kalerkantho


ইডেন জয় হলো না বাংলাদেশের

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ইডেন জয় হলো না বাংলাদেশের

অপরাজিত হাফ সেঞ্চুরির পথে সাকিব। এই ইনিংসই টি-টোয়েন্টিতে হাজার রান ও ৫০ উইকেটের ডাবলও হয়ে গেছেন তিনি। ছবি : মীর ফরিদ

‘রাত বারোটার পর কলকাতা শাসন করে চার যুবক’— শরত্কুমার মুখোপাধ্যায়ের এই কবিতার লাইনটি একটু বদলে দিয়ে কী যথাযথই না মনে হয় পরশু! এই আনন্দনগরের গিজগিজে ভিজে চারদিকেই কেবল বাংলাদেশ। লাল-সবুজের জার্সিতে, সমর্থকদের দাপুটে উপস্থিতিতে, স্থানীয়দের আশায়-উচ্চারণে।

‘সন্ধ্যার পর কলকাতা শাসন করে বাংলাদেশের ক্রিকেট’—অমন ধারণা তাই অমূলক ছিল না। পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে ইডেন গার্ডেনস যেমন এক টুকরো শেরে বাংলা স্টেডিয়াম হয়ে যাবে—এ নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করার ন্যূনতম কারণ ছিল না কোনো।

ভুল। সবই ভুল।

আবার এই দ্বৈরথের আবহে বাংলাদেশকে তো একটু হলেও ফেভারিট মানছিলেন প্রায় সবাই। পাকিস্তানের বিপক্ষে সীমিত ওভারের ক্রিকেটের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান জোগায় সে ভাবনার খোরাক। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচেই জয় মাশরাফি বিন মর্তুজার দলের। ৫-০ ব্যবধানের রেকর্ডে তাই কেন এগিয়ে থাকবে না বাংলাদেশ!

ভুল। আহ্্, কী ভুল বার্তা হিসেবেই তা ম্যাচ শেষে প্রমাণিত।

ক্রিকেট ঐতিহ্যের নন্দনকাননে সীমান্তের ওপারের বাংলাদেশ পায় না পাগলপারা সমর্থন। আবার পাকিস্তানের বিপক্ষে সাম্প্রতিক রাজসিক দাপটও ধরে রাখতে পারে না মাশরাফি বিন মর্তুজার দল। হেরে যায় তারা ৫৫ রানে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মূল পর্বের শুরুটা তাই বড্ড ম্যাড়ম্যাড়ে হয় বাংলাদেশের।

ধর্মশালায় দাপট ছিল বৃষ্টির, কলকাতায় রোদ্দুরের। সেখানে কাকের মতো উড়ে বেড়ায় টিয়াপাখি। এখানে সংখ্যায় তেমন না হলেও কুহু ডাকে প্রায়ই তো ডেকে ওঠে কোকিল। হ্যাঁ, চলতি গানের মতো এ অঞ্চলে যে ‘বসন্ত এসে গেছে। ’ বাংলাদেশ ক্রিকেটে সে বসন্তবাঁশি বাজছে অবশ্য অনেক দিন ধরে। পাকিস্তানের বিপক্ষে সে বাঁশির সুর যে বেসুরো হয়ে যাবে, কে ভেবেছিলেন! যেমনটা ভাবা যায়নি, ইডেনের দর্শক সমর্থনে বাংলাদেশকে হারিয়ে দেবে পাকিস্তান।

আবার সেই বাঙালি দর্শকের নিজেদের দিকে টেনে আনার মতো ক্রিকেটও তো খেলতে হবে বাংলাদেশকে। সেটি কাল তারা পারে কই! প্রথম ইনিংসেই নিজেদের বোলিংয়ে নিজেরা হারের কবর খুঁড়ে রাখে মাশরাফি-ব্রিগেড। এরপর সেখানে কেবল মাটিচাপা (পড়ুন রানচাপা) পড়ার দুঃসহ অপেক্ষা। পাকিস্তান ২০১ রান করে ফেলার পর আর ম্যাচে কী করে থাকে বাংলাদেশ!

আর দুর্ভাগ্যটাও এমন। এই নিয়ে টানা ষষ্ঠ ম্যাচে টস হারেন মাশরাফি। ব্যাটিং-স্বর্গে ব্যাটিং বেছে নিতে একটু দেরি হয় না পাকিস্তান অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদির। বাংলাদেশ টস জিতে আগে ব্যাটিং করলে তো আর বোলারদের ওপর দিয়ে ম্যাচের প্রথমার্ধজুড়ে যায় না অমন স্টিমরোলার। আর সেটিও কেমন? ছোট্ট এক পরিসংখ্যানে চোখ রাখলেই বোঝা যাবে। কাল ২২ চার ও আট ছক্কা আসে পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের ব্যাট থেকে। অর্থাৎ ১২০ বলের ইনিংসের ৩০টি বলই সীমানাছাড়া; ২০ ওভারের মধ্যে পাক্কা পাঁচ ওভার চার-ছক্কায়। সাকিব আল হাসানের করা নবম আর সাব্বির রহমানের করা ১৪তম ওভারেই বাউন্ডারি হয়নি কেবল। বুঝুন তাহলে!

অথচ টস হেরে বোলিং শুরুর সময়ও এতটা বোঝা যায়নি। মাশরাফি নিজেও তো পরে সংবাদ সম্মেলনে বলে গেলেন, উইকেট বুঝতে ভুল হয় তাঁর দলের। তাসকিন আহমেদের করা ইনিংসের প্রথম ওভারের দ্বিতীয় বলে পুল করতে গিয়ে বল আকাশে তুলে দেন শার্জিল খান। মিড অনে দাঁড়ানো তামিম ইকবাল প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেরি করে ফেলেন। যে কারণে ক্যাচের কাছাকাছিও যেতে পারেননি। কিন্তু জয়ের কাছ থেকে একটু একটু করে দূর থেকে আরো দূরে চলে যাবে বাংলাদেশ—সেটি বোঝার উপায় কী!

পাকিস্তান ইনিংসের ছন্দটা আসলে তৈরি হয় দ্বিতীয় ওভারে। বাংলাদেশের বোলিংয়ের ছন্দ কেটে যাওয়াও। আল-আমিন হোসেন প্রথম বলই করেন লেগ সাইডে, সেটিও স্লোয়ার! পুল করে তা সীমানাছাড়া করতে একটুও অসুবিধা হয় না শার্জিল খানের। এরপর দুটো ফুল লেন্থ বলে শার্জিলের একটি করে ছক্কা-চার। সঙ্গে আরো দুটো সিঙ্গেলে আল-আমিনের ওভার থেকেই আসে ১৮ রান। ব্যস, ম্যাচের লাগাম ম্যাচের শুরুতেই ধরে ফেলে পাকিস্তান।

তৃতীয় ওভারে বোলিংয়ে এসে আরাফাত সানী না হয় বোল্ড করেন শার্জিলকে! কিন্তু এই চাপটা ধরে রাখতে পারে না বাংলাদেশ। শার্জিল আউট হওয়ার পর ক্রিজে এসে দ্বিতীয় বলেই যেমন উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে ছক্কা মেরে দেন মোহাম্মদ হাফিজ। ইনিংসজুড়েই এই এক গল্প। হয় শর্টপিচ, নয় ফুল লেন্থ—মোদ্দা কথা, ভুল লেন্থে বোলিং করতে থাকেন বোলাররা। ঠিক থাকে না লাইনও। কত কত বল যে লেগ স্ট্যাম্পের ওপরে-বাইরে! দ্বিতীয় উইকেটে ১১.২ ওভারে ৯৫ রানের জুটি শেহজাদ-হাফিজের। ১৩.৫ ওভারে ১২১ রানের মাথায় আউট হন শেহজাদ (৫২)। তখনো হয়তো ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে যায়নি বাংলাদেশ। ছিটকে গেল শহীদ আফ্রিদি আসার পর।

ব্যাটিং অর্ডারে এখন আর চার নম্বর জায়গাটি তাঁর নয়। কিন্তু কালকের চিত্রনাট্য যে শহীদ আফ্রিদির জন্যই লেখা! আর মাঠে নামার সময় ইডেনের গ্যালারি যে গগনবিদারি চিৎকারে স্বাগত জানায়, তাতে হয়তো আরো উদ্দীপিত আফ্রিদি। তাঁর মুখোমুখি হওয়া প্রথম বল ইনিংসের ১৫তম ওভারের প্রথম ডেলিভারি। বোলিংয়ে মাশরাফি। এক রানে শুরু আফ্রিদির। পরের বলে হাফিজ সিঙ্গেল নিলে আবার স্ট্রাইক তাঁর। শুরু হয় তাঁর তাণ্ডব। পর পর তিন বলে বাউন্ডারি; এর মধ্যে শেষটি আবার ওভার বাউন্ডারি। লেগ সাইডে কী বাজে বোলিংটাই না করলেন মাশরাফি। কোমর উচ্চতায় নো বল করে দিলেন তো ‘ফ্রি হিট’ও। দুই দলের অধিনায়কের লড়াইয়ে মাশরাফির বিপক্ষে জয় আফ্রিদির। আগের দিনের যুদ্ধের ফল যেমন সেনাপতিদের দ্বৈরথে নির্ধারিত হতো, তারই এক ক্রিকেটীয় সংস্করণ যেন কাল মঞ্চস্থ ইডেন গার্ডেনসে।

এরপর সৌম্য সরকারের অবিশ্বাস্য এক ক্যাচে হাফিজ (৬৪) আউট হন ঠিকই। মিড উইকেটে শূন্যে লাফিয়ে বল ঠেকালেন প্রথমে, এরপর শরীরের ভারসাম্য বাউন্ডারি লাইনের ওপারে চলে যাচ্ছে বল ছুড়ে ওপরে ছুড়ে ভেতরে এসে মুঠোবন্দি করার অমন দৃশ্য বাংলাদেশের ফিল্ডারদের কাছ থেকে খুব একটা দেখা যায় না। তামিম ইকবালেরও যেমন স্লেজিং করে উমর আকমলকে তাতিয়ে দেওয়াটা প্রতি ম্যাচের ঘটনা না। কিন্তু অন্য প্রান্তে শহীদ আফ্রিদি যে ১৯ বলে সমান চারটি করে চার-ছক্কায় ৪৯ রানের ইনিংস খেলেন, সেটিই হয়ে যায় মূল হাইলাইট। ২০ ওভারে ২০১ রানের চূড়ায় ওঠে পাকিস্তান। ম্যাচে আর কী করে থাকে বাংলাদেশ!

ক্রিকেটের দ্বিতীয় ইনিংস কখনো-সখনো কী গুরুত্বহীনই না হয়ে পড়ে! বাংলাদেশের কালকের ইনিংসটি যেমন। ধর্মশালায় রানের জলপ্রপাত ছুটিয়ে দেওয়া তামিম ইকবাল কাল করতে পারেন না ২৪ রানের বেশি। সৌম্য সরকার (০), মুশফিকুর রহিমরা (১৮) পারেন না বাজে ফর্মের গহ্বর থেকে বেরোতে। একমাত্র সাকিবের ইনিংসই ব্যতিক্রম। ৪০ বলে পাঁচটি চার ও এক ছক্কায় ৫০ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। কিন্তু লণ্ঠনের মৃদু আলোর মতো এই ইনিংসে আঁধার কাটে না, আরো জমাট বাঁধে বরং। ২০ ওভারে ছয় উইকেটে ১৪৬ রানে থমকে গিয়ে পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশ ম্যাচটি হেরে যায় ৫৫ রানে।

ইডেন গার্ডেনসের গ্যালারিতে পাকিস্তানের প্রতি সমর্থনের ঢেউ, দুই দলের সীমিত ওভারের সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচের ফল অযৌক্তিক প্রমাণিত হওয়া, আফ্রিদির বিস্ফোরণ, বাংলাদেশি বোলারদের বিবর্ণ পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে কলকাতার কালকের সন্ধ্যায় করোটিতে আবার ঝলসে ওঠে আরেক কবির পঙিক্ত। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের, ‘প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য। ’ ভিন্ন প্রেক্ষাপটেই তো লিখেছিলেন তা তিনি। কিন্তু বাংলাদেশের অমন পারফরম্যান্সের পর এর সঙ্গে কিভাবেই না তা মিলে যায়!


মন্তব্য