাম্প গড়ে ওঠে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ভাসানী গ্রুপ ও ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের অনুসারীদের উদ্যোগে। এই ক্যাম্পের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন বাগেরহাটের ভাসানী ন্যাপের অন্যতম প্রাণপুরুষ শেখ আজমল আলী গোরাই। পরিচালনায় ছিলেন রফিকুল ইসলাম। রফিকুল ইসলামের নামেই পরে এই বাহিনী খ্যাতি লাভ করে।

বাগেরহাটের সাংবাদিক শাহাদত হোসেন বাচ্চু মুক্তিযুদ্ধে রফিক বাহিনীর তত্পরতা সম্পর্কে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। তিনি বলেন, পিকিংপন্থী কমিউনিস্টদের ‘দুই কুকুরের কামড়া-কামড়ি’ তত্ত্ব এড়িয়ে রফিক বাহিনী পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে যায়নি তারা। স্থানীয়ভাবে অথবা যুদ্ধ করে তাদের অস্ত্র, গুলি জোগাড় করতে হয়েছিল। এই বাহিনী একাত্তরের ৯ মাসই ভৈরব-দড়াটানার উত্তরে বিস্তীর্ণ এলাকা মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়।

জানা যায়, বাগেরহাট শহরের বুক চিরে প্রবাহিত ভৈরব-দড়াটানা নদীর উত্তরতীরে বিষ্ণুপুরের খালিশপুর গ্রামে ছিল রফিক বাহিনীর সদর দপ্তর। অন্য দুটি ঘাঁটি ছিল সন্তোষপুর প্রাইমারি স্কুল ও চিতলমারী ইউনিয়নের সুড়িগাতী গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধকালে কোনো অঞ্চলের অধিকার হারায়নি এই বাহিনী। বরং অধিকৃত অঞ্চলের পরিধি বাড়িয়েছে। বাগেরহাটের মুনিগঞ্জ খেয়াঘাট থেকে চিতলমারী পর্যন্ত এক বিরাট এলাকা মুক্তাঞ্চল হিসেবে গড়ে ওঠে। এর মধ্যে ছিল গোটাপাড়া, বিষ্ণুপুর, চিতলমারী, ধোপাকালী, বেমজা, সন্তোষপুর, চরবানিয়া প্রভৃতি অঞ্চল।

রফিক বাহিনীর প্রধান কমান্ডার ছিলেন রফিকুল ইসলাম। সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন শেখ আনিছুর রহমান। প্রথমদিকে এ বাহিনীর সদস্য ছিলেন মূলত বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছাত্র ও যুবকর্মীরা। পরে দল-মত-নির্বিশেষে তরুণরা এই বাহিনীতে যোগ দেন। বিমানবাহিনীর সাবেক সদস্য ও আগরতলা যড়যন্ত্র মামলার আসামি ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলামও রফিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে আসেন এবং ৯ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

‘মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতা যুদ্ধ বাগেরহাট জেলা’ গ্রন্থে ড. শেখ গাউস মিয়া লিখেছেন, ‘রফিক ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করেননি কখনো। এটা তাঁর পছন্দ ছিল না। তাঁর বিশ্বাস ছিল যে এলাকার জনগণের মধ্যে থেকে তিনি ঠিকমত মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যেতে সমর্থ হবেন। ...ওই সময় চীনপন্থীদের ভারতে গিয়ে ট্রেনিং গ্রহণ খুব একটা সহজ ব্যাপার ছিল না। ’

বাহিনী গঠনের শুরুতে ছাত্র ইউনিয়নকর্মী আসাদের সরবরাহ করা একটি রিভলবারই ছিল সম্বল। এরপর পিরোজপুরের ফজলুল হক খোকনের নেতৃত্বে বামপন্থী ছাত্র-যুবকরা ২৬ মার্চ সেখানকার অস্ত্রাগার লুট করে যে অস্ত্র সংগ্রহ করেছিল তার মধ্য থেকে ১৯টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল পায় রফিক বাহিনী। ২৭ এপ্রিল বাগেরহাট শহরে টহলরত একটি পুলিশ দলকে আক্রমণ করে পাঁচটি এবং এক আনসার সদস্যের কাছ থেকে একটি রাইফেল ছিনিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে বাহিনীর অস্ত্রবল বাড়তে থাকে। বিভিন্ন থানা আক্রমণ, রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ ও শত্রুসৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাদের অস্ত্র, গোলা-বারুদ ছিনিয়ে নিয়েই রফিক বাহিনীর অস্ত্রাগার সমৃদ্ধ হয়। এ বাহিনীর সদস্যদের বিস্ফোরক তৈরি ও গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশল শিক্ষা দেওয়া হয় শুরু থেকেই। অস্ত্রের ঘাটতি দূর করার জন্য বাহিনীর সদস্যরা এক ধরনের পাইপ বোমাও তৈরি করতেন।

রফিক বাহিনীর হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া কথাশিল্পী সুশান্ত মজুমদার জানান, রফিক বাহিনী একটি স্বতন্ত্র বাহিনী হলেও এই বাহিনী ওই অঞ্চলের অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবেও যুদ্ধ করে। ছাত্রলীগ নেতা কামরুজ্জামান টুকুর নেতৃত্বে মুজিব বাহিনী, নকশালপন্থী নেতা মানস ঘোষের বাহিনী (এই বাহিনী পরে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হয়ে উঠেছিল) ও ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই যুদ্ধ করেছে রফিক বাহিনী। বিপুলসংখ্যক কৃষক রফিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন।

রফিক বাহিনী ছোট-বড় কমপক্ষে ২০টি যুদ্ধে অংশ নেয় বলে জানা যায়। তারা পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে প্রথম সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয় বাগেরহাট সদর থানা আক্রমণের মাধ্যমে। মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনপ্রিয় সৈয়দ অজিয়র রহমান পাকিস্তান বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় রফিক বাহিনী। ১ মে প্রথম প্রহরে রফিক বাহিনী ও কামরুজ্জামান টুকুর নেতৃত্বে মুজিব বাহিনী একযোগে থানায় আক্রমণ চালায়। কিন্তু অজিয়র রহমানকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়। এ আক্রমণে কয়েকজন পুলিশ নিহত ও আহত হয়। টুকু বাহিনীর দুজন মুক্তিযোদ্ধাও শহীদ হন। পরবর্তীকালে অজিয়র রহমানকে খুলনায় স্থানান্তর করে হত্যা করা হয় বলে অনেকের ধারণা।

বাগেরহাটের পাকিস্তান বাহিনীর প্রধান সহযোগী রজব আলীকে মারার লক্ষ্যে কয়েকটি অপারেশন চালায় রফিক বাহিনী। ধূর্ত এই রাজাকারকে শায়েস্তা করতে কয়েকটি অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর সুইসাইড স্কোয়াড গঠন করা হয়। ১০ জুলাই ওই স্কোয়াডের আক্রমণে পিঠে ও বুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রজব পালাতে সক্ষম হলেও তাঁর সঙ্গী প্রাণ হারান। যশোর ক্যান্টনমেন্টে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে রজব আলী সে যাত্রায় রক্ষা পেলেও স্বাধীনতার পর আত্মহত্যা করেন।

২৪ জুলাই রাজাকারদের বহনকারী রূপসা থেকে বাগেরহাটগামী একটি বিশেষ ট্রেনে রফিক বাহিনী, মানস ঘোষের বাহিনী ও অন্যরা সম্মিলিত আক্রমণ চালায়। এতে অনেক রাজাকার হতাহত হয় এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলা-বারুদ উদ্ধার করা হয়। এরপর রফিক বাহিনী বাগেরহাটের কচুয়া থানায় আক্রমণ চালিয়ে আটটি রাইফেল, দুটি স্টেনগান ও একটি রিভলবার সংগ্রহ করে। ৭ আগস্ট এই বাহিনীর গেরিলারা মাধবকাঠি মাদ্রাসায় হানাদার বাহিনীর অবস্থান ঘিরে আক্রমণ চালায়। এই যুদ্ধে তিনজন পাকিস্তানি সেনাসহ বেশ কয়েকজন রাজাকার নিহত হয়।

চিরুলিয়া-বিষ্ণুপুরের গেরিলা ঘাঁটিগুলি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য পাকিস্তান বাহিনী ৯ সেপ্টেম্বর বাগেরহাট সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের পানিঘাট এলাকায় জড়ো হলে সেখানে বড় ধরনের যুদ্ধ বাধে। এটি বিখ্যাত পানিঘাটের যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে ১৬ জন পাকিস্তানি সেনা ও বেশ কয়েকজন রাজাকার নিহত হয়। ১৩ সেপ্টেম্বর দেপাড়া ব্রিজের কাছে পুনরায় পাকিস্তান বাহিনীর মুখোমুখি হয় রাফিক বাহিনী। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্থায়ী এই যুদ্ধে রফিক বাহিনীর বিজয় পাল শহীদ হন। অন্যদিকে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার নিহত হয়। ৯ নভেম্বর আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ভৈরব নদ অতিক্রম করে তিন মাইল দূর থেকে মর্টারের গোলা ছুড়তে ছুড়তে এগোতে থাকে পাকিস্তান বাহিনী। বাবুরহাটে পৌঁছলে রফিক বাহিনীর গেরিলারা তিনদিক থেকে হানাদারদের ঘিরে ফেলে সাঁড়াশি আক্রমণ রচনা করে। এই যুদ্ধে পাঁচজন সেনাসহ কয়েকজন রাজাকার নিহত হয় এবং আলশামসের এক সদস্য ধরা পড়ে। এক সেনাকে ধাওয়া করে ইসমাইল হোসেন (মেজো) হাতাহাতি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে একটি মেশিনগান ছিনিয়ে নেন। পালাতে গিয়ে কয়েক সেনা গ্রামবাসীর পিটুনীতে নিহত হয়।

মুক্তিযুদ্ধকালে রফিক বাহিনীকে পাকিস্তান বাহিনীর মোকাবিলা করা ছাড়াও বামপন্থী উপদলের সঙ্গেও সশস্ত্র সংঘাতে জড়াতে হয়েছে। এ রকম একটি সংঘাতে ২৭ এপ্রিল রাতে নিজেদের কর্মী গোলাম মোস্তফা হিল্লোল মারা যান। ১৭ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত বাগেরহাটে রফিক বাহিনী পিসি কলেজে ক্যাম্প করে। সেখানে তারা ভারতীয় মিত্র বাহিনী ও মুজিব বাহিনীর সদস্যদের বিরোধিতার মুখে পড়ে। কয়েকজন গেরিলাকে মুজিব বাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে রেস্ট হাউসে বন্দি করে রাখে। এ ঘটনার পরে রফিকের নেতৃত্বে গেরিলারা পুনরায় বিষ্ণুপুরে ফিরে যায় এবং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মুজিব বাহিনীর ১০ জনকে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যায়।

১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি রাশেদ খান মেননের উপস্থিতিতে ‘টোকেন’ হিসেবে মহকুমা প্রশাসকের কাছে রফিক বাহিনীর গেরিলারা কিছু অস্ত্র জমা দেন। পরবর্তীকালে রক্ষীবাহিনী গড়ে উঠলে তাদের টার্গেটে পরিণত হন রফিকুল ইসলাম খোকন। এতে তাঁর জীবনযাপন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে রক্ষীবাহিনীর তত্পরতার মুখে পার্টির সিদ্ধান্তে বাগেরহাট টেনিস গ্রাউন্ডে সংরক্ষিত অস্ত্রের ভাণ্ডার আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও যশোরের তৎকালীন জিওসি ব্রিগেডিয়ার আবুল মঞ্জুর বীর উত্তমের উপস্থিতিতে জমা দেওয়া হয়।

রফিক বাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা চার শর মতো ছিল বলে জানান সুশান্ত মজুমদার।


মন্তব্য