kalerkantho


ঘুরেফিরেই শঙ্কা আর উদ্বেগের কথা

নিখিল ভদ্র ও কৌশিক দে, খুলনা থেকে   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ঘুরেফিরেই শঙ্কা আর উদ্বেগের কথা

চৈত্রের তপ্ত দুপুর! পাশের মন্দিরে চলছে নামযজ্ঞ অনুষ্ঠান। ধর্মীয় ওই অনুষ্ঠান ঘিরে বাড়ি বাড়ি থেকে আসছে নারী-পুরুষ ও শিশুরা। পাশের চৌরাস্তা মোড়ে বেশ কিছু দোকানপাটের সঙ্গে নির্বাচনী ক্যাম্প। এই ঘিরে ছোট ছোট জটলা, চলছে নানা আলোচনা। এ আলোচনা আগামী ২২ মার্চ নির্বাচন নিয়ে। আলোচনায় উঠে আসছে প্রার্থীদের নানা কথা। সেসব কথায় বেরিয়ে এলো নানা ভয়-শঙ্কা আর উদ্বেগও। এ ভয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন নিয়ে। তাঁদের কথায় ওঠে এলো সাধারণ ভোটাররা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন কি না সেই শঙ্কাও ।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের রাজবন্দ মোড়ে এ প্রতিবেদকরা সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের কাছ থেকে এমন কথাই শুনলেন। খুলনা মহানগরের পার্শ্ববর্তী জনবহুল এই ইউনিয়নে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি মনোনীতসহ চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাত প্রার্থী। এর মধ্যে যেমন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন, তেমনি আছেন বিএনপিতেও। তাই উত্তেজনা একটু বেশি। এখনো কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে হুমকি-ধমকি অব্যাহত আছে। চলছে নানা অপপ্রচারও।

খুলনার নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ থানার ওসি রাশেদুল আলম ও রামপাল থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলামকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে নির্বাচন কমিশন গত বুধবার তাঁদের বদলির নির্দেশ দেয়। গতকাল বৃহস্পতিবার তা কার্যকর করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

একই ধরনের অভিযোগে খুলনার পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কবির উদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে আবুল আমিন নামের এক কর্মকর্তা গতকালই যোগদান করেছেন বলে জানান উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হজরত আলী। গত ১২ মার্চ ইউএনও কবির উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীদের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ এনে পাইকগাছা উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা তাঁকে অপসারণের দাবি জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে আবেদন জানান।

এ ছাড়া খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসককে সতর্ক করে গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ বিবেচনায় নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। গত ১৩ মার্চ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ এনে সিইসি বরাবর নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেন সাতক্ষীরার তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়ন পরিষদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী প্রণব ঘোষ বাবলু।

এদিকে সরেজমিনে আলাপকালে বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের অনেকেই নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আলাইপুর গ্রামের বাসিন্দা নিরাঞ্জন কুমার বিশ্বাস (৬৫) বলেন, ‘প্রার্থীরা প্রতিদিনই আসছেন, সবাইকে তো চিনি। যোগ্য যে তারেই ভোট দেব। এবার প্রার্থী অনেক, মার্কাও অনেক। ফলে গ্যাঞ্জাম-ফ্যাসাদের আশঙ্কা তো আছেই। ’

একই গ্রামের দেবব্রত বিশ্বাস বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তো কোনো সমস্যা নেই। তবে সবাই ভয় পাচ্ছে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়ে। তারা যদি কোনো পক্ষ নেয় তাহলেই সমস্যা। তখন আর ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন না।

প্রায় একই অভিমত জানান রাজবাঁধ গ্রামের ঘের ব্যবসায়ী সুনীল কুমার মণ্ডল। তিনি বলেন, জলমা ইউনিয়নে সমস্যা নেই। অনেক প্রার্থী, কেউ কারো চেয়ে কম নয়। সব ঠিকঠাক হবে কি না, এটাই এখন ভয়। ’ ওই গ্রামের মো. শাহীন গাজী বলেন, ‘ভোট এখন জমজমাট। সবকিছু ভালো হলেই আমরা বাঁচি। ’

রাজবন্দ মোড়ের ব্যবসায়ী নিখিল মণ্ডল বলেন, ‘নির্বাচন ভালোই কাটছে। উৎসব উৎসব ভাব। এখন পর্যন্ত সব কিছু ভালো আছে; এর পরও কিছু ভয়তো আছেই। ’

নির্বাচন কর্মকর্তারা জানান, ৪১ হাজার ৮৮৯ জন ভোটার অধ্যুষিত জলমা ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁরা হলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী অনুপ কুমার গোলদার, বিএনপির আশিকুজ্জামান সিকদার আশিক, জাতীয় পার্টির জাহাঙ্গীর হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের মো. হজরত আলী, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ভগবতী গোলদার, বিএনপির বিদ্রোহী বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আবদুল গফুর মোল্লা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুস সাত্তার আকন। তাঁদের পাশাপাশি সাধারণ ওয়ার্ড ও তিনটি সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডের ৫১ জন প্রার্থী প্রচার-প্রচারণায় সরগরম করে তুলেছেন পুরো নির্বাচনী এলাকা।

নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন খুলনা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্পর্শকাতর এলাকায় পুলিশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্য সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। তাই ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে তিনি জানান।

বাগেরহাটের মূলঘর ইউপির নির্বাচন স্থগিত : জেলা নির্বাচন অফিসার মো. রুহুল আমিন মল্লিকের বরাত দিয়ে বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, মূলঘর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে খান আক্তারুজ্জামান মন্টু মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও রিটার্নিং অফিসারের কাছে তা জমা দিতে পারেননি। তাঁর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে মর্মে আক্তারুজ্জামান লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।

নির্বাচন অফিসার মো. রুহুল আমিন মল্লিক আরো জানান, প্রাথমিক তদন্তে খান আক্তারুজ্জামান মন্টুর মনোনয়নপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার সত্যতা মিলেছে। এ ঘটনায় তিনি মূলঘর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন স্থগিতের জন্য কমিশনের কাছে সুপারিশ করলে নির্বাচন কমিশন ওই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন স্থগিত করে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের উপসচিব ফরহাদ আহম্মেদকে প্রধান করে এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটিও গঠন করে দেওয়া হয়।


মন্তব্য