kalerkantho


ওহিদুরের স্বতন্ত্র মুক্তিবাহিনী

আজিজুল পারভেজ   

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ওহিদুরের স্বতন্ত্র মুক্তিবাহিনী

একাত্তরে নওগাঁ অঞ্চলের আত্রাই নদীকে কেন্দ্র করে বাম রাজনৈতিক কর্মীদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল একটি স্বতন্ত্র মুক্তিবাহিনী। তৎকালীন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ওয়াহিদুর রাহমানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই বাহিনী ‘ওহিদুর বাহিনী’ নামে পরিচিতি লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস দেশের অভ্যন্তরে থেকেই শত্রুকে মোকাবিলা করেছে এই দুর্ধর্ষ বাহিনী। প্রধানত নৌপথেই পরিচালিত হয়েছে এই মুক্তিসেনাদের তৎপরতা। তাঁরা রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁ এলাকার ৯টি থানাজুড়ে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সাফল্যের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

ওহিদুর বাহিনীর প্রধান ওয়াহিদুর রাহমান ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নে মেনন গ্রুপের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে ওয়াহিদুর রাহমান বলেন, “কমরেড আবুল বাসার পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন। তাঁর ‘জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের’ তত্ত্ব আমাকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে সহায়তা করে। দ্বিতীয়ত, ৭ই মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বক্তব্য আমাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে অনুপ্রেরণা জোগায়। তাই ২৫ মার্চের পরই স্থানীয়ভাবে নিজের এলাকা আত্রাইয়ে কর্মীদের সংগঠিত করতে থাকি। আত্রাই, রানীনগর, নওগাঁ, বাগমারা (রাজশাহী জেলা), মান্দা ও নাটোর এলাকায় শত শত কৃষক কর্মীর মধ্য থেকে বাছাই করে গ্রুপ গঠন করে তাদের যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলি। ’

ওয়াহিদুর বলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের মধ্যে দ্বৈত মত ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে একাত্তরের এপ্রিল মাসে রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁ মহকুমার পার্টির কর্মীদের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের পার্টি কর্মীরা ‘বৃহত্তর রাজশাহী আঞ্চলিক কমিউনিস্ট পার্টি’ নামে নতুন সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন ওয়াহিদুর রহমান।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলন থেকেই তাঁরা প্রকাশ্যে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ওখান থেকেই ২৫ জন কর্মী বাছাই করা হয় অস্ত্র সংগ্রহের অপারেশন পরিচালনার জন্য। ২৫ জনের ওই বাহিনীর সদস্যরা প্রকাশ্য দিবালোকে আত্রাই থানা দখল করে ৩২টি রাইফেল ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করেন। এই অস্ত্রগুলো ভাগ করে কয়েকটি ক্যাম্পে সশস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর বাহিনী থেকে আসা পাঁচ-ছয়জন করে সদস্য।

বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ ছিলেন ওয়াহিদুর রাহমান। সহকারী কমান্ডার ছিলেন হাবিলদার আবদুল মজিদ, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা (পরবর্তী সময়ে প্রতিমন্ত্রী) আলমগীর কবির ও সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরের ইমদাদুর রহমান। প্রথম দিকে পার্টির কর্মী ও কৃষক সমিতির সদস্যদের নিয়ে এই বাহিনী গঠিত হলেও পরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সৈনিকদের পাশাপাশি অন্যান্য দলের নেতাকর্মীরাও যোগ দেন। এই বাহিনীর কার্যক্রম এলাকায় ন্যাপ-ভাসানীর কৃষক সমিতির ব্যাপক তৎপরতা থাকায় এতে কৃষকরা ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হন। ফলে এই বাহিনীর তৎপরতা কয়েক থানায় ছড়িয়ে পড়ে।

ওয়াহিদুর জানান, তাঁর বাহিনীতে নিয়মিত যোদ্ধা ছিলেন প্রায় এক হাজার। আরো এক হাজার ছিলেন অনিয়মিত, যা রিজার্ভ বাহিনী বা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর মতো ছিল। সদস্যদের জন্য বড় বড় পানসী নৌকা ছিল ৫২টি। একটি কোষা নৌকা ছিল অস্ত্রাগার হিসেবে। আবার একটি কোষা নৌকা ব্যবহৃত হতো খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে। একটি ছোট নৌকা ছিল ফাস্ট এইড বা ওষুধপত্র নিয়ে। এ ছাড়া রেকি পার্টির (গোয়েন্দা বিভাগ) জন্য ছিল চার-পাঁচটি ছোট ছোট নৌকা। এই বাহিনীর ক্যাম্প ছিল হাঁসাইগাড়ী, মিরাট, গজমতখালী, ঝিকড়া ও তাহেরপুরে। এ ছাড়া অস্থায়ী ক্যাম্প ছিল বেশ কিছু। কেন্দ্র হিসেবে কখনো গজমতখালী, কখনো হাঁসাইগাড়ী এলাকা ছিল।

নওগাঁর মান্দা, রানীনগর ও আত্রাই, নাটোরের সিংড়া, বগুড়ার নন্দীগ্রাম এবং রাজশাহীর বাগমারা ও পুটিয়া থানার অংশবিশেষে এই বাহিনীর কার্যক্রম বিস্তৃত ছিল। এই বাহিনীর তৎপরতার কারণে ৪০-৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

এই বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে প্রায় তিন ডজন ছোট-বড় অভিযান পরিচালনা করে। এর মধ্যে তিন-চারটি ছাড়া সবই ছিল সফল অপারেশন।

ওহিদুর বাহিনী ৭ জুন রানীনগর থানার নলদীঘি গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করে। মাত্র ৩৫ জনের মুক্তিযোদ্ধা দল শতাধিক পাকিস্তানি সেনাকে মোকাবিলা করে। এতে তিনজন শত্রুসেনা মারা যায়।

১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে ওহিদুর বাহিনীর রাজশাহীর বাগমারা থানা দখল ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আরেকটি উল্লেখযোগ্য সফল অপারেশন চালানো হয় ৬ অক্টোবর। আত্রাই থেকে সান্তাহার রেলস্টেশনে যাওয়ার পথে বিস্ফোরক দিয়ে সাহাগোলা রেলওয়ে ব্রিজ উড়িয়ে দিলে পাকিস্তানি আর্মি বহনকারী স্পেশাল ট্রেন ধ্বংস হয়ে যায়। এতে প্রায় সাড়ে তিন শ শত্রুসেনার সলিল সমাধি ঘটে। রাজা ও মালেকের নেতৃত্বে প্রায় ৩০ জনের একটি মুক্তিযোদ্ধা দল এই অপারেশন চালায়।

ওয়াহিদুর জানান, মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে তাঁরা কোনো যোগাযোগের চেষ্টা করেননি। তবে মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। কোনো কোনো অপারেশনের জন্য মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হয়েছিল। আবার কিছু অপারেশন যৌথভাবে পরিচালিত হয়েছিল।

১৯ সেপ্টেম্বর আত্রাই উপজেলার বান্দাইখাড়া গ্রামে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ করে লুটের মালামাল ও কিছু তরুণীকে নিয়ে আত্রাই অভিমুখে নদীযোগে ফিরে যাওয়ার পথে মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যাশবুশের মধ্যে পড়ে যায় হানাদাররা। এ সময় প্রায় ৯২ জন পাকিস্তানি সেনা মারা যায়। এটি ছিল টেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও ওহিদুর বাহিনীর যৌথ অভিযান।

১২ অক্টোবর বাগমারার বাইগাছা গ্রামে অবস্থিত রাজশাহীর সবচেয়ে বড় রাজাকার ক্যাম্পে হামলা ছিল আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। প্রায় ১০ ঘণ্টা যুদ্ধের পর ৩০-৩২ জন রাজাকার মারা যায় এবং ২০০ রাজাকার আত্মসমর্পণ করে। ২৫ অক্টোবর নওগাঁর মান্দা থানার মইনুম গ্রামে এক অভিযানে সেলিম নামে ওহিদুর বাহিনীর একজন বড় মাপের মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ১৭ নভেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো বাগমারা থানা আক্রমণ করে ওহিদুর বাহিনী। আকস্মিক হামলায় টিকতে না পেরে শত্রুসেনারা পালিয়ে যায়। এতে অনেক গোলাবারুদ মুক্তিবাহিনীর হস্তগত হয়।

১০ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও ওহিদুর বাহিনী যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে দুই দিন ধরে যুদ্ধ করার পর পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে রানীনগর থানা দখল করতে সক্ষম হয়। এ অভিযানে ওহিদুর বাহিনীর কমরেড শাদ আলী শহীদ হন।

১৪ ডিসেম্বর এক বিশাল বহর নিয়ে ওহিদুর বাহিনী আত্রাই থানায় পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালায়। আত্রাই থানার কুখ্যাত রাজাকার কমান্ডার গ্রেপ্তার ও তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মধ্য দিয়ে আত্রাই থানা ১৬ ডিসেম্বর মুক্ত হয়। আত্রাইয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন ওয়াহিদুর রহমান।

স্বাধীনতার পর ওহিদুর বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্রসমর্পণ করেনি। মাত্র ২৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধের একটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক গেরিলা বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে রীতিমতো নায়কে পরিণত হন ওয়াহিদুর। এই গেরিলা নেতার বীরত্বকথা লরেন্স লিফসুলজ, ড. মনিরুজ্জামান তালুকদার ও ড. আবুল ফজল তাঁদের লেখনীতে উল্লেখ করেছেন।

প্রতিবেদনটিতে তথ্য সহায়তা দিয়েছেন নওগাঁ প্রতিনিধি ফরিদুল করিম।


মন্তব্য