kalerkantho


বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে টুঙ্গিপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী

তারা মানুষকে আর বিভ্রান্ত করতে পারছে না

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তারা মানুষকে আর বিভ্রান্ত করতে পারছে না

টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে গতকাল পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : বাসস

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে বলেই আজ বাংলাদেশ ধীরে ধীরে অভিশাপমুক্ত হয়ে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের (স্বাধীনতাবিরোধী) ষড়যন্ত্র চলছে; কিন্তু সেই ষড়যন্ত্র এখন মানুষকে আর বিভ্রান্ত করতে পারছে না।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৭তম জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শিশু সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

শিশু-কিশোরদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘শিশুদের জ্ঞান বিকশিত করতে হবে। মা-বাবা, শিক্ষক, গুরুজনদের কথা শুনে চলতে হবে। নিজেদের সোনার ছেলে হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষা একটি অমূল্য সম্পদ, যে সম্পদ কেউ কখনো হাইজ্যাক বা লুট করতে পারে না। কাজেই তোমরা পড়াশোনা করো। খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং পড়াশোনা এসব দিকে তোমাদের আরো আত্মনিবেদন করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের জন্য সুনাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারো। আজকের শিশুই একদিন মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলবে। ’

এ অনুষ্ঠানের আগে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

পরে ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ মোনাজাত করে জাতির জনকসহ ১৫ আগস্টে নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দলের পক্ষে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। এ সময় তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। এরপর রাষ্ট্রপতিকে বিদায় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী যোগ দেন শিশু দিবসের আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির জনক বাঙালির স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। এই স্বাধীনতা একদিনে আসেনি। বছরের পর বছর তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। বাঙালি জাতিকে ধাপে ধাপে সংগঠিত করতে হয়েছে। যে স্বাধীনতা না হলে আমরা বিশ্বে বাঙালি জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পেতাম না, এই ভূখণ্ড পেতাম না, সেই স্বাধীনতার জন্য তিনি অদম্য সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়েছেন। জেল, জুলুম, অত্যাচার সহ্য করে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। ’

দাদির কাছে শোনা বাবার কথা স্মরণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার বাবা স্কুলে পড়ার সময়ই দুস্থ ছেলেমেয়েদের বই, খাতা, ব্যাগ দিয়ে দিতেন। তাতে আমার দাদা কখনো রাগ করেননি। বাজার থেকে আমার দাদা বারবার বই, ছাতা, ব্যাগ কিনে দিতেন। ’ একবার দেশে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, সে সময় বঙ্গবন্ধু নিজেদের গোলার ধান অভাবী মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ডেভিড ফ্রস্ট নামে বিদেশি এক সাংবাদিক স্বাধীনতার পর আমার বাবাকে প্রশ্ন করেছিল, আপনার সবচেয়ে বড় গুণ কী? বাবা বলেছিলেন, দেশের মানুষকে ভালোবাসা। ওই সাংবাদিক আবার বাবাকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনার দোষটা কী? বাবা বলেছিলেন, এ দেশের মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় দোষ। ’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিহত হন জাতির জনক। সে কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা এ দেশের স্বাধীনতা চায়নি, যাদের যুদ্ধ করে পরাজিত করেছি, তারাই আবার পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। আমার দুর্ভাগ্য যে আমি আর আমার ছোট বোন রেহানা বিদেশে ছিলাম। তখন আমাদের দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি। ছয় বছর আমাদের প্রবাসে কাটাতে হয়েছে। ’ তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বাংলাদেশকে স্বাধীনতার চেতনা থেকে ‘সম্পূর্ণ ভিন্ন’ দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। স্বাধীনতার পরও সেই ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টার কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘২১ বছর এ দেশের মানুষ বঞ্চিত ছিল বিজয়ের ইতিহাস জানা থেকে। আমাদের যে গর্ব করার মতো কিছু ছিল, সেটুকু তারা জানতে পারেনি। তাদের সব কিছু যেন গুলিয়ে দেওয়া যায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাত্ করা—সেই চেষ্টাই করা হয়েছিল। ’

শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে; বর্তমান প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এটাই চাই, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সংগ্রামের ইতিহাস ছেলেমেয়েরা জানবে। জেনে তাদের মন-মানসিকতা সেভাবে তৈরি হবে যে এই জাতি বিজয়ী জাতি, বঙ্গবন্ধু বিজয়ের সেই পতাকা আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন। ’ তিনি বলেন, ‘যে ঘাতকের দল বা ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁকে (বঙ্গবন্ধু) আমাদের মাঝ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে, সেই খুনিদের বিচার আমরা করেছি। তাদের রায়ও কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ অভিশাপমুক্ত হয়েছে। সেই সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা এ দেশে গণহত্যা চালিয়েছে, মা-বোনদের লাঞ্ছিত করেছে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর ছিল, যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, যারা যুদ্ধাপরাধী, তাদেরও বিচার হচ্ছে। ’

শিশু প্রতিনিধি রাফিয়া তুর জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এমপি। স্বাগত বক্তব্য দেয় শিশু প্রতিনিধি ঋত্বিক জিদান। অনুষ্ঠান পরিচালনা করে শিশু প্রতিনিধি আরিশা রহমান নিঝুম ও ফারহান আহম্মেদ। এ সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, বাহাউদ্দিন নাছিম, কাজী আকরাম উদ্দিন, শেখ হেলাল উদ্দিন, শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, তিন বাহিনীর প্রধান, আইজিপি, র‌্যাবের মহাপরিচালক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী সুন্দর হাতের লেখা, চিত্রাঙ্কন, ভাষণ, কবিতা আবৃত্তি, রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। এ সময় তিনি দুজন দুস্থ নারীর হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেন। পরে প্রধানমন্ত্রী দর্শক গ্যালারিতে বসে ‘মুজিব মানে মুক্তি’ শিরোনামের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সমাধি কমপ্লেক্সে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী বইমেলার শুভ উদ্বোধন করেন। দুপুরের নামাজ ও মধ্যাহ্ন বিরতি শেষে বিকেল পৌনে ৪টায় ঢাকার উদ্দেশে টুঙ্গিপাড়া ত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন : এদিকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গতকাল সকাল ৭টায় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দলীয় সভাপতি হিসেবে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। এ সময় দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, ওবায়দুল কাদের, মোশাররফ হোসেন, দপ্তর সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানোর পর শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যান। তিনি সেখানে কিছু সময় অবস্থান করেন। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু ভবন এলাকা ত্যাগ করলে তা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। পরে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।


মন্তব্য