kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ জানুয়ারি ২০১৭ । ১১ মাঘ ১৪২৩। ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮।


দুই দেশেই শর্ষেয় ভূত

বাংলাদেশে তদন্ত, ফিলিপাইনে শুনানি

আবুল কাশেম ও এস এম আজাদ   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দুই দেশেই শর্ষেয় ভূত

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বা একাধিক ব্যক্তি জড়িত বলে সন্দেহ করছেন তদন্তকারীরা। গত দুই দিনে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও আলামত পেয়েছে।

ডলার স্থানান্তরের সময় বাংলাদেশের কাচপুর উন্নয়ন প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ থেকেই বেশ কিছু তথ্য গেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া প্রাথমিক তদন্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিলিং শাখার সিসিটিভি যথাস্থানে না থাকা, সার্ভার ব্যবহারকারীদের তথ্য না থাকাসহ বেশ কিছু বিষয়ে গরমিল ধরা পড়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

ওদিকে ফিলিপাইনে অর্থপাচার প্রতিরোধ করা যে সংস্থাটির কাজ, বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির পর জুয়ার আসর থেকে তা অন্য দেশে পাঠানোয় সহায়তা করেছে এন্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) নামের সরকারি সেই সংস্থাটি। ফলে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় গত শুক্রবার যে মামলা করেছে, তাতে রিজাল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখার ম্যানেজার মায়া সান্তোস দেগুইতো ছাড়াও এএমএলসির চার কর্মকর্তাকেও আসামি করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ জব্দ করতে ফিলিপাইনের এএমএলসিকে অনুরোধ করার পরও তারা তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে জুয়াড়িদের ফিলিপাইন থেকে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়া ছাড়াও ১০ কোটি পেসো বা প্রায় ১৬ কোটি টাকা হংকংয়ে স্থানান্তর করতে সহায়তা করেছে। এমনকি ফিলিপাইনের জুয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিলিপাইন অ্যামিউজমেন্ট অ্যান্ড গ্যামিং করপোরেশনও (পাগকর) বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাওয়ার মাসখানেক পর তদন্ত শুরু করেছে। গত ৯ মার্চ পাগকর তদন্তের জন্য এএমএলসিকে চিঠি দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে তদন্ত : সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সিআইডি এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার তদন্ত করলেও এই কাজে সহায়তা করছে পুলিশেরই আরো চারটি দপ্তর। এ ছাড়া ছায়াতদন্ত করছে র‌্যাবের সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞ দলও। গতকাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ট এক ডজন কমকর্তাকে অনানুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিআইডি। গত দুই দিন ধরে ব্যাংকে গিয়ে বেশ কিছু আলামত জব্দ করেন তাঁরা।

তদন্ত তদারকি দলের প্রধান সিআইডির উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি-এইচআরএম) সাইফুল আলম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আজও (গতকাল) বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করেছি। ফরেন এক্সচেঞ্জ এবং সিকিউরিটি সার্ভিল্যান্স ইক্যুইপমেন্ট আমরা জব্দ করেছি। পেমেন্টে সিস্টেম ডিপার্টমেন্ট (পিএসডি) ও অডিট বিভাগের কর্মকর্তাদের  সঙ্গে কথা বলেছি। ’

কাউকে আটক বা গ্রেপ্তারের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে বিশেষায়িত তদন্ত চলছে। তাই অন্য মামলার মতো আটক বা গ্রেপ্তার বলা যাবে না। তবে কয়েকজনের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। ’ তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনের ব্যাংকে টাকা হস্তান্তরের জন্য দেওয়া তথ্যের মধ্যে কাচপুরসহ কয়েকটি দেশীয় উন্নয়ন প্রকল্পের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এখান থেকে তথ্য গেছে বলে আমরা নিশ্চিত। তারা কারা সেটা শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি ইন্টারপোলের সহায়তা নিয়ে শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে যারা এবং যেসব অ্যাকাউন্টে অর্থ সরানো হয়েছে তাদের ব্যাপারে তদন্ত করা হবে। ’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না, সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে সাইফুল আলম বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে তাঁকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। ’

এফবিআইয়ের কোনো প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসছে কি না জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের মুখপাত্র ন্যান্সি ভ্যানহর্ন গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো দল আসার শিডিউল নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। ’

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, গতকাল পর্যন্ত তিন দফায় এক ডজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তদন্তকারীরা, যাঁদের বক্তব্য এবং আলামতের তথ্যে বেশ কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক মিজানুর রহমান, আবদুল্লাহ সালেহ ও প্রভাস চন্দ্র, সহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন, রফিক আহমেদ মজুমদার, সঞ্জিত রায়, আইটি বিভাগের দেব দুলাল রায় ও মামলার বাদী যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা রয়েছেন। কয়েকজনকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে বলে জানায় সূত্র। দুই দিন ধরে তদন্তকারীরা ব্যাংকের রিজার্ভ শাখার ডিলিং রুমের কম্পিউটার, সুইফট কোড ব্যবহারকারীর কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক সামগ্রী পরীক্ষা করে দেখছেন। ইতিমধ্যেই জানা গেছে, ডিলিং রুমের সিসি ক্যামেরাগুলো সঠিক জায়গায় বসানো হয়নি, সার্ভার ও কম্পিউটার থেকে তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে এবং ঘটনার আগে থেকে ফরেক্স রিজার্ভ ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের ডিলিং রুমের দুটি সিসি ক্যামেরা বিকল ছিল। রিজার্ভ থেকে ডলার চুরির সময় ব্যাংকের ডিলিং রুম বন্ধ ছিল। এতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে যে বার্তা এসেছিল, তা পরীক্ষা করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। সূত্র জানায়, এসব প্রক্রিয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা জোরদার না থাকার কারণে হয়েছে, নাকি পরিকল্পিতভাবে হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ডিলিং রুম ও সুইফট কোড ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের কল রেকর্ডসহ ব্যক্তিগত যোগাযোগ খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তাঁদের স্বজনদের যোগাযোগও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

সার্বিক তদন্তকাজ তদারকি করছে পুলিশ সদর দপ্তর, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ডিএমপি ও স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি)। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়হান উদ্দিন খানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি দল গঠন করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর, এসবি, পিবিআই ও ডিএমপির ৯ কর্মকর্তাকে নিয়ে তদন্ত সহায়ক দল গঠন করা হয়। এই দলের প্রধান করা হয়েছে পিলখানা হত্যা ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ আবদুল কাহ্হার আকন্দকে।

ফিলিপাইনে সিনেটে শুনানি : রিজার্ভ চুরি নিয়ে তদন্ত ও সিনেটের শুনানির ওপর নজর রাখছেন ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) জন গোমেজসহ দূতাবাসের কর্মকর্তারা। নিয়মিতভাবে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করছেন হালনাগাদ পরিস্থিতি। ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন তাঁরা।

রাষ্ট্রদূত জন গোমেজকে উদ্ধৃত করে বিবিসি বাংলা জানায়, বাংলাদেশের অর্থ চুরির ঘটনার প্রেক্ষাপটে ১৪টি দেশ ফিলিপাইনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। দেশটি তাদের ব্যাংকিং খাত নিয়ে ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে। ফলে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধার এবং জড়িতদের চিহ্নিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে।

সিনেটর সার্জিও ওসমেনিয়া বলেন, বাংলাদেশের রিজার্ভের আট কোটি ১০ লাখ ডলার আটকানোর জন্য এএমএলসি যথেষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো তত্পরতা দেখায়নি। আর সরকারি সংস্থা পাগকর বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কতা জারির এক মাস পর গত ৯ মার্চ ব্যবস্থা নিতে এএমএলসিকে চিঠি দিয়েছে।   

ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংক ও সিনেট কমিটির শুনানিতে এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির কেন্দ্রে ছিলেন ব্যাংকটির জুপিটার স্ট্রিট শাখার ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতো। দেশটির সাবেক জাস্টিস সেক্রেটারি লেইলা ডি লিমা বলেন, নিঃসন্দেহে দেগুইতো মূল অপরাধী। হ্যাকার ও অর্থপাচারকারীদের কার্যক্রমে সামনে ও পেছন থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনিই।

ওই শাখার সাবেক কাস্টমার সার্ভিস শাখার প্রধান রোমাল্ডো অগার্ডো গতকাল সিনেটের শুনানিতে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হিসেবে বলেন, গত ৫ ফেব্রুয়ারি শাখার সহকারী ব্যবস্থাপক অ্যাঞ্জেলা তরেস দুই কোটি পেসো (২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা) ক্যাশ সেন্টার থেকে নেন। বিকেল সাড়ে ৫টার সময় ক্যাশ সেন্টারের কাছে দেগুইতোর গাড়ি আসে। তখন তরেস টাকাগুলো গোনার মেশিনের কাছে নেন এবং সাড়ে ৫টা থেকে পৌনে ৭টা পর্যন্ত টাকাগুলো গুনে একটি বক্সে ভরেন। পরে ব্যাংকের বার্তাবাহক জবি মুরালস তরেসের সহযোগিতায় বক্সটি একটি কাগজের ব্যাগে ভরে গাড়িতে তুলে দেন। ওই সময় মায়া সান্তোষ বাইরে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। অগার্ডোর এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করে দেগুইতো বলেছেন, নিজের বক্তব্যের সময় তিনি এ বিষয়টি খোলাসা করবেন।

সিনেটর ভিসেন্তে সোতোর জেরার জবাবে অগার্ডো বলেন, দেগুইতো তখন তাঁদের বলেছিলেন, হয় আমাকে এ অর্থ ছাড় করতে হবে, না হয় আমি বা আমার বাবা খুন হব। অগার্ডো বলেন, কারা তাঁকে মৃত্যুর হুমকি দিচ্ছিল, তা আমি জিজ্ঞেস করিনি। এখন সিনেট কমিটি চাচ্ছে, শাখা ব্যবস্থাপক এক্সিকিউটিভ সেশনে আসলে কী বলতে চান, তা শুনতে।   

ওদিকে চীনা বংশোদ্ভূদ ফিলিপাইনের গার্মেন্ট ব্যবসায়ী উইলিয়াম গোর স্বাক্ষর জাল করে জুপিটার স্ট্রিট শাখায় অ্যাকাউন্ট খোলার প্রমাণ পেয়েছে রিজাল ব্যাংক। ব্যাংকটির আইন ও নিয়ন্ত্রক শাখার প্রধান মারিয়া সেসিলার তদন্তে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে জুপিটার স্ট্রিট শাখায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি উইলিয়াম গোর নামে যে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, তাতে গোর কোনো স্বাক্ষর নেই। তাঁর স্বাক্ষর জাল করে দেগুইতো স্থানীয় মুদ্রা লেনদেন করার উপযোগী ওই অ্যাকাউন্ট খুলেছেন।

আর ফিলিপাইনের এক্সচেঞ্জ হাউস ফিলরেম সার্ভিস ইনকরপোরেশনের প্রধান সালিদ বাউতিস্তা চুরি হওয়া আট কোটি ১০ লাখ ডলারকে পেসোতে রূপান্তর করে দেওয়ার ঘটনায় গতকাল ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি দাবি করেন, দেগুইতোর নির্দেশেই তিনি ডলারকে পেসোতে রূপান্তর করে অন্য দেশে পাঠাতে সহায়তা করেছেন।

সিনেটের শুনানিতে বাউতিস্তা বলেন, বাংলাদেশের চুরি যাওয়া রিজার্ভের অর্থ এক্সচেঞ্জ করে তাঁর প্রতিষ্ঠান যে এক কোটি পেসো মুনাফা করেছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংককে ফেরত দেবেন তিনি।


মন্তব্য