kalerkantho

সোমবার। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ । ১০ মাঘ ১৪২৩। ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বাংলাদেশ ব্যাংক গুমোট

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশ ব্যাংক গুমোট

প্রতিদিন সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়েই দিনের কার্যসূচি নিয়ে বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও চার ডেপুটি গভর্নর। সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিম (সিএমটি) নামে পরিচিত এই পাঁচ সদস্যের বৈঠকটি হয় নিয়মিত।

গতকাল বুধবার সে বৈঠকটি হয়েছে ঠিকই, তবে তা দুজনের ব্যক্তিগত আলাপচারিতার মতো। কারণ রিজার্ভ চুরির ঘটনায় আগের দিন পদত্যাগ করেছেন গভর্নর, চুক্তি বাতিল করা হয়েছে দুই ডেপুটি গভর্নরের। বহাল থাকা বাকি দুই ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী ও আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান এক টেবিলে বসে ব্যাংকের বিভাগগুলোর দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ে এই দশা গতকালের। একসঙ্গে গভর্নর ও দুই ডেপুটি গভর্নরের বিদায়ে পদস্থ কর্মকর্তারা হতবাক। আর মধ্যম ও নিম্নসারির কর্মকর্তারা কেউ হতবিহ্বল, কেউবা বিস্মিত। আবার কারো কারো মনে ভয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আনাগোনায়। ফলে ব্যাংকের কাজকর্মে হঠাৎ করেই স্থবিরতা নেমে এসেছে। ছোট-বড় কিংবা মাঝারি, সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যেই অস্বস্তি।

রিজার্ভ চুরির ঘটনার নৈতিক দায় নিয়ে গভর্নরের পদ থেকে ড. আতিউরের সরে যাওয়াকে তাঁর নিজের ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক কর্মী। তাঁরা চান—দ্রুত এ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটিত হোক। যাতে ব্যাংক ও কর্মীদের সামাজিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে।

গতকাল বুধবার বিকেল ৫টায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করেছেন। তাঁর জায়গায় নতুন গভর্নর হিসেবে চার বছর মেয়াদে নিয়োগ পেয়েছেন ফজলে কবির। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলমকে গতকাল বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে আদেশ জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সদস্য মো. ইউনুসুর রহমানকে।

এদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থা ভালো নয়। বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। ব্যাংককে ঢেলে সাজাতে হবে। তিনি জানান, নতুন গভর্নর শনি অথবা রবিবার দায়িত্ব নিতে পারেন। আর ডেপুটি গভর্নর নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এতে মাসখানেক সময় লাগবে।

গভর্নর ও দুই ডেপুটি গভর্নরের বিদায়ের পর গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মীদের গুমোট সময় কেটেছে। সকালে বরখাস্ত হওয়া ডেপুটি গভর্নর মো. আবুল কাসেম এক দফা অফিসে গিয়েছিলেন। এরই মধ্যে চলছে নতুন গভর্নরকে বরণের প্রস্তুতিও।

সেই সঙ্গে আছে আতঙ্কও। নতুন পরিস্থিতিতে কার অবস্থান কী হয়, কাকে সরিয়ে কাকে কোন পদে আনা হয়, কার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল হয়—এসব নিয়ে কানাঘুষা চলেছে দিনভর। খবর রটেছে, নতুন গভর্নর আসার পর দুই নির্বাহী পরিচালক ও দুই জিএমকে সরিয়ে দেওয়া হবে। সারা দিনই সংবাদকর্মীদের আনাগোনা ছিল ব্যাংকে। তবে দুই ডেপুটি গভর্নর ও উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা কারো সঙ্গে কথা বলেননি। সকালে টিভি চ্যানেলগুলো ব্যাংকের মূল ভবনের ভেতরে থেকে সরাসরি সম্প্রচার শুরু করলে সেখান থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। অনুরোধ করা হয় ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ না করতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে সাংবাদিক ও অন্য দর্শনার্থীদের চলাচলে কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

তবে অস্বাভাবিক কোনো কিছু দেখছেন না ব্যাংকের মুখপাত্র শুভংকর সাহা। তিনি বলেন, ‘গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নররা পদে থাকা অবস্থাতেও এমন অবস্থা অনেক সময় তৈরি হয়। এতে দৈনন্দিন কাজে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও গ্রাহক সেবার কাজ আগের মতোই চলছে। ’

সূত্র জানায়, ভারত থেকে দেশে ফিরে আতিউর রহমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বাসায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেখানে অর্থমন্ত্রী গভর্নরকে পদত্যাগ করতে বলেন। পরদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগপত্র দেন আতিউর। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। গভর্নর অন্তত দায় নিয়ে পদত্যাগ করার সংস্কৃতি তৈরি করতে পেরেছেন। ’

ওই কর্মকর্তা জানান, তাঁর ২৪ বছরের কর্মজীবনে বাংলাদেশ ব্যাংকে এমন পরিস্থিতি দেখেননি। এর আগে গভর্নর খোরশেদ আলমের বিদায়ের সময় অনেক কর্মী দাবিদাওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।

বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গভর্নরকে বিদায় নিতে হবে—এটা অনুমান করা গিয়েছিল। দুই ডেপুটি গভর্নরের বিদায়ও অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু আমাদের হতভম্ব করেছে এম আসলাম আলমের বিদায়। ’

ওই বিভাগের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘গতকাল এক বন্ধুকে চা খাওয়াতে গেলাম। সে বলল, চুরির টাকার ভাগ দিচ্ছ নাকি? ঠাট্টার ছলে বললেও আমাদের সামাজিক মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ’

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভালো নেই—মুহিত : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরসহ তিন শীর্ষ পদে পরিবর্তনের পর আর্থিক খাতের ওই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ঢেলে সাজাতে চান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। এটা খুব ভালো অবস্থায় নেই। তবে কিভাবে এবং কোন ধরনের সংস্কার আসবে তা খোলাসা করেননি তিনি।

গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন গভর্নর সম্ভবত ১৯ অথবা ২০ মার্চ দায়িত্ব নেবেন। তিনি এখন নিউ ইয়র্কে আছেন, ১৮ মার্চ দেশে ফিরবেন। নতুন গভর্নর আসার পরে তিনি নিজেকে সেটেল করতে কিছু সময় নেবেন। তখন উনি আরো (সংস্কারের বিষয়গুলো) দেখবেন। ’

সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোথায় কোথায় সংস্কার প্রয়োজন তা খতিয়ে দেখবে বলেও জানান মুহিত।

আতিউর সরে যাওয়ার পর দুই ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানা ও আবুল কাসেমকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলমকেও সরিয়ে দেওয়ার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গতকাল প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সদস্য মো. ইউনুসুর রহমানকে ব্যাংকিং বিভাগের সচিব করার আদেশ জারি করে। আসলাম আলমকে সরিয়ে দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, ‘এখানে প্রিন্সিপালটা হলো—সচিব হবেন ভিজিলেন্ট। সো ইউ শুড নো অ্যাবাউট ইট, দুর্ভাগ্যবশত নোবডি নিউ। ’

নতুন দুজন ডেপুটি গভর্নর নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এটা লম্বা প্রক্রিয়া। এটাতে সার্চ কমিটি হয়। সার্চ কমিটি নোমিনেশন দেয়, তার পরে নিযুক্তি হয়। সো, সময় লাগবে। ’ এই নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করতে এক মাসের মতো লাগতে পারে বলে ধারণা দেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকে সিআইডি : সূত্র জানায়, গতকাল সকাল ১১টার দিকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অ্যাডিশনাল ডিআইজি) শাহ আলমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ব্যাংকে যায়। তারা ডেপুটি গভর্নর রাজী হাসানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে। প্রথম দিন তারা জানার চেষ্টা করে, বাংলাদেশ ব্যাংকে কিভাবে কাজ হয়। তারা সাইবার নেটওয়ার্কিং সিস্টেম ও সুইফট কোড সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করে। টাকা ট্রান্সফারে কারা কারা জড়িত—এসব জানার চেষ্টা করছেন সিআইডির তদন্তকারীরা। গতকাল বিকেল পর্যন্ত তল্লাশি করে কয়েকটি ল্যাপটপসহ বেশ কিছু ডিভাইস জব্দ করেছেন তাঁরা।

অ্যাডিশনাল ডিআইজি শাহ আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা কাজ শুরু করেছি। শুরু ভালো হয়েছে, অগ্রগতিও আছে। কাজ করতে দিন, আমরা আশাবাদী। তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাচ্ছি। ’ সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মির্জা আব্দুল্লাহ-হেল বাকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো মামলার তদন্তের প্রথম কাজ হচ্ছে আলামত ও তথ্য সংগ্রহ। আমরা মূলত এখন সেটাই করছি। ’

প্রতিবেদন ১৯ এপ্রিল : রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের করা মামলার প্রতিবেদন জমা দিতে আগামী ১৯ এপ্রিল দিন ঠিক করেছেন আদালত। গতকাল হাকিম মাহবুবুর রহমান এই দিন ঠিক করেন বলে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা এসআই জালাল আহমেদ জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মো. জোবায়ের বিন হুদার গত মঙ্গলবার মতিঝিল থানায় করা এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সিআইডিকে। চুরির জন্য হ্যাকারদের দায়ী করে করা এই মামলায় আসামির তালিকায় কারো নাম নেই।


মন্তব্য