kalerkantho


কলকাতা ভুলে গিয়ে নতুন শুরুর স্বপ্ন

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কলকাতা ভুলে গিয়ে নতুন শুরুর স্বপ্ন

আল-আমিন হোসেন হেসে ওঠেন। ওই হাসিতে ফিসফিসিয়ে ওঠে বিষণ্নতা।

পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে বাজে বোলিং করা এই পেসার নিজেকে সান্ত্বনা দেন এভাবে, ‘প্রথম বলটি ছক্কা হওয়ার পর ভাবলাম, ইডেনের প্রথম খেলা কোনো এক দিক দিয়ে তো স্মরণীয় হয়ে রইল। এখানে প্রথমবার বোলিংয়ে নামা কোন কোন বোলার প্রথম বলে ছক্কা খেয়েছে বলুন?’

বেঙ্গালুরুর বিমানবন্দরে একটু দূরে দাঁড়িয়ে তখন তাসকিন আহমেদ। ইডেনে খেলার স্বপ্নপূরণের খুশি খেলা করে তাঁর চোখে-মুখে। পরক্ষণেই হয়তো মনে পড়ে যায় পাকিস্তানের কাছে পরাজয়ের ফল। তাতে রং হারায় তাসকিনের আনন্দের রংধনু, ‘হ্যাঁ, ইডেনে খেলা তো যেকোনো ক্রিকেটারের স্বপ্ন। আমিও অনেক ছোটবেলা থেকে এই স্বপ্ন দেখেছি। কাল (পরশু) খেলতে পেরে তাই ভালো লেগেছে খুব। কিন্তু ম্যাচের কথা ভাবলে মন খারাপ হয়ে যায়। এমনভাবে হেরে গেলে স্বর্ণের মাঠে খেললেও আর ভালো লাগে না।

জেট এয়ারওয়েজের উড়ালের ভেতর সৌম্য সরকারের মন একটু ভালো হয় আগের দিনের ওই অবিশ্বাস্য ক্যাচের কথা মনে করিয়ে দিলে। জন্টি রোডসও তো এটি নিয়ে টুইট করেছেন—বলতেই মুখে খেলে যায় এক চিলতে হাসি, ‘শুনেছি তো। ’ ম্যাচের প্রসঙ্গে আবার হাসি যায় মিলিয়ে, ‘এমন ম্যাচের পর কেমন আর লাগে!’

পরশু ইডেন গার্ডেন্সে পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের সেই হোঁচট। এরপর রাতটুকুন কলকাতায় কাটিয়ে কাল সাতসকালে বেঙ্গালুরুর উড়ালে চেপে বসা। কলকাতার বিমানবন্দরেই দেখা মেলে ঘুম ঘুম চোখের বিষণ্ন সব ক্রিকেটারের। দুপুর নাগাদ দলেবলে চলে আসে বেঙ্গালুরুতে। এখানে ২১ মার্চ অস্ট্রেলিয়া ও ২৩ মার্চ ভারতের বিপক্ষে দ্বৈরথ। পাকিস্তানকে হারিয়ে ওই পরাশক্তিদের মুখোমুখি হওয়ার পরিকল্পনাই তো ছিল বাংলাদেশের! সেটি ভেস্তে যাওয়ায় মন খারাপ হওয়াটা তাই অস্বাভাবিক নয় মোটেও।

খেলা দেশের সীমান্তের ওপারের কলকাতায়, প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের বিপক্ষে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচে জয়—এসব মিলিয়ে ওই ম্যাচের আবহে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসের বেলুনটা উড়ছিল আকাশে। সেটি চুপসে যাওয়ার দশা পাকিস্তানের কাছে ৫৫ রানের হারে। ইডেন গার্ডেন্সের রোমান্টিসিজমও তাতে যেন হারিয়ে যায় ক্রিকেটারদের মন থেকে। কিন্তু মাশরাফি বিন মর্তুজা আবার এসবকে খুব একটা পাত্তা দেন না। ‘আরে ধুর, একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে হারলে কী হয়! পরের খেলাতেই দেখবেন আবার আমরা দারুণ খেলব’— যেন অন্যদের না, সতীর্থদেরই বলছেন তা। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলার আশা জিইয়ে রাখার পূর্বশর্ত যে এখন দলকে চনমনে রাখা! সে কাজের নেতৃত্ব সব সময়ই মাশরাফির। আর সতীর্থরা সাড়াও দিচ্ছেন তাতে। এই যেমন, জেট এয়ারওয়েজের উড়ালটি কলকাতা থেকে বেঙ্গালুরু বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করতেই একসঙ্গে হাততালি দিয়ে ওঠেন বেশ কজন বাংলাদেশি ক্রিকেটার। আড়াই ঘণ্টার আকাশযাত্রায় নিজেদের মধ্যে হাসি-ঠাট্টা-খুনসুটিও হয়েছে বেশ।

কিন্তু মুস্তাফিজুর রহমানের মুখে যেন হাসি নেই। নাছোড়বান্দা ইনজুরি যে পিছু ছাড়ছে না! এশিয়া কাপের চোট নিয়ে আসেন বিশ্বকাপে। বাছাই পর্বের তিন ম্যাচের কোনোটি খেলতে পারেননি। পারলেন না মূল পর্বে পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বৈরথ। ইনজুরিতে পড়া একজন বোলারকে ম্যাচের পর ম্যাচ কেন বয়ে বেড়ানো হচ্ছে, এমন প্রশ্ন পর্যন্ত তাই উঠে যায় পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে। অধিনায়ক মাশরাফি সেদিন ঢাল হয়ে দাঁড়ান এমন সিদ্ধান্তের, ‘মুস্তাফিজ এই মুহৃর্তে আমাদের সেরা বোলার। আমরা চাইছি, ও যখন সুস্থ হবে, তখনই খেলবে। আজ ও খেলার খুব কাছাকাছি গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেনি। আশা করছি সামনের ম্যাচ খেলবে মুস্তাফিজ। ’

মুস্তাফিজকে এভাবে বয়ে বেড়ানোয় দলের মধ্যে চাপা অস্বস্তি কিন্তু রয়েছে। অন্য কোনো ক্রিকেটার এমন ইনজুরিতে পড়লে এভাবে কি ম্যাচের পর ম্যাচ তাঁকে দলের সঙ্গে রাখা হবে? তিনি খেলবেন কি খেলবেন না—এ সিদ্ধান্ত নিতে নিতেই তো দলের পরিকল্পনায় ওলটপালট হয় কয়েক দফা। পূর্ণ ফিট হননি এখনো, তবু পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ জয় যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ—মুস্তাফিজকে খেলানোর পক্ষে ছিল তাই একাদশ নির্বাচকদের একটি অংশ। কিন্তু কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহের মত ভিন্ন। এক ম্যাচে খেলানোর ঝুঁকির চেয়ে ঝুঁকিহীনভাবে পরের তিন ম্যাচ খেলাতে বোলিংয়ের ব্রহ্মাস্ত্রকে চেয়েছেন তিনি। কিন্তু প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানের কাছে ওভাবে হেরে যাওয়ার ধকল সামলাতে পারবে বাংলাদেশ? সেটি যদি মুস্তাফিজ ফেরেন, তবু?

অধিনায়ক মাশরাফি বরাবরের মতো স্নেহের হাত রাখছেন মুস্তাফিজের ওপর। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই বাঁহাতি পেসার ঝলসে উঠবেন বলে বিশ্বাস তাঁর, ‘অস্ট্রেলিয়া তো আগে কখনো ওকে খেলেনি। এদিক দিয়ে মুস্তাফিজ সুবিধা পাবে। আর ও তো একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠছে। অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচেরও বাকি কয়েক দিন। আশা করি, ও সেদিন খেলবে। ’ আর পাকিস্তানের কাছে এক হারেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলার আশাও শেষ হয়ে যায়নি বলেও দাবি মাশরাফির, ‘আমাদের গ্রুপে যে কেউ যে কাউকে হারাতে পারে। পাকিস্তানকে হারিয়ে শুরুটা ভালো করতে পারলে তো ভালোই হতো। সেটি হয়নি। এখন আমরা অস্ট্রেলিয়া-ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দুটিকে টার্গেট করছি। বেঙ্গালুরুতে জিততে পারলে আবার আমরা সম্ভাবনার ভেতরে ঢুকে পড়ব। ’ বিমানবন্দরে পাশে দাঁড়ানো ম্যানেজার খালেদ মাহমুদও পাশ থেকে সায় দেন, ‘এই গ্রুপে দেখবেন অনেক কাটাকুটি খেলা হবে। ’

সেই কাটাকুটি খেলায় প্রতিপক্ষকে কাটতে ‘কাটার’ মুস্তাফিজুর রহমান তো ফিরছেনই! দেখা যাক, পাকিস্তানের বিপক্ষে এই পেসারকে খেলানোর ঝুঁকি না নেওয়ায় হাতুরাসিংহের বাজিটা কাজে লেগে যায় কিনা!


মন্তব্য